বৃদ্ধা বলিয়াই চলিয়াছিল, আবার এই দেখ, আমাদের জমিগুলি উ সব কেড়ে লিছে।
অহীন্দ্র যেন গর্জন করিয়া উঠিল, কেড়ে নিচ্ছে?
তাহার এই গর্জনে সমস্ত দলটি চমকিয়া উঠিল, অহীন্দ্রকে এমন রূপে তাহারা কখনও তো দেখেই নাই, এমন রূপের প্রকাশকেও তাহারা কল্পনা করিতে পারে না। যে প্রৌঢ়াটি কথা বলিতেছিল সেও ভয়ে চুপ করিয়া গেল। অহীন্দ্র অপেক্ষাকৃত শান্ত স্বরে আবার প্রশ্ন করিল, জমি কেড়ে নিচ্ছে কি মেঝেন?
ভয়ে ভয়ে প্রৌঢ়া বলিল, বুলছে, তোদের কাছে আমি টাকা পাব। জমিগুলা আমাকে দিতে হবে। লইলে লালিশ করব।
টাকা পাবে? কিসের টাকা?
ওই যে চিবাস মোড়ল, উয়ার কাছে আমরা সোব ধান খেতম বর্ষাতে, তাই চিবাস খত করে লিলে ধানের দামে। উহার কাছ হতে উই সায়েব আবার কিনে লিলে খতগুলান। তাথেই বুলছে, জমিগুলা দে, তুদিকে আরও টাকা দিব, খতও শোধ করে লিব! লইলে লালিশ করব।
করুক নালিশ, খবরদার তোরা জমি লিখে দিবি না। যে টাকা পাবে সে আমরা শোধ করে দেব।
মেয়েটি হতভম্বের মত খানিকক্ষণ অহীন্দ্রের মুখের দিকে চাহিয়া থাকিয়া সহসা কাঁদিয়া ফেলিয়া বলিল, জমি যে বাবু লিলে।
লিখে নিলে?
হেঁ বাবু। আজকে সেকালে মরদগুলাকে লিয়ে শহরে পাঠায়ে দিলে তুদের সেই মজুমদারের সোঙ্গে হাকিমের ছামুতে টিপছাপ লিযে, রেজস্টালি করে লিবে।
অহীন্দ্র অনুশোচনায় অস্থির হইয়া উঠিয়া বলিল, ছি ছি ছি! তোরা দিলি কেন? আমাদের ওখানে গেলি কেন?
মেয়েটি সকরুণ স্বরে বলিল, উ যি বলতে বারণ করলে রাঙাবাবু। উয়াকে দেখলে যে আমরা ডরে মরে যাই। পাহাড়ে চিতির ছামুতে ছাগল ভেড়ার মোতন আমরা লড়া-চড়া করতে লারি বাবু।
সমবেত সকলেই যেন এতক্ষণ উদ্বেগে নিঃশ্বাস রুদ্ধ করিয়া দাঁড়াইয়া ছিল, প্রৌঢ়ার কথা শেষ হইতেই দুঃখে হতাশায় দীর্ঘ প্রক্ষেপে সে নিঃশ্বাস তাহারা ত্যাগ করিল। মৃদুস্বরে আক্ষেপ করিয়া দুই-চারিজন বলিয়া উঠিল, আঃ আঃ! হায় রে!
