আর কিন্তু কি হচ্ছে তোমার, বল?
সে কি। সে যদি!–সে না বললে
কে? কার কথা তুমি বলছ?
হেমাঙ্গিনী পিছন থেকে স্বামীকে আকর্ষণ করিয়া কথা বলিতে ইঙ্গিতে বারণ করিলেন, তারপর রামেশ্বরের আরও একটু কাছে আসিয়া বলিলেন, বলেছে, সেও বলেছে, হাসিমুখে বলেছে।
রামেশ্বরের চোখ হইতে টপটপ করিয়া জল ঝরিয়া পড়িল, চোখের জলের মধ্যে ম্লান হাসি হাসিয়া এবার তিনি বলিলেন, সে কি অনুমতি দিয়েছে? আপনাকে বলেছে?
হ্যাঁ। এ বিয়ে না হলে তার গতি হচ্ছে না, সে শান্তি পাচ্ছে না। হেমাঙ্গিনীও এবার কাঁদিয়া ফেলিলেন।
ইন্দ্র রায় সজল চক্ষে উপরের দিকে মুখ তুলিয়া ডাকিলেন, তারা তারা মা!
দুর্বল রামেশ্বর আর আত্মসংবরণ করিতে পারিলেন না; দরদর ধারায় চোখের জলে বুক ভাসিয়া গেল। হেমাঙ্গিনী তাঁহাকে সান্তনা দিয়া বলিলেন, অধীর হবেন না চক্রবর্তী মশায়।– বলিয়া তিনি সুনীতির পরিত্যাক্ত পাখাখানা তুলিয়া লইয়া বাতাস করিতে আরম্ভ করিলেন। ধীরে ধীরে আত্মসম্বরণ করিয়া রামেশ্বর হেমাঙ্গিনীকে বলিলেন, আপনি একটা কথা তাকে বলবেন? একটি কবিতা। বলবেন।
গিরৌ কলাপী গগনে চ মেঘো লক্ষান্তরেহর্ক সলিল চ পদ্মম্।
দ্বিলক্ষ দূরে কুমুদস্যনাথো যো যস্য মিত্র ন হি তস্য দূরম্।
হেমাঙ্গিনী অশ্রুসজল চোখে বহুকষ্টে আত্মসম্বরণ করিয়া বলিলেন, বলব।
তারপর কিছুক্ষণের জন্য ঘরখানা একেবারে স্তব্ধ হইয়া গেল। সে স্তব্ধতা ভঙ্গ করিয়া হেমাঙ্গিনীই আবার বলিলেন, তা হলে আমাদের কথার কি বলছেন বলুন?
রামেশ্বর বলিলেন, ও, হ্যাঁ হ্যাঁ। উমা, উমা, পর্বতদুহিতা উমার মতই সে পুণ্যবতী। ইন্দ্র ইষ্টদেবীর আদেশ পেয়েছে, আপনি তার অনুমতি পেয়েছেন, এ যে আমারই মহাভাগ্য রায়-গিন্নী। চক্রবর্তী-বাড়িতে লক্ষ্মীর প্রত্যাগমনের সময় হয়েছে। সুনীতি! কই, শাঁখ বাজাও
রামেশ্বরের পিছনে আত্মগোপন করিয়া সুনীতি বিরামহীন ধারায় কাঁদিয়া চলিয়াছিলেন, স্বামীর শেষ কথাটির পর আর তিনি থাকিতে পারিলেন না, অতি মৃদুস্বরে করুণতম বিলাপধ্বনিতে তাঁহার বুকের কথা মুখে ফুটিয়া বাহির হইয়া আসিল, মহীন, আমার মহীন!
***
মুহর্তে ঘরখানা স্তব্ধ হইয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে মনে হইল, ঘরের মৃদু আলোটুকু পর্যন্ত কেমন বিবর্ণ হইয়া গিয়াছে। হেমাঙ্গিনী, ইন্দ্র রায় অপরিসীম বেদনার আত্মগ্লানিতে যেন মাটির সঙ্গে মিশিয়া যাইতেছিলেন, রামেশ্বর আবার বিহ্বল দৃষ্টিতে চাহিয়া নীরবে বসিয়া ছিলেন। সুনীতির কণ্ঠও স্তব্ধ হইয়া গিয়াছিল। মুখে দীর্ঘ অবগুণ্ঠন টানিয়া তিনি নিশ্চল হইয়া বসিয়া ছিলেন, যেন কত অপরাধ হইয়া গিয়াছে মুহর্তের অসংযমে। এই স্তব্ধতার মধ্যে সুনীতির সেই মৃদু বিলাপের কয়টি কথার সকরুণ ধ্বনি যেন প্রতিধ্বনিত পুঞ্জীভূত হইয়া সমস্ত ঘরখানাকে পরিপূর্ণ করিয়া ভরিয়া দিয়াছে; নিশীথযাত্রীর নীরবতার মধ্যে মাটির বুকে কীটপতঙ্গের রব ধ্বনির নিরবিচ্ছিন্ন একটি উদাস সুরে যেমন পৃথিবীর বুক হইতে অসীম শূন্য পর্যন্ত পরিপূর্ণ করিয়া দেয়।
কিছুক্ষণ পর রামেশ্বর বলিলেন, মহীন! হ্যাঁ হ্যাঁ, মহীন। আচ্ছা, দ্বীপান্তরে এক রকম পাতা পাকিয়ে দড়ি করতে দেয়, যাতে হাতে কুষ্ঠ হয়, না?
