অহীন্দ্র বলিল, না, তাতে ওরা দুঃখ পাবে। তোমাদের বাড়িতেই দিয়ে যাক।
বেশ, তা হলে তোমাকেও আমাদের ওখানে খেতে হবে।
খাব।
হাসিয়া অমল বলিল, তা হলে তুমি জাপানী বৌদ্ধ।
অহীন্দ্র এবার অল্প একটু হাসিল, হাসিয়া বলিল, দিনে না রাত্রে খাব কিন্তু; দিনে রান্না করতেও দেরিও হবে। আর মায়ের রান্নাবান্না বোধহয় হয়েই গেছে।
মেয়েগুলি কথা না বুঝিয়াও এতক্ষণে অকারণে হাসিয়া উৎফুল্ল এবং সহজ হইয়া উঠিল। সারী বলিল, তাই দিব তবে রায় মহাশয়ের বাড়িতে রাঙাবাবু?
হ্যাঁ।
মেয়ের দল কলরব করিতে করিতে চলিয়া গেল। অমল বলিল, চল তা হলে আমরাও যাই।
ঘাটের ঠিকাদার ঠিক সময়ে কখন আসিয়া দাঁড়াইয়াছিল, সে জোড়হাত করিয়া বলিল, বাবু তা হলে আমার আরজির কথাটা মনে রাখবেন।
.
২০.
সেদিন অপরাহ্নে দুর্যোগটা সম্পূর্ণ না কাটিলেও স্তিমিত হইয়া আসিল। বর্ষণ ক্ষান্ত হইয়াছে, পশ্চিমের বাতাস স্তব্ধ হইয়া দক্ষিণ দিক হইতে মৃদু বাতাস বহিতে আরম্ভ করিয়াছে। সেই বাতাস আকাশের মেঘগুলির দিক্পরিবর্তন করিয়া উত্তর দিকে চলিয়াছে।
ইন্দ্র রায় কাছারির সামনের বারান্দায় মাটির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া এ-প্রান্ত হইতে ও-প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরিতেছিলেন; হাত দুইটি পিছনের দিকে পরস্পরের সঙ্গে আবদ্ধ। একটা কলরব তুলিয়া অচিন্ত্যবাবু বাগানের ফটক খুলিয়া প্রবেশ করিলেন, গেল, এবার পাষণ্ড মেঘ গেল। বাপ রে, বাপ রে, বাপ রে। আজ ছদিন ধরে বিরাম নেই জলের। আর কি বাতাস! উঃ, ঠাণ্ডায় বাত ধরে গেল মশায়! তিনি আকাশের মেঘের দিকে মুখ তুলিয়া বলিলেন, এইবার? এইবার কি করবে বাছাধন? যেতে তো হল। ‘বামুন বাদল বান, দক্ষিণে পেলেই যান’-দক্ষিণে বাতাস বইতে আরম্ভ করেছে, যাও, এইবার যাও কোথায় যাবে।
রায় ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন, কি ব্যাপার? অনেক কাল পরে যে।
অচিন্ত্যবাবু সপ্রতিভভাবে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন, আজ্ঞে হ্যাঁ, অনেক দিন পরেই বটে। শরীর সুস্থ না থাকলে কি করি বলুন? অবশেষে কলকাতায় গিয়ে-। অকস্মাৎ অকারণে হা-হা করিয়া হাসিয়া উঠিয়া বলিলেন, বলুন তো কি ব্যাপার?
হাসিতে হাসিতেই অচিন্ত্যবাবু বলিলেন, দেখুন ভাল করে দেখুন, দেখে বলুন। হেঁ হেঁ, পারলেন না তো?-বলিয়া আপনার দাঁতের উপর আঙুল রাখিয়া বলিলেন, দাঁত-দাঁত। পার্ল-লাইক টীথ, এই রকম মুক্তোর পাঁতির মত দাঁত ছিল আমার? পোকাখেকো কালো কালো দাঁত, মনে আছে?
এইবার ইন্দ্র রায়ের মন কৌতুকবোধে সচেতন হইয়া উঠিল। তিনি হাসিয়া বিস্ময় প্রকাশ করিয়া বলিলেন, তাই তো মশায়, সত্যিই এ যে মুক্তোর পাঁতির মত দাঁত!
সগর্বে অচিন্ত্যবাবু বলিলেন, তুলিয়ে ফেললাম। ডাক্তার বললে কি জানেন? বললে, ওই দাঁতই তোমার ডিসপেপসিয়ার কারণ। এখন আপনার পাথর খেলে হজম হয়ে যাবে।
বলেন কি?
