সেই দিনই গভীর রাত্রে অহীন্দ্র এবং উমাকে সঙ্গে করিয়া অমল আসিয়া উপস্থিত হইল। দুই বাড়িই প্রতীক্ষামান হইয়া ছিল, অহীন্দ্র ডাকিবামাত্র মানদা ছুটিয়া গিয়া দরজা খুলিয়া দিয়া হাসিমুখে বলিল, দাদাবাবু!
অহীন্দ্র উৎকণ্ঠিত হইয়া প্রশ্ন করিল, বাবা কেমন আছেন মানদা?
ভাল আছেন গো দাদাবাবু, সবই ভাল আছে। মানদার মুখে কৌতুক-সরস হাসি ঝলমল করিতেছিল।
তবে? এমনভাবে টেলিগ্রাম কেন করলে মানদা?
আপনার বিয়ে গো দাদাবাবু, উ-বাড়ির উমাদিদির সঙ্গে।
অহীন্দ্রের সর্বাঙ্গে একটা অদ্ভুত শিহরণ বহিয়া গেল, বুকের ভিতরটা এক অপূর্ব অনুভূতিতে চঞ্চল অস্থির হইয়া উঠিল। মুহূর্তে অনুভব করিল, উমাকে সে ভালবাসে–হ্যাঁ, সত্যিই সে ভালবাসে।
ঠিক এই সময়েই সুনীতি আসিয়া দাঁড়াইলেন, অতি মিষ্ট মৃদু হাসি হাসিয়া বলিলেন, আয়, বাড়ির ভেতরে আয়, আমরা জেগেই বসে আছি তোর জন্যে।
মায়ের মুখের দিকে চাহিয়া অহীন্দ্রের মনে পড়িয়া গেল দাদাকে; সুনীতির সুন্দর মুখখানির উপর তাঁহার জীবনের মর্মন্তুদ দুর্ভাগ্যগুলি কেমন একটি পরিস্ফুট বেদনার্ত সকরুণ ভঙ্গির ছাপ রাখিয়া গিয়াছে। সুনীতির মুখে বর্তমানের দীপ্ত আনন্দের উজ্জ্বলতা জ্বলজ্বল করিলেও তাঁহার মুখের দিকে চাহিলেই অতীত দুঃখের স্মৃতিগুলি মুহূর্তে জাগিয়া উঠে। বেদনার আবেগে অহীন্দ্রের বুক ভরিয়া উঠিল, সে কাতর স্বরে বলিয়া উঠিল, ছি ছি, এ করেছ কি মা? না না না, এ যে হয় না, হতে পারে না।
সুনীতি আশঙ্কায় চকিত হইয়া উঠিলেন, শঙ্কাতুর কণ্ঠে বলিলেন, কেন হয় না অহি? আমরা যে কথা দিয়েছি বাবা।
অহীন্দ্রের চোখ হইতে জল ঝরিয়া পড়িল, সে বলিল, দাদার কথা কি ভুলে গেলে মা?
সুনীতির মুখে একটা সকরুণ হাসি ফুটিয়া উঠিল, গাঢ় শীতের জোৎস্নার মত সে-হাসি- তীক্ষ্ণ কাতর স্পর্শময়ী অথচ উজ্জ্বল রূপ সে-হাসির, অহীন্দ্রের মাথাটি গভীর স্নেহে বুকে চাপিয়া ধরিয়া বলিলেন, তবু তোকে বিয়ে করতে হবে, উপায় নেই। এ তোর বাপ-মায়ের আজ্ঞাপালন; কোন অপরাধ তোকে স্পর্শ করবে না বাবা।
অহীন্দ্র মুখে কোন প্রশ্ন করিল না, কিন্তু সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে মায়ের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। সুনীতি বলিলেন, ঘরে আয়।
বাড়ির ভিতর উপরে অহীন্দ্রের ঘরে বসিয়া সুনীতি সমস্ত বুঝাইয়া বলিয়া বলিলেন, তোর বড় মা আমার দিদি, আমি স্থির জানি অহীন, তিনি বেঁচে নেই। কোন দুরন্ত অভিমানে তিনি আত্মহত্যা পর্যন্ত গোপন করেছেন, যার আঘাতে তোর বাপ এমন করে পাগল হয়ে গেছেন অহি। কিন্তু কলুষের কালি এ ওর মুখে মাখিয়ে, মানুষ ভগবানের পৃথিবীকে করে তুলছে সঙ-সার। সেখানে মানুষ তো রেয়াত কাউকে করে না, তারা তাঁর স্মৃতির ওপর কালি বুলিয়ে দিয়েছে বাবা। এ কালি তোমাকে আর উমাকেই মুছে তুলতে হবে।
