সুনীতি বলিলেন, না না ঠাকুরপো, ওদের আমি জমি দেব বলেছিলাম।
বেশ তো। চরে তো আরও জমি রয়েছে, তার থেকে ওরা নিতে পারে।
অকস্মাৎ মানদা আক্ষেপ করিয়া বলিয়া উঠিল, আঃ হায় হায় গো! ছ-ছ শ টাকা চিলে ছোঁ দিয়ে নিয়ে গেল গো! আমার মনে পড়ছে লায়েববাবু, দাদাবাবু হাতটা পর্যন্ত ছ’ড়ে গিয়েছিল নখে। সেই টাকাই তো?
মুহূর্তের জন্য মজুমদার স্তব্ধ হইয়া গেল, কিন্তু পরমুহতেই হাসিয়া বলিল, টাকাটা আমাকেই দিয়েছিলেন মহী; সেটা মামলাতেই খরচ হয়েছে। বুঝলেন বউঠাকরুণ, জমাখরচের খাতায়– খসড়া রোকড় খেতিয়ান তিন জায়গাতেই তার জমা আছে। দেখলেই দেখতে পাবেন। তা ছাড়া চেক-রসিদও তাকে দেওয়া হয়েছে। আমি নিজে হাতে লিখে দিয়েছি। শ্রীবাস এসেছে, সেই চেক নিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এ-বছরের খাজনাও সে দিতে চায়।
সঙ্গে সঙ্গে বাহির হইতে শ্রীবাসের সাড়া পাওয়া গেল, খাজনার টাকা আমি নিয়ে এসেছি মজুমদার মশায়, এক শ টাকা আমি এক্ষুণি দিয়ে যাব।–বলিয়া সে ভিতর-দরজা পার হইয়া একেবারে অন্দরে আসিয়া দেখা দিয়া দাঁড়াইল।
মাথার ঘোমটা আরও খানিকটা বাড়াইয়া দিয়াও সুনীতি নিজেকে বিব্রত বোধ করিলেন; শুধু তাই নয়, হঠাৎ তাঁহার চোখে জল আসিয়া গেল। এমন ভাবে কেহ যে স্বেচ্ছায় আসিয়া এই অন্দরে প্রবেশ করিতে পারে, এ ধারণা মুহূর্ত-পূর্বেও তিনি কল্পনাতে আনিতে পারেন নাই। শ্রীবাসের এমন অন্দর-প্রবেশ যেমন অতর্কিত, তেমন ওই এক শ টাকার উষ্ণতায় উত্তপ্ত। তিনি আর সহ্য করিতে পারিলেন না, একমাত্র আশ্রয়স্থলের কথা তাঁহার মনে পড়িয়া গেল, অতি দ্রুতপদে উপরে স্বামীর ঘরের উদ্দেশ্যে চলিয়া গেলেন।
কিছুক্ষণের জন্য সকলেই ঘটনাবর্তের এমন আকস্মিক জটিলতায় হতবাক হইয়া গেল। মানদা ফুলিয়া উঠিল ক্রুদ্ধ ক্রুর সাপিনীর মত। তাহার পূর্বেই মজুমদার নীরবতা ভঙ্গ করিয়া বলিল, বউঠাকরুন চলে গেলেন যে!
মানদা দংশনের সুযোগ পাইয়া উল্লসিত হইয়া উঠিল, বলিল, আমি তো রয়েছি, বলুন না কি বলছেন?
হাসিয়া মজুমদার বলিল, তুমি আর শুনে কি করবে বল?
কেন হুকুম যা দেবার আমিই দেব। অন্দরই যখন কাছারি হয়ে উঠল, তখন আমার লায়েব ম্যানেজার হতে ক্ষেতিটা কি বলুন?
মজুমদারের মুখের হাসি তবু মিলাইয়া গেল না, সে বলিল, মানদার দাঁতগুলি যেমন চকচকে, তেমনি কি পাতলা ধারালো! তুমি শিলে শান দিয়ে দাঁত পরিষ্কার কর বুঝি?
