রায়ের সন্ধ্যা-উপাসনা তখন অর্ধসমাপ্ত, দ্বিতীয় পাত্র কারণ পান করিয়া জপে বসিয়াছেন। গদগদস্বরে ইষ্টদেবীকে বার বার ডাকিতেছেন, মা আমার রণরঙ্গিনী মা! ধনী মুখার্জির সহিত দ্বন্দসম্ভাবনায় বহুকাল পরে গোপন ও উত্তেজনাবশে আজ ওই রূপ ওই নামটিই তাহার কেবল মনে পড়িতেছে।
সহসা বাড়ির উঠানে কাংস্যকণ্ঠে কে চীৎকার শুরু করিয়া দিল, হায় হায় গো! মরে যাই, মরে যাই! আহা গো! ‘পিড়ি পেতে করলাম ঠাঁই, বাড়া ভাতে পড়ল ছাই।’ দিলে তো চক্কবর্তীরা ঝামা ঘষে? হয়েছে তো? নাবালক শরিককে ফাঁকি দেওয়ার ফল ফলল তো? ঈর্ষাতুরা মেয়েটির পথে পথে চীৎকার করিয়াও তৃপ্তি হয় নাই, সে রায়ের অন্দরে আসিয়া হেমাঙ্গিনীর সম্মুখে হাত নাড়িয়া কথাগুলি শুনাইতেছে।
রায়ের ভ্রূ কুঞ্চিত হইয়া উঠিল, পরক্ষণেই আপনাকে তিনি সংযত করিলেন, ধীর স্থির ভাবে ইষ্ট দেবীকে স্মরণ করিবার চেষ্টা করিলেন।
নীচে হেমাঙ্গিনীর মুখের কাছে হাত নাড়িয়া ভঙ্গি সহকারে নাবালকের অভিভাবিকাটি তখনও বলিতেছিল, তাই বলতে এলাম, বলি, একবার বলে আসি। আমার নাবালককে যে ফাঁকি দেবে, ভগবান তাকে ফাঁকি দেবে। আঃ, হায় হায় গো! হায় হায়! সে যেন নাচিতে আরম্ভ করিল।
হেমাঙ্গিনী ব্যাপারটার আকস্মিকতায় এবং রূঢ়তায় অভিভূত হইয়া পড়িয়াছিল, শঙ্কায় বিস্ময়ে কম্পিত মৃদুকণ্ঠে তিনি বলিলেন, কি বলছ তুমি?
ইতর ভঙ্গিতে ব্যঙ্গ করিয়া বিধবাটি বলিল, আ মরে যাই! কিছু জানেন না কেউ! বলি, চক্কবর্তী বাড়ির রাঙা বর জুটল না তো মেয়ের কপালে? দিয়েছে তো চক্কবর্তীরা হাঁকিয়ে? বলি, কোন মুখে তোরা আবার গিয়েছিলি তাই শুনি? এই বাড়ির মেয়ে নাকি আবার চক্কবর্তীরা নেয়! বলে যে, ‘সেই-মিনসে নেয় না বসতে পাশে, মাগী বলে আমার ভালবাসে’ সেই বিত্তান্ত। আঃ হায় হায় গো! ফসকে গেল এমন সুযোগ! অকস্মাৎ তাহার কণ্ঠস্বর অত্যন্ত রূঢ় হইয়া উঠিল, যা চর ঢুকিয়ে দিগে চক্কবর্তীদের বাড়িতে! মেয়ে-জামায়ের জন্য লগর বসালেন! আঃ হায় হায়! হায় হায় গো!
সে যেমন নাচিতে নাচিতে আসিয়াছিল তেমনি নাচিতে নাচিতেই চলিয়া গেল। চৈতন্যহারা হেমাঙ্গিনী মাটির পুতুলের মতই বসিয়া রহিলেন। উপর হইতে গভীর দীর্ঘ কণ্ঠের ধ্বনি ভাসিয়া আসিল, তারা, তারা মা। সমস্ত বাড়িটার মধ্যে সে ধ্বনি প্রতিধ্বনির মত ঝঙ্কারে সুগম্ভীর হইয়া বাজিয়া উঠিল।
কিছুক্ষণ পর সিঁড়ির উপরে খড়মের শব্দ ধ্বনিত হইয়া উঠিল। সন্ধ্যা-উপসনার পর বিশেষ প্রয়োজন হইলে রায় নীচে নামেন না। আজ রায় নীচে নামিলেন, হেমাঙ্গিনী কিন্তু তবুও সচেতন হইয়া উঠিতে পারিলেন না। রায় নীচে নামিয়া ডাকিলেন, হেম! এ ডাক তাঁহার আদরের ডাক।
হেমাঙ্গিনী সাড়া দিতে পারিলেন না। রায় বলিলেন, উঠতে হবে যে হেম। উঠে একখানা ভাল কাপড় পর দেখি। আমার শালখানাও বের করে দাও।
একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া হেমাঙ্গিনী এবার উঠিয়া দাঁড়াইলেন। রায় বলিলেন, একটু শিগগির কর হেম, মাহেন্দ্রযোগ খুব বেশিক্ষণ নেই।
হেমাঙ্গিনী এতক্ষণে প্রশ্ন করিলেন, কোথায় যাবে?