রায় বলিলেন, আঃ রামেশ্বর, তুমি মনকে একটু দৃঢ় কর ভাই। ও সব মিথ্যা কথা।
হেমাঙ্গিনী একটা গভীর দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বিবর্ণ মুখে অতি কষ্টে একটু হাসির সৃষ্টি করিয়া বলিলেন, বেশ তো, সম্বন্ধ হয়ে যাক।
রামেশ্বর বলিলেন, না না না। এ-বিয়ে না হলে সে যে শান্তি পাচ্ছে না, তার যে গতি হচ্ছে না। রায় গিন্নী বলেছেন, রায়-গিন্নী
রায় বলিলেন, না না। হবে, দু দিন পরেই হবে। তুমি ব্যস্ত হয়ো না।
সুনীতি অন্দরের মধ্যে নির্বাসিতার মত নিতান্ত একাকিনী বাস করিলেও বায়ুতরঙ্গ ধ্বনি বহন করিয়া আনিয়া কানে তুলিয়া দেয়। এই অপমানকর রটনার ধ্বনির ক্ষীণ প্রতিধ্বনি কানে আসিয়া পৌঁছিয়াছিল। এখন হেমাঙ্গিনীর কথা- ‘এ বিবাহ না হইলে রাধারাণী শান্তি পাইতেছে না, তাঁহার গতি হইতেছে না’, ইহার মধ্য হইতে সহজেই তিনি একটি গূঢ় অর্থ উপলব্ধি করিলেন। রাধারাণীকে লইয়া রায়-বাড়ির লজ্জা সময়ক্ষেপের ক্ষয়ে ক্ষয়িত হইয়া ইন্দ্র রায়কে মাথা তুলিবার অধিকার দিয়াছিল, কিন্তু রায়-বাড়ির জীবন গণ্ডীর মধ্যে অনধিকার প্রবেশ করিয়া তিনি এবং অহীন্দ্রই আবার সে ক্ষয়িত লজ্জাকে দ্বিগুন করিয়া তুলিয়াছেন, পুরানো লজ্জা আরও নূতন হইয়া উঠিয়াছে। সে আত্মগ্লানি এবং লজ্জাতেই সুনীতি অপরাধিনীর মত স্তব্ধ হইয়া গিয়াছিলেন। তিনি ধীরে মৃদুস্বরে ইন্দ্র রায় এবং স্বামীর সমক্ষেই ডাকিলেন, দিদি!
হেমাঙ্গিনী সচকিত হইয়া সুনীতির মুখের দিকে চাহিলেন, দেখিলেন, অনবদ্য প্রশান্তির একটি ক্ষীণ হাস্যরেখা সুনীতির মুখে নিশান্তের ক্ষীণ প্রসন্নতার মত ফুটিয়া উঠিয়াছে। সুনীতি বলিলেন, না দিদি, হোক, বিয়ে হোক। আমি একা আর থাকতে পারছি না। মহীন যখন ফিরে আসবে, তখন তার বিয়ে দিয়ে আবার আনন্দ করব। সুখের মধ্যে হঠাৎ তাকে আমার মনে পড়ে গিয়েছিল। হোক, হোক, বিয়ে হোক।
কিছুক্ষণ স্তব্ধ থাকিয়া রায় বলিলেন, তোমার মঙ্গল হবে বোন, তুমি আমাকে সত্য-লজ্জা না হোক লোকলজ্জার হাত থেকে ত্রাণ করলে। সুনীতি উঠিয়া বলিলেন, ঠাকুরের পুজোর টাকা তুলে আসি দিদি, আর মানদাকে বলি, শাঁখ বাজাক, বাজাতে হয়। আপনি একটু বসুন দিদি, মিষ্টিমুখ করে যেতে হবে।
২৬-৩০. হাউইয়ে আগুন ধরিলে
হাউইয়ে আগুন ধরিলে সে যেমন আত্মহারা উন্মত্ত গতিতে ছুটিয়া চলে, ইন্দ্র রায়ও ইহার পর তেমনি দুরন্ত গতিতে ধাবমান হইলেন। রাধারাণীর নিরুদ্দেশের ফলে যে অপমান বারুদের মত সর্বনাশা ক্ষোভ লইয়া বুকের মধ্যে পুঞ্জীভূত হইয়াছিল, সে অপমানের বারুদস্তূপকে ভস্মীভূত করিয়া ইন্দ্র রায়ের বংশকে অগ্নিশুদ্ধ করিয়া লইবার উপযুক্তমত নিষ্কলুষ অগ্নিকণা দিতে পারিত একমাত্র চক্রবর্তী-বংশই, সেই পরম বাঞ্ছিত অগ্নিকশার সংস্পর্শ পাইয়া ইন্দ্র রায়ের এমনি ভাবে অপূর্ব আনন্দে বহ্নিমান হইয়া দশ দিক প্রতিভাত করিয়া তোলাই স্বাভাবিক। সংসারে স্বভাবধর্মের বিপরীত কিছু কদাচিৎ ঘটিয়া থাকে, ইন্দ্র রায় স্বভাবধর্মের আবেগেই ছুটিয়াছিলেন। অগ্রহায়ণের আর ছয়টা দিন মাত্র অবশিষ্ট ছিল, ইহারই মধ্যে তিনি পাত্র-কন্যা আশীর্বাদ অনুষ্ঠান শেষ করিয়া ফেলিলেন। সুনীতির নাম দিয়া অহীন্দ্রকে টেলিগ্রাম করা হইল, ইন্দ্র রায় নিজে টেলিগ্রাম করিলেন অমলকে, অবিলম্বে উমাকে সঙ্গে লইয়া চলিয়া এস।
