অসমাপ্ত কথা সে আকর্ণ-বিস্তার হাসিয়া সমাপ্ত করিল
অচিন্ত্যবাবু আবার একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন লাভ এবার তোমার ভালই হবে, বুঝলে কিনা ও-পাররের চরে কল বসছে, চিনির কল। লোকজনের আনাগোনা দেখতে দেখতে বেড়ে যাবে তোমার।
ঠিকাদার সবিস্ময়ে অচিন্ত্যবাবুর মুখের দিকে চাহিয়া বলিল, কল? চিনির কল?
হ্যাঁ, চিনির কল। কাল কলকাতা থেকে মস্ত এক মহাজন এসেছে, সঙ্গে একটি ছালা টাকা। আমি নিজের চোখে দেখেছি। কাল আমার ছোট রায়ের বাড়িতে নেমন্তন্ন ছিল কিনা।
ঠিকাদার কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল, আচ্ছা, ই টাকা কে পাবে? চরটা তো চক্কবর্তী-বাড়িরই সবাই বলছে; তা ছোট রায় মশায়ের বাড়িতে
ছোট রায় মশায়ই আজকাল ওদের কর্তা। উনি সব দেখাশোনা করছেন যে।
বার বার ঘাড় নাড়িয়া ঠিকাদার বলিল, বটে, আজ্ঞে বটে। তা দেখলাম কাল, এইখানেই চক্কবর্তী বাড়ির ছোটকা আর রায় মশায়ের ছেলে বসে ছিল অ্যানেকক্ষণ; খুব ভাব দেখলাম দুজনায়। অ্যানেক কথা হল দুজনায়।
হুঁ। অচিন্ত্যবাবু খুব গম্ভীর হইয়া বলিলেন, হুঁ। আচ্ছা, কি কথা দুজনায় হচ্ছিল বল তো? কথা? স্বদেশীর কথা? মানে, সায়েবদের তাড়াতে হবে, বন্দেমাতরম্, মহাত্মা গান্ধীকি জয়, এই সব কথা হচ্ছিল?
আজ্ঞে না। আমি তো দূরে বসে ছিলাম। খুব খানিক কান বাজিয়ে শুনলাম; কাল কথা হচ্ছিল আজ্ঞে, আমি আঁচে বুঝলাম, কথা হচ্ছিল আপনার, আচ্ছা উমা কার নাম বলেন তো? এই ছোট রায়ের ঝিউড়ী মেয়ে লয়?
হ্যাঁ হ্যাঁ। আমি তাকে পড়াতাম যে! বলিতে বলিতেই অচিন্ত্যবাবুর ভ্রূ কুঞ্চিত হইয়া উঠিল, বলিলেন, মেয়েটাকে কলকাতায় পাঠিয়ে ধিঙ্গী করে তুললে। ছোট রায় বাইরে বাঘ, আর ভেতরে একেবারে শেয়াল বুঝলে কিনা, গিন্নীর কাছে একেবারে কেঁচো। মেয়েকে যে ভয় করে, তাকে আমি ঘেন্না করি, বুঝলে?
আজ্ঞে হ্যাঁ। তা, কাল আপনার ছোট রায়ের ছেলে চক্কবর্তী-বাড়ির ছোটকাকে ধরেছিল, বলে, তোমাকে তাকে বিয়ে করতে হবে।
বল কি?-অচিন্ত্যবাবু একেবারে তীরের মতো সোজা হইয়া দাঁড়াইয়া উঠিলেন। উপলব্ধি করার ভঙ্গিতে বার বার ঘাড় নাড়িয়া বলিলেন, ঠিক কথা। ইন্দ্র রায়ের মতলব এতদিন ঠাওর করতে পারছিলাম না। হুঁ। অহীন্দ্র ছেলেটি যে হীরের টুকরো ছেলে। এবারেও তোমার ফোর্থ হয়েছে ইউনিভার্সিটিতে। বটে! ঠিক শুনেছ তুমি?