মানদা হাসিয়া বলিল, এই দেখুন লায়েববাবু কি বলছেন দেখুন! বেঁজির দাঁতের কি শিল লাগে না শান লাগে? সাপ কাটবার মত ধার ভগবানই যে তার বজায় রাখেন গো। সে আরও কি বলিতে যাইতেছিল কিন্তু ঠিক এই সময়েই উপরের বারান্দা হইতে সুনীতি ডাকিলেন, মানদা।
মানদার রূপ পাল্টাইয়া গেল, সম্ভ্রমভরা মমতাসিক্ত স্বরে বলিল, কি মা?
সুনীতি বলিলেন, মজুমদার-ঠাকুরপোকে কালকের দিনটা অপেক্ষা করতে বল। কাল ছোটবাড়ির দাদার কাছে এর বিচার হবে; যা হয় তিনিই করে দেবেন।
মজুমদার উঠিয়া পড়িল। মানদা বলিল, শুনলেন তো? এখন কি বলছেন, বলুন?
মজুমদার বলিল, তোমাদের প্রজা শ্রীবাসকে বল মানদা। যা হয় সে-ই উত্তর দেবে।
মানদা বলিল, উকিলের বুদ্ধি নিয়েই তো মক্কেল উত্তর দেবে লায়েববাবু। তাতেই একবারে খোদ উকিলকেই জিজ্ঞেসা করছি।
শ্রীবাস কিন্তু বিনা পরামর্শেই উত্তর দিল, বলিল, অপেক্ষা আমি করতে পারব না, সে তুমি গিন্নীমাকে বল। তাতে খুনখারাপি হয়, হবে।
বারান্দার রেলিঙে মাথা রাখিয়া সুনীতি দাঁড়াইয়া রহিলেন। একটা গভীর অবসন্নতা তিনি অনুভব করিতেছিলেন, আর যেন সহ্য করিতে পারিতেছেন না। আগামী প্রভাতের চরের ছবি তাঁহার চোখের উপর যেন নাচিতেছে। চরটা রক্তে ভাসিয়া গিয়াছে, তাহারই উপর পড়িয়া আছে রংলাল, নবীন, শ্রীবাস আরও কত মানুষ। ঝরঝর করিয়া তিনি কাঁদিয়া ফেলিলেন, তাঁহার মনে হইল, সমস্ত কিছুর জন্য অদৃশ্য লোকের হিসাব নিকাশ দায়িত্ব পড়িতেছে তাঁহারই স্বামীর উপর, সন্তানদের উপর। অস্থির হইয়া গিয়া তিনি স্বামীর ঘরে গিয়া প্রবেশ করিলেন।
স্তব্ধ রামেশ্বর খাটের উপর বসিয়া আছেন পাথরের মূর্তির মত, খোলা জানালার মধ্য দিয়া রাত্রির আকাশের দিকে তাঁহার দৃষ্টি নিবদ্ধ। সুনীতি কঠিন চেষ্টায় আত্মসম্বরণ করিয়া নিরুচ্ছ্বসিতভাবেই বলিলেন, দেখ, একটা কথা বলছিলাম, না বলে যে আমি আর পারছি না।
রামেশ্বর ধীরে ধীরে দৃষ্টি ফিরাইয়া সুনীতির মুখের দিকে চাহিলেন, যেন কোন অজ্ঞাতলোক হইতে তিনি এই বাস্তব পরিবেষ্টনীর মধ্যে ফিরিয়া আসিলেন। তারপর অতি মিষ্ট স্বরে বলিলেন, বল, কি বলছ, বল?
খুব ভাল করিয়া গুছাইয়া, একটি একটি করিয়া সমস্ত কথা বলিয়া সুনীতি বলিলেন, তুমি একবার মজুমদারকে ডেকে একটু বল। তোমার অনুরোধ তিনি কখনই ঠেলতে পারবেন না।
কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া রামেশ্বর ধীরে ধীরে ঘাড় নাড়িয়া অস্বীকার করিয়া বলিলেন, না।
সুনীতি আর অনুরোধ করিতে পারিলেন না, শুধু একটা গভীর দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিলেন। রামেশ্বর অভ্যাসমত মৃদুস্বরে বলিলেন, ‘যাচ্ঞা মোঘা বরমধিগুণে,–নাধমে লব্ধকামা।’ সুনীতি, শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির কাছে প্রার্থনা করিয়া যদি ব্যর্থ হও সেও ভাল, তবু অধমের কাছে ভিক্ষে করে লব্ধকাম হওয়া উচিত নয়।