অহীন্দ্র স্তব্ধ হইয়া অভিভূতের মত মায়ের কথা শুনিতেছিল। সুনীতি আবার একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া আবার বলিলেন, সেদিন উমার মা বললেন, তোর বড় মায়ের নাম করে যে, এ বিয়ে না হলে তিনি শান্তি পাচ্ছেন না, তাঁর গতি হচ্ছে না; এত বড় সত্যি কথা আর হয় না।
প্রথমেই পাত্র-আশীর্বাদ শেষ হইল। ইন্দ্র রায় সমারোহ করিয়া অহীন্দ্রকে আশীর্বাদ করিয়া গেলেন। তিনি রায়-বংশের প্রত্যেককে তাঁহার সঙ্গে পাত্র আশীর্বাদ করিতে চক্রবর্তী-বাড়ি যাইবার নিমন্ত্রণ জানাইলেন। চক্রবর্তী-বাড়িতে আহারের আয়োজন হইয়াছিল। ইন্দ্র রায়ের নায়েবের ভাইপো চক্রবর্তী-বাড়ির নূতন নায়েব; ইন্দ্র রায়েরই আদেশ অনুযায়ী সে সমস্ত বন্দোবস্ত করিতেছিল। সেই নায়েবই একদিন যোগেশ মজুমদারকে সুনীতির নাম করিয়া সাদর আহ্বান জানাইয়া আসিল, কর্তাবাবুর অবস্থা তো জানেন, গিন্নীমা বললেন, এ বাড়ির মর্যাদা জানেন এক আপনি, আপনি না গেলে এ-সব কাজ কি করে হবে?
মজুমদার কিছুক্ষণ স্তব্ধ হইয়া রহিল, তারপর বলিল, যাব আমি, বলবেন, আমার ক্ষমতায় যা হবে, তার কসুর আমি করব না।
আর ও-বাড়ির রায় মশায়ও একবার দেখা করবার জন্যে বার বার করে বলেছেন।
কে, ছোট রায় মশায়?
আজ্ঞে হ্যাঁ। তিনি তার ছেলেকেই পাঠাতেন, তা
বাধা দিয়া মজুমদার বলিল, না না না, আমি নিজেই যাব।
মজুমদার আসিতেই সাদর আহ্বান করিয়া রায় বলিলেন, তোমার মনটা সেদিন বড় পবিত্র ছিল যোগেশ, কথাটা মা তারা সত্যি প্রমাণ করে দিলেন। তোমাকে আমি বলেছিলাম, সত্যি হলে তুমি জানবে সর্বাগ্রে, সেটা আমার মনে আছে। এখন তোমাকে কিছু ভার নিতে হচ্ছে ভাই, চক্রবর্তী-বাড়ি তোমার পুরানো বাড়ি। ওখানকার কাজকর্মের ভার তোমাকেই নিতে হবে। আর কন্যা-আশীর্বাদ করতে রামেশ্বর তো আসতে পারছেন না, আশীর্বাদ করবেন ও বাড়ির কুলগুরু, তা সেদিন তুমি আসবে ও-বাড়ির প্রতিনিধি হয়ে।
মজুমদার মুখে কিছু বলিতে পারিল না, কিন্তু রায়ের কথা প্রাণপণে পালন করিবার চেষ্টা করিল এবং অকপট অন্তরেই চেষ্টা করিল।
কলের মালিক বিমলবাবুকে সাদরে আহ্বান করা হইয়াছিল। তিনিও পাত্র আশীর্বাদের আসরে উপস্থিত হইয়াছিলেন। ইন্দ্র রায় অকস্মাৎ একটা কাজ করিয়া বসিলেন; বিমলবাবুকে দেখিবামাত্র তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চাহিয়া কি ভাবিয়া লইলেন, তারপর ব্যস্তভাবে তাঁহার হাতে গোলাপজল-ভরা গোলাপপাশটি ধরাইয়া দিলেন এবং আতরদানবাহী চাকরটাকে তাঁহার সঙ্গে দিয়া বলিলেন, আপনি হলেন চক্রবর্তী-বাড়ির লোক, আমরা আজ আপনাদের কুটুম্ব এসেছি। আপনি আজ আমাদের খাতির করুন, আপনার খাতির করব আমি আমার বাড়িতে।
