হেমাঙ্গিনী বাধা দিয়া সকরুণ মিনতিতে বলিয়া উঠিলেন, চক্রবর্তী মশায়, না না।
রামেশ্বর স্তব্ধ হইয়া গেলেন। কিছুক্ষণ পর ম্লান হাসিয়া বলিলেন, জানলার ফাঁক দিয়ে দেখলাম, আকাশে মেঘ করেছে-দিক্হস্তীর মত কালো বিক্রমশালী জলভরা মেঘ। মহাকবি কালিদাসকে মনে পড়ে গেল। আপনার মনেই শ্লোক আবৃত্তি করছিলাম মেঘদূতের। এমন সময় আপনার মেয়ে এসে ঘরে ঢুকল। আমার মনে হল কি জানেন? মনে হল চক্রবর্তী-বাড়ির লক্ষ্মী বুঝি চিরদিনের মত পরিত্যাগ করে যাবার আগে আমাকে একবার দেখা দিতে এসেছেন। আমি আবৃত্তি বন্ধ করলাম। আপনার মেয়ে–কি নাম বললেন?
হেমাঙ্গিনী উত্তর দিবার পূর্বে উমাই উত্তর দিল, উমা দেবী।
উমা দেবী। হ্যাঁ, তুমি উমাও বটে দেবীও বটে। উমা আমায় বললে, কিসের মন্ত্র বলছিলেন আপনি? আর একবার বলুন না। আমি বললুম মন্ত্র নয়, শ্লোক, সংস্কৃত কবিতা। কবি কালিদাস মেঘদূতে বর্ষার বর্ণনা করেছেন, তাই আবৃত্তি করছিলাম। উমা আমার বললে, আপনি বাংলা কবিতা জানেন না? কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তিনি কি পুরস্কার পেয়েছেন! তাঁর খুব ভাল কবিতা আছে। আমি বললাম, তুমি জান? ও আমায় কবিতা শোনালে। বড় সুন্দর কবিতা, বড় সুন্দর। বাংলায় এমন কাব্য রচিত হয়েছে! ভাগ্য, আমার ভাগ্য পৃথিবীতে বঞ্চনাই আমার ভাগ্য। বাঃ, ‘নীল অঞ্জন লেগেছে নয়নে লেগেছে’!
সকলেই স্তব্ধ হইয়া রহিল। উমা কিন্তু চঞ্চল হইয়া উঠিতেছিল, কয়েক মুহূর্ত কোনরূপে আত্মসম্বরণ করিয়া সে বলিল, আপনি কিন্তু সংস্কৃত শ্লোক আমায় শোনাবেন বলেছে!
রামেশ্বর হাসিয়া বলিলেন, তোমার মত সুন্দর করে কি বলতে আমি পারব মা?
উমা হাসিয়া বলিল, ওটা আমি আবৃত্তি-প্রতিযোগিতার জন্যে শিখেছিলাম কিনা। কিন্তু আপনিও তো খুব ভাল বলছিলেন, বলুন আপনি।
রামেশ্বর কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করিয়া লইয়া বলিলেন, বলি শোন–
তাং পার্বতীত্যাভিজনেন নাম্না বন্ধুপ্রিয়াং বন্ধুজনো জুহাব।
উমেতি মাত্রা তপসো নিষিদ্ধা পশ্চাদুমাখ্যাং সুমুখী জগাম।।
মহীভূতঃ পুত্রবতোহপি দৃষ্টান্তস্মিন্নপত্যে ন জগাম তৃপ্তিম্।
অনন্ত পুস্পস্য মধ্যোহিঁ চুতে দ্বিরেফমালা সবিশেষসঙ্গা।।
এর মানে জান মা? পর্বতরাজ হিমালয়ের এক কন্যা হল, গোত্র ও উপাধি অনুসারে আত্মীয়বর্গ, বন্ধুজন প্রিয় সেই কন্যার নাম রেখেছিল পার্বতী। পরে হিমাদ্রী-গৃহিণী সেই কন্যাকে তপস্যপরায়ণা দেখে বললেন, উমা! অর্থাৎ-বৎসে, করো না, তপস্যা করো না। সেই থেকে সুমুখী কন্যার নাম হল উমা। তারপর কবি বলেছেন, পর্বতরাজের পুত্র-কন্যা আরও অনেকেই ছিল, কিন্তু বসন্তকালে অসংখ্যবিধ পুস্পের মধ্যে ভ্রমর যেমন সহকারপুস্পেই অনুরক্ত হয়, তেমনি পর্বতরাজের চোখ দুটি উমার মুখের পরেই আকৃষ্ট হত বেশি, সেইখানেই ছিল যেন পূর্ণ পরিতৃপ্তি। তুমি আমাদের সেই উমা। আমি বেশ দেখতে পাচ্ছি, তুমি প্রচুর বিদ্যাবতী হবে। আজ যা তুমি শোনালে-আহা! সেই উমারই মত বিদ্যা তোমার আপনি আয়ত্ত হবে।