অহিন্দ্রের চোখের উপর চকিতে ভাসিয়া উঠিল, সে যেন স্পষ্ট দেখিতে পাইল, সম্মুখেই একটা স্থানে একটা বিরাট অজগরের মৃতদেহ, নিস্পন্দ চিত্রিত মাংসস্তূপ। ঠিক ওইখানেই সেটা সেদিন পড়িয়া ছিল, তীরে তীরে বধ করিয়াছিল সেটাকে সারীর স্বামী। সে উঠিয়া দাঁড়াইল, দাঁড়াইয়া অনুভব করিল, সর্বশরীর থরথর করিয়া কাঁপিতেছে। মাথাটা যেন অবরুদ্ধ ক্রোধে ফাটিয়া পড়িতেছে।
***
এমন দুর্দমনীয় ক্রোধের অস্থিরতা সে জীবনে অনুভব করে নাই; দুই কান দিয়া আগুন বাহির হইতেছে, শীতের কনকনে বাতাসের স্পর্শেও আরাম বোধ হইতেছে না। রগের শিরা দুইটা দপদপ করিয়া স্পন্দিত হইতেছে। বারা বার তার ইচ্ছা হইতেছিল, ওই কলের মালিকের সম্মুখে গিয়া দাঁড়াইতে। একবার খানিকটা অগ্রসরও হইয়াছিল, কিন্তু পথ হইতেই ফিরিল; এই অবস্থার মধ্যেও তাহার শৈশব হইতে মায়ের দৃষ্টান্তে অভ্যাস করা আত্মসংযম তাহাকে নিবৃত্ত করিল। আর একটা চিন্তা তাহার পথ রোধ করিল, সে তাহাদের বংশপ্রচলিত মর্যাদা-রীতি। সে রীতি-পদ্ধতি অনুযায়ী অহীন্দ্রের এমন করিয়া বিমলবাবুর ওখানে যাওয়া চলে। চক্রবর্তীদের আসনের সম্মুখেই ওই কলওয়ালাকে আসিয়া দাঁড়াইতে হয়। সঙ্গে সঙ্গেই সে ফিরিল। শীতের কালিন্দীর বালুকাময় তটভূমি ধরিয়া একটা নির্জন স্থানে আসিয়া সে বসিল। সম্মুখেই পশ্চিম দিকে অপরাহ্নের সূর্য দিকচক্ররেখার দিকে দ্রুত নামিয়া চলিয়াছে, ইহারই মধ্যে শুকতারাটি ক্ষীণ প্রভায় প্রকাশিত হইয়াছে।
বসিয়া বসিয়া সে ভাবিতেছিল ওই কলওয়ালার অত্যাচারের কথা। নিরীহ সরল জাতির নারী কাড়িয়া লইয়াছে, ভূমি কাড়িয়া লইয়াছে। আর তাহাদের পৃথিবীতে আছে কি? আর কি অপদার্থ ভীরু জাতি এই সাঁওতালেরা! তীর ধনুক লইয়া কারবার করে, বুনো শূকর মারিয়া খায়। কুমীর মারে, বাঘও নিস্তার পায় না, অতি কদর্য ভয়াল অজগর, ওই সারীর স্বামীই সে অজগরটাকে বধ করিয়াছিল, আর এটাকে পারিল না! ওই সাঁওতাল রমণীটি তো মিথ্যা বলে নাই, অর্থের শক্তিতে বুদ্ধির কুটিলতায় ও অজগরই বটে; পাক দিয়া জড়াইয়া ধরিয়া পেষণে পেষণে রক্তহীন হত্যা করিয়া ধীরে ধীরে গ্রাস করিতে থাকে। অজগরই বটে! সারীর স্বামী এ অজগরটাকে বধ করিতে পারিল না? এমনি ধারার অত্যন্ত নিষ্ঠুর কামনা তাহার মাথার মধ্যে যেন চিতাগ্নিশিখার মত পাক খাইয়া খাইয়া ফিরিতে আরম্ভ করিল।
কিছুক্ষণ পর সে ধীরে ধীরে উঠিয়া বালুরাশি ভাঙ্গিয়া কালিন্দীর ক্ষীণ জলস্রোতের কিনারায় আসিয়া আঁজলা আঁজলা জল মাথায় মুখে দিয়া ধুইয়া ফেলিল। কনকনে ঠাণ্ডা জলের উপর শীতের বাতাসের স্পর্শে এবার একটু শীত বোধ করিল। মস্তিষ্ক যেন এতক্ষণে সুস্থ হইয়া আসিতেছে। বেশ পরিস্ফুট কণ্ঠে সে বলিয়া উঠিল, আঃ!
ধীরে ধীরে সে বালির উপর দিয়া হাঁটিয়া চলিল। উঃ, কি কঠিন ক্রোধই না তাহার হইয়াছিল। ওই লোকটার সম্মুখে গিয়া দাঁড়াইলে আজ একটা অঘটন ঘটিয়া যাইত। কিন্তু এই যে অন্যায় অত্যাচার, ধনদর্পিত স্বেচ্ছাচার-স্বেচ্ছাচার কেন, ব্যভিচার-ইহার প্রতিকার করিতে হইবে। করিতে যে সে ধর্মত ন্যায়ত বাধ্য। ওই নিরীহ সাঁওতালগুলি তাহাদেরই প্রজা, শুধু প্রজাই নয়, তাহার পিতামহ হইতে আজ পর্যন্ত তাহাদের বংশকে উহারা দেবতার মত মান্য করে। শুধু তাই বলিয়াই কেন? মানুষ হিসাবে তাহার কর্তব্য। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জন্য যুদ্ধ করার অধিকারই মানুষের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অধিকার। সকল ব্যাথিতের বেদনায় ব্যাথিতা অশ্রুমুখী মায়ের মুখ তাহার মনে জাগিয়া উঠিল, তাহার মা ননী পালের মৃত্যুর জন্য কাঁদেন, অথচ পুত্রের দ্বীপান্তরের আদেশ অবিচলিত ধৈর্যের সহিত সহ্য করেন।
