রায়ের চোখের জল এবার আর বাধ মানিল না, টপটপ করিয়া মেঝের উপর ঝরিয়া পড়িল, অশ্রু আবেগজড়িত কণ্ঠে তিনি বলিলেন, না না রামেশ্বর, ও-কথা বলো না তুমি, তোমাকে সুস্থ হতে হবে। আর তোমার হয়েছেই বা কি?
রামেশ্বর ঘৃণায় মুখ বিকৃত করিয়া বলিলেন, দেখতে পাচ্ছ না?-বলিয়া হাত দুইখানি আলোর সম্মুখে প্রসারিত করিয়া ধরিলেন।
রায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আঙুলগুলির দিকে চাহিয়া দেখিলেন; প্রদীপের আলোকের আভায় শুভ্র, শীর্ণ, অকুণ্ঠিত-অবয়ব আঙুলগুলির ভিতরের রক্তধারা পর্যন্ত পরিস্কার দেখা যাইতেছে। রায় একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিয়া দৃঢ়স্বরে বলিলেন, না, তোমার কিছু হয় নি, ও কেবল তোমার মনের ব্যাধি। মনকে তুমি শক্ত কর। তুমি সুস্থ হয়ে ওঠ; তোমার ছেলের বিয়ে দাও, স্ত্রী পুত্র-পুত্রবধূ নিয়ে আনন্দ কর।
রামেশ্বর অকস্মাৎ যেন কেমন হইয়া গেলেন, অর্থহীন দৃষ্টিতে শূন্য-লোকের দিকে বিহ্বলের মত চাহিয়া রহিলেন, ঠোঁট দুইটি ঈষৎ নড়িতে লাগিল, আপন মনেই তিনি যেন কিছু বলিতেছিলেন।
রায় রামেশ্বরের এই অসুস্থ অবস্থা দেখেন নাই, তিনি প্রথম দেখিয়া শঙ্কিত হইয়া পড়িলেন, শঙ্কিত হইয়াই তিনি ডাকিলেন, রামেশ্বর! রামেশ্বর!
ধীরে ধীরে দৃষ্টি ফিরাইয়া রামেশ্বর রায়ের দিকে চাহিলেন; রায় বলিলেন, কি বলছ?
বলছি? ডাকছি, ভগবানকে ডাকছি, বলছি, ‘তমসো মা জ্যোতির্গময়ঃ’। এ অন্ধকারের মধ্যে আর থাকতে পারছি না।
হেমাঙ্গিনী এবার সম্মুখে অগ্রসর হইয়া আসিলেন; ইন্দ্র রায় ও রামেশ্বরের কথাবার্তার ভিতর দিয়া অবস্থাটা ক্রমশঃ যেন অসহনীয় বায়ুলেশহীন অন্ধকারলোকের দিকে চলিয়াছে। দীর্ঘকাল পরে দুই বন্ধু এবং পরম আত্মীয়ের দেখা হওয়ার ফলে উভয়েই আত্মসংযম হারাইয়া স্মৃতির বেদনার তীব্র আবর্তের মধ্যে অসহায়ের মতই আবর্তিত হইয়া ভাসিয়া চলিয়াছেন। রামেশ্বরের পক্ষে এ অবস্থাটা অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু উচ্ছ্বাসই কথাবার্তাকে টানিয়া লইয়া চলিয়াছে, রায় কথাকে টানিয়া নিজের পথে চালিত করিতে পারিতেছেন না। এ ছাড়া, এই অবস্থাটাও আর সহ্য হইতেছে না। এই বেদনাদায়ক অবস্থাটিকে স্বাভাবিক করিয়া তুলিয়া তাহার মধ্যে একটু আনন্দ সঞ্চার করিবার জন্যই তিনি সম্মুখে আসিয়া বলিলেন, আমি কিন্তু এবার রাগ করব চক্রবর্তী মশায়, আপনি আমাকে এখনও একটি কথাও বলেন নি।
