মেয়েটি একটু আশ্চর্য বোধ করিয়া বলিল, কেনে, ভাল আছি। সেই যি তুমার বিয়ার ‘ল সম্বন্ধিতে’ (নব সম্বন্ধ উপলক্ষে) নেচ্যা এলম গো! হাঁড়িয়া খেলম, গান করলম।
অহীন্দ্র হাসিয়া ফেলিল, বলিল, তা বটে, নেচে যখন এলি, তখন খারাপ থাকবি কি করে? ঠিক কথা।
মেয়েটি সবিস্ময়ে অহীন্দ্রের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল, কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরেই কথার অর্থ উপলব্ধি করিয়া খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিয়া বলিল, হেঁ। লইলে নেচ্যা এলম কি করে?
রাঙাবাবু!
রাঙাবাবু! এ বাবা গো!
হালে–ভালা-রাঙাবাবু গো
হাসির ধ্বনি শুনিতে পাইয়া আশেপাশের বাড়িগুলি হইতে তিনচারটি মেয়ে উঁকি মারিয়া দেখিয়া বিস্ময়ে আনন্দে রাঙাবাবুর আগমনবার্তা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে ঘোষণা করিয়া অহীন্দ্রের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। দেখিতে দেখিতে দলবদ্ধ হইয়া তরুণীর দল তাহাকে ঘিরিয়া ফেলিল। বয়স্কা মাঝিনেরা তাড়াতাড়ি ছোট্ট একটা চৌপায়া আনিয়া তাহাদের ‘জহর সার্না’ অর্থাৎ দেবতার কুঞ্জভবন কৃষ্ণচূড়াগাছের ছায়ায় পাতিয়া দিয়া সম্ভ্রমভরে বলিল, আপুনি বোস্ বাবু।
তরুণী পরস্পরের গলা ধরিয়া দাঁড়াইয়া আপানাদের মধ্যেই নিজেদের ভাষায় অনর্গল কথা বলিতেছিল, তাহার সমস্তই অহীন্দ্রকে লইয়া। অহীন্দ্র বলিল, কি এত সব বলছিস তোরা?
মেয়েগুলো খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিল। একটি মধ্যবয়স্কা মেয়ে বলিল, উয়ারা বুলছে, রাঙাবাবুকে শুধা, বহুটি কেমন হল? কত বোড়ো বেটে বহুটি? তাই ই উয়াকে বুলছে, তুই শুধা; উ ইয়াকে বুলছে, তুই শুধা; শরম লাগছে উয়াদের।
অহীন্দ্র বলিল, এই এদের মতই হবে।
এবার একটি মেয়ে বলিল, আ আমদের পারা কালো বেটে, না গোরা বেটে?
অহীন্দ্র বলিল, সে আমি বলব কেন? তোরা গিয়ে দেখে আয়। সারী গিয়েছিল দেখতে, সে আমার বউয়ের নাম দিয়ে এসেছে–রাঙাঠাকরুন।
মেয়েগুলি একসঙ্গে অকস্মাৎ গম্ভীর হইয়া স্তব্ধ হইয়া গেল। কয়েক মুহূর্ত পরে গম্ভীর মৃদুস্বরে দুই একজনের মধ্যে দুই-একটা বাদানুবাদের সুরে কথা আরম্ভ হইল। অহীন্দ্র বুঝিতে পারিল না এবং লক্ষ্যও করিল না তাহাদের আকস্মিক সুরবৈষম্য। সে অত্যন্ত তীক্ষ্মভাবে সপ্রশ্ন হইয়া উঠিয়াছিল, ভ্রূ এবং কপাল কুঞ্চিত করিয়া সে বলিল, ভাল কথা, সারীরা এখন কোথায় থাকে রে? কমল মাঝিরা এখান থেকে উঠেই গেল কেন?
মেয়েগুলি আবার স্তব্ধ হইয়া গেল, তাহাদের অপ্রসন্নতার গাম্ভীর্য অত্যন্ত কঠোরভাবে প্রকট হইয়া উঠিল। অহীন্দ্র তাহাদের মুখের দিকে চাহিয়া বিস্মিত হইয়া বলিল, কি, তোরা সব গুম্ মেরে গেলি যে? তাহার সন্দেহ হইল যে, ইহাদের সকলে চূড়ার নেতৃত্বে দল পাকাইয়া কমলকে তাড়াইয়াছে।
একটি তরুণী এবার বলিয়া উঠিল, উ মেয়েটার নাম তু করিস না রাঙাবাবু, ছি।
আরও বিস্মিত হইয়া অহিন্দ্ৰ বলিল, কেন?
