সুনীতির চোখে এবার জল আসিল, অহীন্দ্র তাঁহার মর্মকে বুঝিয়াছে, সংসারে দুঃখ কি কাহাকেও দিতে আছে? আহা, মানুষের মুখ দেখিয়া মায়া হয় না?
মানদা কি উত্তর দিতে গেল, কিন্তু বাহিরে কাহার জুতোর দ্রুত শব্দে সে নিরস্ত হইয়া দুয়ারের দিকে চাহিয়া রহিল। একলা মানদাই নয়, সুনীতি অহীন্দ্র সকলেই। পরমুহর্তেই ষোল-সতেরো বৎসরের কিশোর একটি ছেলে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করিয়া থমকিয়া দাঁড়াইল। স্নিগ্ধ গৌর দেহবর্ণ, পেশীসবল দেহ-সর্বাঙ্গে সর্বপরিচ্ছদে পরিচ্ছন্ন তারুণ্যের একটি উজ্জ্বল লাবণ্য যেন ঝলমল করিতেছে।
সুনীতি সাগ্রহে আহ্বান করিয়া বলিলেন, অমল! এস, এস।
সুনীতির কথা শেষ হইবার পূর্বেই অমল অহীন্দ্রের হাত দুইটা ধরিয়া বলিল, অহীন?
অহীন্দ্র স্নিগ্ধ হাসি হাসিয়া বলিল, হ্যাঁ অহীন। তুমি অমল?
অমল বলিল, উঃ, কতদিন পরে দেখা হল বল তো? সেই ছেলেবেলায় পাঠশালায়। কতদিন যে আমি তোমাকে চিঠি লিখব ভেবেছি! কিন্তু ইংলণ্ডের রাজা আর ফ্রান্সের রাজার যুদ্ধ হল, ফলে দুটো দেশের দেশবাসীরা অকারণে পরস্পরের শত্রু হতে বাধ্য হল। বলিয়া সে হাসিয়া উঠিল।
অহীন্দ্রও হাসিয়া বলিল, ইউ টক ভেরী নাইস!
অমল বলিল, ইউ লুক ভেরী নাইস। ব্রাইঁট ব্লেড অব এ শার্প সোর্ড-কাব্যের ভাষায় খাপখোলা সোজা তলোয়ার।
সুনীতি বিমুগ্ধদৃষ্টিতে দুইটি কিশোরের মিতালির লীলা দেখিতে ছিলেন। তিনি এইবার মানদাকে বলিলেন, মানদা, দে তো, একখানা ছোট সতরঞ্চি পেতে। বস বাবা তোমরা, আমি নিমকি ভাজব, খাবে দুজনে তোমরা। উমাকে আনলে না কেন বাবা অমল।
অমল বলিল, তার কথা আর বলবেন না পিসীমা। অকস্মাৎ সে কাব্য নিয়ে, যাকে বলে ভয়ানক মেতে ওঠা, সেই ভয়ানক মেতে উঠেছে। অনবরত রবীন্দ্রনাথের কবিতা মুখস্থ করেছে, আবৃত্তি করছে। আমায় তো জ্বালাতন করে খেলে।
সুনীতির সেই দিনের ছবি মনে পড়িয়া গেল। তিনি একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিলেন, আহা, তাঁহার যদি এমনি একটি কন্যা থাকিত, তবে এমনি কবিতা আবৃত্তি করিয়া তাঁহাকে ভুলাইয়া রাখিতে পারিত।
অমল বলিল, এই দেখুন পিসীমা, কাল তো আপনাকে নিয়ে আমি যাচ্ছি সদরে, কিন্তু ফিরে এলেই যে অহীন পালাবে, সে হবে না।
অহীন হাসিয়া বলিল, আমার প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস কামাই হবে বলে ভাবনা কিনা
অমল বলিল, তুমি বুঝি সায়েন্স স্টুডেন্ট? আই সী!
.
সুনীতি কাঠগড়ায় দাঁড়াইয়া কাঁপিয়া উঠিলেন। আদালতটা লোকে গিসগিস করিতেছিল। অমল তাঁহার কাছেই দাঁড়াইয়া ছিল, সে বলিল, ভয় কি পিসীমা, কোন ভয় করবেন না। পরমুহূর্তে সে আত্মগতভাবে বলিয়া উঠিল, এ কি, বাবা এসে গেছেন দেখছি!