রামেশ্বর ঈষৎ চকিত হইয়া হেমাঙ্গিনীর দিকে দৃষ্টি ফিরাইলেন, সঙ্গে সঙ্গে গভীর বিষণ্ণতার মধ্য হইতেও আনন্দে একটু চঞ্চল এবং সজীব হইয়া উঠিলেন। হেমাঙ্গিনীর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা এবং প্রীতির সীমা ছিল না। নিস্তরঙ্গ স্তব্ধতার মধ্যে মৃদু বাতাসের আকস্মিক সঞ্চরণে সব যেমন স্নিগ্ধ সানন্দ চাঞ্চল্যে সজীব হইয়া উঠে, হেমাঙ্গিনীর সস্নেহ সরস কৌতুকে সমস্ত ঘরখানাই তেমনি চঞ্চল সজীব হইয়া উঠিল। রামেশ্বর সত্য সত্যই এতক্ষণ হেমাঙ্গিনীকে লক্ষ্য করেন নাই। দীর্ঘকাল পরে ইন্দ্র রায় ছাড়া অন্য সকল কিছু স্থান কাল পাত্র তাঁহার দৃষ্টির সম্মুখ হইতে বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছিল। হেমাঙ্গিনীর কথায় রামেশ্বর তাঁহাকে লক্ষ্য করিলেন, সঙ্গে সঙ্গে মুখ তাঁহার আনন্দে উজ্জ্বল হইয়া উঠিল, সস্নেহে সম্ভ্রমের সহিত মৃদু হাসিয়া তিনি বলিলেন,
‘স্বপ্নে নু মায়া নু মতিভ্রমো নু কপ্তং নু তাবৎ ফলমেব পুণ্যৈঃ’।
এ আমার স্বপ্ন না মায়া, না মনের ভ্রম, কিংবা কোন পুণ্যফলের ক্ষণিক সৌভাগ্য, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আপনি এসেছেন?
হেমাঙ্গিনী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিয়া অকপট আনন্দে কৌতুক করিয়া বলিলেন, আমি কিন্তু স্বপ্নও নই, মায়াও নই, পুণ্যফলের সৌভাগ্য না কি বললেন, তাও নই। আমি আপনার কুটুম্বিনী। আপনি পণ্ডিত লোক, কবি মানুষ, কবিতা দিয়ে আসল কথা চাপা দিলেন। কথা তো আমিই যেচে কইলাম, আপনি তো কথা বলেন নি।
রামেশ্বর হাসিয়া বলিলেন, তা হলে বুঝতে পারছি, জীবনে সাগরতুল্য অপরাধের মধ্যেও কোথাও ক্ষুদ্রতম প্রবালদ্বীপের মত কোন একটি পূণ্যফল অক্ষয় হয়ে আছে, যার ফলে দেবীকে নিজে এসে দর্শন দিতে হল এবং ভক্তের সঙ্গে যেচেই কথা কইতে হল। ওর জন্যে আপনি নিজেও আক্ষেপ করবেন না, আমার প্রতিও অনুযোগ করবেন না; কারণ আপনি দেবধর্ম পালন করেছেন, আমিও ভক্তের অভিমান বজায় রেখেছি।
রামেশ্বরের কথা শুনিয়া রায় আশ্বস্ত হইলেন, কিন্তু বেদনা অনুভব না করিয়া পারিলেন না। স্বাভাবিক তীক্ষ্ণ বুদ্ধির পরিচায়ক উত্তর শুনিয়া তিনি আশ্বস্ত হইলেন, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই মনে হইল, কল্পনায় ব্যাধির সৃষ্টি, রামেশ্বরের আপনাকে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করার এই প্রয়াস-এ শুধু রাধারাণির অভাব। রাধারাণিকে হারাইয়া আজ এই অবস্থা, একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলিতে গিয়া সেটাকে তিনি রুদ্ধ করিলেন। রামেশ্বরের পাশে বসিয়া অবনতমুখী সুনীতি ব্যথিত মুখেও হাসি মাখিয়া ধীরসঞ্চালনে পাখার বাতাস করিয়া চলিয়াছেন। সুনীতির দিকে চাহিয়া, তাঁহার কথা ভাবিয়া রায়ের বেদনার বাষ্প জমিয়া পাথর হইয়া গেল। দীর্ঘনিঃশ্বাস রোধ করিয়াও একটি অসম্বৃত মুহূর্তে গম্ভীর স্বরে তিনি ডাকিয়া উঠিলেন, তারা, তারা মা!
ঘরখানা সে গম্ভীর স্বরের ডাকে মুহর্তে আবার গম্ভীর হইয়া উঠিল। রামেশ্বর একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিলেন, হেমাঙ্গিনী স্তব্ধ হইয়া গেলেন, সুনীতি উদাস হইয়া সকলের দিকে কোমল করুণ দৃষ্টি মেলিয়া চাহিয়া রহিলেন।
