সকৌতুক ঐ দুইটি ঈষৎ টানিয়া তুলিয়া রায় বলিলেন, বলেন কি?
আজ্ঞে হ্যাঁ। খসখস চালান দিতে হবে, খসখস বোঝেন তো?
তা বুঝি, বেনাঘাসের মূল।
অচিন্ত্যবাবু পরম সন্তুষ্ট হইয়া দীর্ঘস্বরে বলিলেন, হ্যাঁ। সাঁওতাল ব্যাটারা চর থেকে তুলে ফেলে দেয়, সেইগুলো নিয়ে আমরা সাপ্লাই করব। দেখুন হিসেব করে, লাভ কত হয়।
রায় জবাব দিলেন না, খানিকট্য হাসিলেন মাত্র। অন্দরের ভিতর হইতে শাঁখ বাজিয়া উঠিল, ঈষৎ চকিত হইয়া রায় চারিদিকে চাহিয়া দেখিলেন, সন্ধ্যা ঘনাইয়া আসিয়াছে, পশ্চিমদিগন্তে অল্পমাত্রায় রক্তসন্ধ্যার আভাস থাকায় অন্ধকার তেমন ঘন হইয়া উঠিতে পারে নাই। গভীরস্বরে তিনি ইষ্টদেবতাকে স্মরণ করিলেন, তারা তারা! তারপর অচিন্ত্যবাবুকে বলিলেন, তা হলে আপনি একটু নায়েবের সঙ্গে বসে গল্প করুন, আমি সান্ধ্যকৃত্য শেষ করে নিই।
অচিন্ত্যবাবু বলিলেন, একটি গোপন কথা বলে নিই। মানে মাংস হলেও একটুও দুধের ব্যবস্থা আমার চাই কিন্তু, ব্যাপারটা হয়েছে কি জানেন, দাঁত তুলে দিয়ে ডাক্তারেরা বলেন বটে, আর হজমের গোলমাল হবে না, আমি কিন্তু মশায়, অধিকন্তু না দোষায় ভেবে আফিং খানিকটা করে আরম্ভ করেছি। বুঝলেন, তাতেই হয়েছে কি, ওই গব্যরস একটু না হলে আবার ঘুম আসছে না।
রায় মৃদু হাসিয়া অন্দরের দিকে চলিয়া গেলেন। একজন চাকর প্রদীপ ও প্রধুমিত ধূপদানি লইয়া কাছারির দুয়ারে দুয়ারে সন্ধ্যা দেখাইয়া ফিরিতেছিল, অন্য একজন চাকর দুই-তিনটা লণ্ঠন আনিয়া ঘরে বাহিরে ছোট ছোট তেপেয়াগুলির উপর রাখিয়া দিল।
সমৃদ্ধ রায় বংশের ইতিহাস আরম্ভ হইয়াছে অন্ততঃ দুইশ বৎসর পূর্বে, হয়তো দশ-বিশ বৎসর বেশীই হইবে, কম হইবে না। তাহার পূর্বকাল হইতেই রায়েরা তান্ত্রিক দীক্ষায় পুরুষানুক্রমে দীক্ষিত হইয়া আসিতেছেন। ছোট রায়ের প্রপিতামহ অবধি তন্ত্রের একটা মোহময় প্রভাবে প্রভাবান্বিত ছিলেন; আজও গল্প শোনা যায়, আমাবস্যা অষ্টমী প্রভৃতি পঞ্চ পর্বে তাঁহারা শ্মশানে গিয়া জপতপ করিতেন। তাহারাও পুর্বে কেহ একজন নাকি লতাসাধনে সিদ্ধ হইয়া ছিলেন। যুগের প্রভাবে তন্ত্রের সেই মোহময় প্রভাব এখন আর নাই। কিন্তু তবুও তন্ত্রকে একেবারে তাঁহারা পরিত্যাগ করিতে করেন নাই। ইন্দ্র রায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় তন্ত্রমতে সায়ং সন্ধ্যায় বসেন, তখন গলায় থাকে রুদ্রাক্ষের মালা, কাঁধের উপর থাকে কালী-নামাবলী, সম্মুখে থাকে নারিকেলের খোলায় একটি পাত্র আর থাকে মদের বোতল ও কিছু খাদ্য-মৎস্য বা মাংস। এক-একবার নারিকেলের মালার পাত্রটি পরিপূৰ্ণ করিয়া জপতপ ও নানা মদাভঙ্গিতে তাহা শোধন করিয়া লইয়া পান করেন, করেন ধ্যান ও জপ; একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক জপ শেষ করিয়া আবার দ্বিতীয় বার পাত্র পূরণ করিয়া ওই ক্রিয়ারই পুনরাবৃত্তি করেন। এমনি ভাবে তিন বারে তৃতীয় পাত্র শেষ করিয়া তিনি সান্ধ্যকৃত্য শেষ করেন, কিন্তু ইহাতেও তাঁহার দেড় ঘন্টা হইতে দুই ঘন্টা কাটিয়া যায়, তিন পাত্রের অধিক তিনি সাধারণত পান করেন না।
হেমাঙ্গিনী স্বামীর সান্ধ্যকৃত্যের আয়োজন করিয়াই রাখিয়াছিলেন, ইন্দ্র রায় কাপড় বদলাইয়া আসন গ্রহণ করিতেই তিনি গৃহদেবী কালীমায়ের প্রসাদী কিছু মাছ আনিয়া নামাইয়া দিলেন। রায় বলিলেন, দেখ, অচিন্ত্যবাবুকে আজ নেমন্তন্ন করেছি, তার দুধ একটু ঘন করেই জ্বাল দিয়ে রেখো। ভদ্রলোক আফিং ধরেছেন, ঘন দুধ না হলে তৃপ্তি হবে না।
হাসিয়া হেমাঙ্গিনী বলিলেন, বেশ। কিন্তু আর কাউকে নেমন্তন্ন কর নি তো? তোমার তো আবার নারদের নেমন্তন্ন!