সুনীতি দৃষ্টি ফিরাইয়া দেখিলেন, ঘর্মাক্ত-পরিচ্ছদ, রুক্ষচুল, শুষ্কমুখ, অস্নাত, অভুক্ত ইন্দ্র রায় আদালতে প্রবেশ করিতেছেন, সঙ্গে একজন উকিল। উকিলটি আসিয়াই জজের কাছে প্রার্থনা করিল, মহামান্য বিচারকের দৃষ্টি আমি একটি বিশেষ বিষয়ে আকৃষ্ট করতে চাই। আদালতের সাক্ষীর কাঠগড়ায় এই যে সাক্ষী ইনি এই জেলায় একটি সম্ভান্ত প্রাচীন বংশের বধূ। উভয় পক্ষের উকিলবৃন্দ যেন তাঁর মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রেখে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা ও জেরা করেন। মহামান্য বিচারক সে ইঙ্গিত তাঁদের দিলে সাক্ষী এবং আমরা-শুধু আমরা কেন, সর্বসাধারণই চিরকৃতজ্ঞ থাকব।
ইন্দ্র রায় সুনীতির কাঠগড়ার নিকট আসিয়া বলিলেন, তোমার কোন ভয় নাই বোন, আমি দাঁড়িয়ে রইলাম তোমার পেছনে।
সাক্ষ্য অল্পেই শেষ হইয়া গেল; বিচারক সুনীতির মুখের দিকে চাহিয়াই উকিলের আবেদনের সত্যতা বুঝিয়াছিলেন, তিনি অতি প্রয়োজনীয় দুই চারিটা প্রশ্ন ব্যতীত সকল প্রশ্নই আগ্রাহ্য করিয়া দিলেন। কাঠগড়া হইতে নামিয়া সুনীতি সেই প্রকাশ্য বিচারালয়ে সহস্র চক্ষুর সম্মুখে পায়ে হাত দিয়া ধূলা লইয়া ইন্দ্র রায়কে প্রণাম করিলেন। রায় রুদ্ধস্বরে বলিলেন, ওঠ বোন, ওঠ। তারপর অমলকে বলিলেন, অমল, নিয়ে এস পিসীমাকে। একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে রেখেছি, দেখি আমি সেটা।
দেখিবার কিন্তু প্রয়োজন ছিল। রায়ের কর্মচারী মিত্তির গাড়ি লইয়া বাহিরে অপেক্ষা করিয়াই দাঁড়াইয়া ছিল। সুনীতি ও অমলকে গাড়িতে উঠাইয়া দিয়া রায় অমলকে বলিলেন, তুমি পিসীমাকে নিয়ে বাড়ি চলে যাও। আমার কাজ রয়েছে সদরে, সেটা সেরে কাল আমি ফিরব।
সুনীতি লজ্জা করিলেন না, তিনি অসঙ্কোচে রায়ের সম্মুখে অর্ধ-অবগুণ্ঠিত মুখে বলিলেন, আমার অপরাধ কি ক্ষমা করা যায় না দাদা?
রায় স্তব্ধ হইয়া রহিলেন, তারপর ঈষৎ কম্পিত কণ্ঠে বলিলেন, পৃথিবীতে সকল অপরাধই ক্ষমা করা যায় বোন, কিন্তু লজ্জা কোনরকমেই ভোলা যায় না।
পরামর্শ অনুযায়ী অতি যত্নে সংবাদটি রামেশ্বরের নিকটে গোপন রাখা হইয়াছিল। রচিত মিথ্যা কথাটি তাঁহাকে বলিয়াছিলেন হেমাঙ্গিনী। তিনি বলিয়াছিলেন, সুনীতি একটা ব্রত করছে, একবার গঙ্গাস্নানে যেতে হয়, কিন্তু আপনাকে রেখে কিছুতেই যেতে চাচ্ছে না। আমি বলছি যে, আমি আপনার সেবাযত্নের ভার নেব; ব্রত কি কখনও নষ্ট করে! আপনি ওকে বলুন চক্রবর্তী মশায়।
রামেশ্বর উত্তর দিয়াছিলেন, না না না। রায় গিন্নী ঠিক বলেছেন সুনীতি, ব্রত কি কখনও পণ্ড করে! আমি বেশ থাকব।