তাং হংসমালাঃ শরদীব গঙ্গাং মহোষধিং নক্তমিবাত্মভাসঃ।
স্থিরোপদেশামুপদেশকালে প্রপেদিরে প্রাক্তনজন্মবিদ্যাঃ।
হেমাঙ্গিনী ও সুনীতির চোখ জলে ভরিয়া উঠিয়াছিল। এই এক মানুষ, আবার এই মানুষই ক্ষণপরে এমন অসহায় আত্মবিস্মৃত হইয়া পড়িবেন, নিজের প্রতি নিজেরই অহেতুক ঘৃণায় এমন একটা অবস্থার সৃষ্টি করিবেন যে, অন্যের ইচ্ছা হইবে আত্মহত্যা করিতে।
উমা বলিল, আমায় সংস্কৃত কবিতা শেখাবেন আপনি? এখানে যে কদিন আছি আমি রোজ আপনার কাছে আসব?
আসবে? তুমি আসবে মা?
হ্যাঁ। কিন্তু এমন করে ঘরের মধ্যে দরজা-জানালা বন্ধ করে থাকেন কেন আপনি? ওগুলো খুলে দিতে হবে কিন্তু।
মুহর্তে রামেশ্বরের মুখ বিবর্ণ হইয়া গেল, তিনি থরথর করিয়া কাঁপিয়া উঠিলেন, বহুকষ্টে আত্মসম্বরণ করিয়া বলিলেন, রায়-গিন্নী, আপনার দেরি হয়ে যাচ্ছে না?
১৬-২০. অহীন্দ্র কলেজ কামাই করিয়া
সেই বন্দোবস্তই হল।
অহীন্দ্র কলেজ কামাই করিয়াই আসিল। সুনীতি অহীন্দ্রকে লইয়া একটু শঙ্কিত ছিলেন। রামেশ্বরের সন্তান, মহীর ভাই সে। অহীন্দ্র কিন্তু হাসিয়া বলিল, এর জন্যে তুমি এমন লজ্জা পাচ্ছ কেন মা? এ-সংসারের সত্যকে খুঁজে বের করতে সাহায্য করা প্রত্যেক মানুষের ধর্ম, এতে রাজা-প্রজা নেই, ধনী-দরিদ্র নেই। বিচারক মানুষ হলেও তিনি বিধাতার আসনে বসে থাকেন।
সুনীতি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিয়া বাঁচিলেন, শুধু তাই নয়, বুকে যেন তিনি বল পাইলেন; সঙ্গে সঙ্গে বুকখানি পুত্রগৌরবেও ভরিয়া উঠিল। তিনি ছেলের মাথায় চুলগুলির ভিতর আঙুল চালাইতে চালাইতে বলিলেন, মুখ হাত ধুয়ে ফেল বাবা, আমি দুখানা গরম নিমকি ভেজে দিই। ময়দা আমার মাখাই আছে।
মানদা নীরবে দাঁড়াইয়া ছিল, সে একবার বলিয়া উঠিল, আপনি ভালই বললেন দাদাবাবু; কিন্তু আমার মন ঠাণ্ডা হল না। বড় দাদাবাবু হলে–। অকস্মাৎ ক্রোধে সে দাঁতে দাঁত ঘষিয়া বলিয়া উঠিল, বড়দাদাবাবু হলে ওই মজুমদার আর শ্রীবাসের মুণ্ডু দুটো নখে করে ছিঁড়ে নিয়ে আসতেন।
সুনীতি শঙ্কায় স্তব্ধ হইয়া গেলেন; অহীন্দ্র কিন্তু মৃদু হাসিল, বলিল, আমিও নিয়ে আসতাম রে মানদা, যদি মুণ্ডু দুটো আবার জোড়া দিতে পারতাম। না হলে ওরা বুঝবে কি করে যে, আমাদের মুণ্ডু ছিঁড়ে নিয়েছিল, আর এমন কাজ করব না!