নিশ্চয়। দেখুন না, ছ মাসের মধ্যে কি রকম বিশালকায় হয়ে উঠি। একেবারে যাকে বলে-ইয়ংম্যান। পরমুহর্তে অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করিয়া বলিলেন, কিন্তু মুশকিল হয়েছে কি জানেন? খাবারদাবার, মানে যাকে বলে পুষ্টিকর খাদ্য, সে তো এখানে পাওয়া যাচ্ছে না।
রায় বলিলেন, এটা আপনি অযথা নিন্দে করছেন আমাদের দেশের। দুধ-ঘি এসব তো প্রচুর পাওয়া যায় আমাদের এখানে।
বিষম তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে দুধ ও ঘিকে তুচ্ছ করিয়া দিয়া অচিন্ত্যবাবু বলিলেন, আরে মশায়, কি যে বলেন আপনি, বিশেষ করে নিজে তান্ত্রিক হয়ে, তার ঠিক নেই। দুধ-ঘিই যদি পুষ্টিকর খাদ্য হত, তবে গরুই হত পশুরাজ। মাংস–মাংস খেতে হবে, তবে দেহে বল হবে। দুধ-ঘি খেয়ে বড় জোর চর্বিতে ফুলে ষণ্ড হওয়া চলে, বুঝলেন?
রায় হাসিয়া বলিলেন, তা বটে, দুধ-ঘি খেয়ে ষণ্ড হওয়া চলে, পাষণ্ড হওয়া চলে না, এটা আপনি ঠিক বলেছেন।
অচিন্ত্যবাবু একটু অপ্রস্তুত হইয়া গেলেন। অপ্রতিভভাবে কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বিরক্তিভাবে বলিলেন, আমিই বোকামি করলাম, আরও কিছুদিন কলকাতায় থাকলেই হত। তা একটা সাহেব কোম্পানির তাড়ায় এলাম চলে। ভাবলাম সাঁওতালদের একটা দুটো পয়সা দিয়ে একটা করে হরিয়াল, কি তিতির, নিদেন ঘুঘু মারার ব্যবস্থা করে নেব। তা ছাড়া এখানে বন্য শশকও তো প্রচুর পাওয়া যায়, সে পেলে না হয় দু গণ্ডা তিন গণ্ডা পয়সাই দেওয়া যাবে। শশক-মাংস নাকি অতি উপাদেয় অতি পুষ্টিকর। মানে, ওরা খায় যে একেবারে ফার্স্টক্লাস ভিটামিন-ছোলা, মসুর, এই সবের ডগা খেয়েই তো ওদের দেহ তৈরী।
রায় বলিলেন, আজ আমি আপনাকে শশক-মাংস খাওয়াব, আমার এখানেই রাত্রে খাবেন, নেমন্তন্ন করলাম। চরের সাঁওতালরা আজ দুটো খরগোশ দিয়ে গেছে।
অচিন্ত্যবাবু হাসিয়া বলিলেন, সে আমি শুনেছি মশায়, বাড়িতে বসেই তার গন্ধ পেয়েছি।
রায় হাসিয়া উত্তর দিলেন, তা হলে সিংহ ব্যাঘ্র না হতে পারলেও ইতিমধ্যেই আপনি অন্তত শৃগাল হয়ে উঠেছেন দেখছি। ঘ্রাণশক্তি অনেকটা বেড়েছে।
অচিন্ত্যবাবু অপ্রস্তুত হইয়া ঠোঁটের উপর খানিকটা হাসি টানিয়া বসিয়া রহিলেন। রায় বলিলেন, আসবেন তা হলে রাত্রে!
অচিন্ত্যবাবু বলিলেন, বেশ। আবার এখন এই ভিজে মাটিতে ট্যাংট্যাং করে যাচ্ছে কে, তাই আসব! সেই একেবারে খেয়ে-দেয়ে যাব। অম্বল ভাল হল তো সর্দি টেনে আনব নাকি? তা ছাড়া আসল কথাই তো আপনাকে এখনো বলা হয় নি। এক্ষুনি বললাম না, সায়েব কোম্পানির কথা? এবার যা একটা ব্যবসার কথা কয়ে এসেছি, কি বলব আপনাকে, একেবারে তিনশ পারসেন্ট লাভ, দুশ পয়েন্টের আর মার নেই।