না! রায় একটু হাসিলেন।
হেমাঙ্গিনী বলিলেন, আজ তুমি কি এত ভাবছ বল তো?
নাঃ, ভাবি নি কিছু।
রায়ের কথার সুরের মধ্যে একটা ক্ষীণ ক্লান্তির আভাস ফুটিয়া উঠিল বলিয়া হেমাঙ্গিনীর মনে হইল। কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া কুণ্ঠিতভাবে হেমাঙ্গিনী বলিলেন, অমল ছেলেমানুষ, সে কাজটা ছেলেমানুষি করেই করেছে, সেটা
এইভাবে বাধা দিয়ে রায় বলিলেন, ও-কথা উচ্চারণ করো না হেম; তুমি কি আমাকে এমন সঙ্কীর্ণ ভাব? এই সন্ধ্যা করবার আসনে বসেই বলছি হেম, সত্যিই আমার আর কোন বিদ্বেষ নেই রামেশ্বর বা তার ছেলেদের ওপর। সুনীতির বড়ছেলে রাধারাণীর মর্যাদা রাখতে যা করেছে, তাতে রাধুর গর্ভের সন্তানের সঙ্গে তাদের কোন পার্থক্য আর থাকতে দেয় নি।
হেমাঙ্গিনী চুপ করিয়া রহিলেন, কোন উত্তর দিতে মন যেন তাঁহার সায় দিল না। রায় হাসিয়া বলিলেন, তা হলে আমি সন্ধ্যাটা সেরে নিই, তুমি নিজে দাঁড়িয়ে রান্নাবান্নাটা দেখে দাও বরং ততক্ষণ।
হেমাঙ্গিনী চলিয়া গেলেন।
রায় একটা গভীর দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া ইষ্টদেবীকে পরম আন্তরিকতার সহিত স্মরণ করিয়া ডাকিয়া উঠিলেন, তারা, তারা। সবই তোমার ইচ্ছা মা। তারপর তিনি শাস্ত্রবিধান-অনুযায়ী ভঙ্গিতে আসন করিয়া সান্ধ্যকৃত্য আরম্ভ করিলেন।
হেমাঙ্গিনীর ভুল হইবার কথা নয়। দুর্দান্ত কৌশলী হইলেও ইন্দ্র রায় হেমাঙ্গিনীর নিকট ছিলেন শান্ত সরল উদার। একবিন্দু কপটতার ছায়া কোনদিন তাঁহার মনোতল ছায়াবৃত করিয়া হেমাঙ্গিনীর দৃষ্টিকে বিভ্রান্ত বা প্রতারিত করে নাই। অমল অহীন্দ্রকে নিমন্ত্রণ করিয়াছে, এ সংবাদ শুনিবামাত্র রায়ের ঐ ভ্রূ কুঞ্চিত হইয়া উঠিয়াছিল। প্রকাশ্যভাবে ঘোষণা করিয়া সামাজিক নিমন্ত্রণ ব্যবহার বন্ধ না হইলেও, ছোট রায়-বাড়ি ও চক্রবর্তী-বাড়ির মধ্যে আহার-ব্যবহারটা রাধারাণীর নিরুদ্দেশের পর হইতে প্রকৃতপক্ষে বন্ধই ছিল। সামাজিক ক্রিয়াকলাপে দুই বাড়িই ব্রাহ্মণ কর্মচারী বা আপন আপন পূজক ব্রাহ্মণ পাঠাইয়া সামাজিক দায়িত্ব রক্ষা করিতেন।