সকলের মুখে ঘৃণার অতি তীব্র অভিব্যক্তি ফুটিয়া উঠিল, যে-মেয়েটি কথা বলিতেছিল সে বলিল, ছি, উ পাপী বেটে, পাপ করলে।
পাপ করলে?
হেঁ, পাপ করলে; আপোন বরকে-মরদকে ছেড়ে উ ওই সায়েবটার ঘরে থাকছে।
অহীন্দ্র চমকিয়া উঠিল, বাক্যের অর্থে অর্থে সম্পূর্ণভাবে কথাটা না বুঝিলেও অর্থের আভাস সে একটা বুঝিতে পারিতেছিল, তীক্ষ্ণ তির্যক দৃষ্টিতে চাহিয়া সে প্রশ্ন করিল, বরকে ছেড়ে সায়েবের ঘরে থাকছে? সায়েব কে?
ওই যি কল বানাইছে, উয়াকে আমরা সায়েব বলি।
হুঁ। ছোট একটা ‘হুঁ’ বলিয়াই অহীন্দ্র স্তব্ধ হইয়া গেল।
অপর একটি মেয়ে বলিয়া উঠিল, উ এখুন ভাল কাপড় পরছে, গোন্দ মাখছে, উই সায়েব দিচ্ছে উকে।
অহীন্দ্র প্রশ্ন করিল, সেইজন্য বুঝি কমল মাঝি আর সারীর বর এখান থেকে পালিয়ে গেছে?
হে, শরম লাগল উয়াদের, আমরা সব উয়াদের সঙ্গে খেলম নি, তাতেই উয়াদের শরম বেশি হল, উয়ারা সব চলে গেল। হেঁ।
অন্যান্য মেয়েগুলি আপনাদের ভাষায় অনর্গল কিচির-মিচির করিয়া আলোচনা করিয়া চলিয়াছিল দলবদ্ধ সারিকা পাখির মত। অকস্মাৎ একটি মেয়ে আপনাদের ভাষায় বলিয়া উঠিল, দে দেখ, রাঙাবাবুর মুখখানা কেমন হইছে দেখ।
সবিস্ময়ে আর একটি মেয়ে বলিয়া উঠিল, জেঙ্গেৎ-আরা (অর্থাৎ টকটকে রাঙা)! উ বাবা রে!
অহীন্দ্র আবার স্তব্ধ হইয়া গিয়াছিল, দুঃখে ক্রোধে তাহার মনের মধ্যে একটা আলোড়ন জাগিয়া উঠিল। সেই দীর্ঘতনু মুখরা মেয়েটিকে তাহার বর ভাল লাগিত, তাহার পরিণতি শেষে এই হইল? আর তাহাদেরই অধিকৃত ভূমির মধ্যে একজন আগন্তুক ধনের দর্পে এমনি করিয়া অত্যাচার করিল সরল নিরীহ জাতির নারীর উপর?
মাথার মধ্যে সে কেমন একটা অস্বস্তি অনুভব করিল, রক্তের চাপে মাথাটা যেন ভারী হইয়া উঠিতেছে।
একটি প্রৌঢ়া মেয়ে বলিল, হাঁ বাবু, কেনে তুরা ওই সায়েবটাকে ইখিনে কল বোসাতে দিলি? ওই মেয়েটাকে উ জোর করে বশ করলে। উয়ার ভয়ে কেউ কিছু বলতে লারলে।
অহীন্দ্রের স্থিরদৃষ্টি একটি স্থানেই আবদ্ধ হইয়া ছিল, তাহার মনের মধ্যে বিদ্যুৎগতিতে ছবি ভাসিয়া যাইতেছিল, সবই ওই সারী ও কমল মাঝির স্মৃতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাহার মনে পড়িল, ওই সম্মুখের উঠানে যেখানে তাহার দৃষ্টি আবদ্ধ হইয়া আছে, ওইখানেই প্রথম দিন সে আসিয়া বসিয়াছিল। তখন চারিপাশে ছিল কাশ ও বেনাবন। সম্মুখে উবু হইয়া একখানা বিরাট পাথরের মত বসিয়া ছিল কমল। আর সম্মুখেই পরস্পরের গলা জড়াইয়া ধরিয়া দাঁড়াইয়া ছিল মেয়েগুলি, ঠিক মাঝখানে ছিল সারী।