আজ্ঞে হ্যাঁ। বয়সও হে অ্যানেকটা হল। মানুষ হাঁ করলেই বুঝতে পারি, কি বলবে। তা ছাড়া আপনার, রায় মশায়ের বুন। কুলের খুঁত ধরতে তো লোকে রায় মশায়েরই ধরবে।
ওরে বাপ রে বাপ রে! এই দেখ, কথাটা একেবারে ভুলেই গিয়েছিলাম আমি। তুমি তো ভয়ানক বুদ্ধিমান লোক। দেখ, তুমি ব্যবসা কর, তোমার নিশ্চয় উন্নতি হবে! আমার কাছে যাবে তুমি, তোমাকে আমি সঙ্গে নেব। বলো না যেন কাউকে, এই খসখসের ব্যবসা। খসখস বোঝ তো? খসখস হল বেনার মূল।
বেনার মূল?
হ্যাঁ। চুপ কর, সেজ রায়-বাড়ির হরিশ আসছে।
হরিশ রায় সেজ-রায়-বাড়ির একজন অংশীদার। সমস্ত রায় বংশের সিকি অংশের অধিকারী হইল সেজ তরফ, সেজ তরফের এক আনা অংশের অর্থাৎ ষোল আনা সম্পত্তির এক পয়সা রকমের মালিক হইলেন হরিশ রায়, এই এক পয়সা পরিমাণ জমিদারির অংশ লইয়া ভদ্রলোক অহরহই ব্যস্ত এবং কাজ লইয়া তাহার মাথা তুলিবারও অবসর থাকে না। কাগজের পর কাগজ তিনি তৈয়ারি করিয়া চলিয়াছেন। জমিদারির এককণা জমি যদি কেহ আত্মসাতের চেষ্টা করে, তবে তাহার আয়নার মত কাগজে তৎক্ষণাৎ তাহার প্রতিবিম্ব পড়িবেই।
কানে পৈতে জড়াইয়া গাড়ু হাতে হরিশ রায় একটা দাঁতন-কাঠি চিবাইতে চিবাইতে নদীর ঘাটে আসিয়া নামিলেন। অচিন্ত্যবাবুকে দেখিয়া মৃদু হাসিয়া বলিলেন, কি রকম, আজ যে এদিকে?
উদাসভাবে অচিন্ত্যবাবু বলিলেন, এলাম,
না, মানে এদিকে তো দেখি না বড়।
হ্যাঁ। বলিয়াই হঠাৎ যেন তিনি আসিবার কারণটা আবিস্কার করিয়া ফেলিলেন; বলিলেন, চরের উপর কল বসছে কিনা, চিনির কল-সুগার মিল। তাই ভাবলাম, দেখে আসি ব্যাপারটা কি রকম হবে।
কল? চিনির কল?-হরিশ রায়ের বিস্ময়ের আর অবধি রহিল না। চিনির কল করবে কে মশায়? এত টাকা কার আছে?
কাল রাত্রে কলকাতা থেকে এক মস্ত মহাজন এসেছে, সঙ্গে আপনার একটি বস্তা টাকা। আমি নিজে চোখে দেখেছি-ওন আইজ। ইন্দ্র রায় মহাশয়ের ওখানে কাল আমার নেমন্তন্ন ছিল কিনা।
ইন্দ্র? তা, ইন্দ্র চর বন্দোবস্ত করছে নাকি?
হ্যাঁ। উনিই তো এখন চক্রবর্তী বাড়ির সব দেখাশুনা করছেন। তিনি ভুরু নাচাইয়া মুচকি হাসিয়া ফেলিলেন। বলিলেন, হুঁ, কোন খোঁজই রাখেন না আপনারা?
হরিশ রায় বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়া ঘাড় নাড়িতে নাড়িতে বলিলেন, এই দেখুন, এমন খোঁজ নাই যা হরিশ রায়ের কাগজে নাই। বুঝলেন, নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর আমল থেকে ‘থাক’, নক্সা, জমাবন্দী, জরিপী, খতিয়ান, জমাওয়াশীল-বাকি সব আমার কাছে। কি বলব, পয়সা তেমন নাই হাতে, তা নইলে ‘চাকচান্দী’ লাগিয়ে দিতাম আমি। আর অন্যায় অধর্মও করতে চাই না আমি! যদি একটা কলম আমি খুঁচি, সব ত্রাহি ত্রাহি ডাক ছাড়বে। দেখি না, হোক না বন্দোবস্ত। আমরা এতদিন চুপ করেই ছিলাম, বলি চক্কবর্তীরা আমাদেরই দৌহিত্র, তা খাচ্ছে খাক। কিন্তু এ তো হবে না মশায়। উঁহু!