হাসিয়া রায় বলিলেন, মা আমার আজ অনুমতি দিয়েছেন হেম। যাব রামেশ্বরের কাছে, উমার বিয়ের সম্বন্ধ করতে। ভাল কাপড় পর একখানা, আমার শালখানাও দাও।
হেমাঙ্গিনীর মুখ এবার উজ্জ্বল হইয়া উঠিল, সোনার উমা, সোনার অহীন্দ্র তাঁহার। গোপন মনে এ-কথা তাহার কত বার মনে হইয়াছে।
চাকর চলিয়াছিল আলো লইয়া, চাপরাসী ছিল পিছনে। সুদীর্ঘ কাল পরে ইন্দ্র রায় চক্রবর্তী-বাড়ির দুয়ারে আসিয়া ডাকিলেন, কণ্ঠস্বর কাঁপিয়া উঠিল, রামেশ্বর!
সঙ্গে সঙ্গে প্রতিধ্বনির মতই একটা ধ্বনি ভাসিয়া আসিল, কে? বিচিত্র সে কণ্ঠস্বর!
রায় উত্তর দিলেন, আমি ইন্দ্র।
.
২৫.
বিশীর্ণ ন্যুব্জদেহ, রক্তহীনের মত বিবর্ণ পাংশু, এক পলিতকেশ বৃদ্ধ বিস্ফারিত দৃষ্টিতে চাহিয়া-দাঁড়াইয়া থরথর করিয়া কাঁপিতেছিলেন। উত্তেজনার অতিশয্যে কঙ্কালসার বুকখানা হাপরের মত উঠিতেছে নামিতেছে। হেমঙ্গিনী সুনীতিকে বলিলেন, ধর, ধর সুনীতি, হয়তো পড়ে যাবেন উনি।
ইন্দ্র রায় বিস্ময়ে বেদনায় স্তম্ভিত হইয়া গেলেন,- এই রামেশ্বর! কৌতুকহাস্যে সমুজ্জল, স্বাস্থ্যবান, সুপুরুষ, বিলাসী রামেশ্বর এমন হইয়া গিয়াছে! সে রামেশ্বরের একটুকু অবশেষও কি আর অবশিষ্ট নাই! তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চাহিয়া রায় দেখিলেন, আছে কঠোর বাস্তব একটি মাত্র পরিচয়-চিহ্ন অবশেষ রাখিয়াছে, চোখের পিঙ্গল তারা দুইটি এখনও তেমনি আছে। কয়েক মুহূর্ত পর রায় দেখিলেন, না, তাও নাই; চোখের তারা তেমনি আছে, কিন্তু পিঙ্গল তারার সে দ্যুতি আর নাই। সুরহারা গানের মত অথবা রসহীন রূপের মতই সকরুণ তাহার অবস্থা।
ধীরে ধীরে রামেশ্বরের উত্তেজনা শান্ত হইয়া আসিতেছিল। খাটের বাজু ধরিয়া দেহের কম্পন তিনি রোধ করিয়াছিলেন; কেবল ঠোঁটের সঙ্গে চিবুক পর্যন্ত অংশটি এখনও থর থর করিয়া কাঁপিতেছে, পিঙ্গল চোখে জল টলমল করিতেছে। হেমাঙ্গিনী সুনীতিকে বলিলেন, একটু বাতাস কর তুমি।
ইন্দ্র রায়েরও চোখে জল ভরিয়া উঠিল, কোনরূপে আত্মসম্বরণ করিয়া তিনি বলিলেন, কেমন আছ?
চোখে জল এবং কম্পিত অধর লইয়াই রামেশ্বর হাসিলেন; ইন্দ্র রায়ের কথার উত্তর দিতে গিয়া অকস্মাৎ তাঁহার রঘুবংশের মহারাজ অজের শেষ অবস্থা মনে পড়িয়া গেল, সেই শ্লোকের একটা অংশ আবৃত্তি করিয়াই তিনি বলিলেন, ‘প্লক্ষ প্ররোহ ইব সৌধতলং বিভেদ’। ব্যাধি বটবৃক্ষের মত দেহমন্দিরে ফাট ধরিয়ে মাথা তুলেছে ইন্দ্র। এখন ভূমিস্মাৎ হাবার অপেক্ষা।
