সুনীতি এবার বলিল, না না, মানদা, দোষ একা নবীনের নয়, দোষ অহিরও। সাঁওতালদের যখন বিনা সেলামীতে জমি দিয়েছে, তখন নবীনকেও দেওয়া উচিত ছিল। সত্যিই তো, নবীন কি আমাদের কাছে সাঁওতালদের চেয়েও পর?
নবীন এবার ছোট্ট ছেলের মত কাঁদিয়া ফেলিল। দুয়ারের ওপাশ হইতে রংলাল বেশ আবেগভরেই বলিল, বলুন মা, আপনিই বলুন। আমাদের অভিমান হয় কি না হয়, আপনিই বলুন। মনে করে দেখুন, আমিই বলেছিলাম সর্বপ্রথম যে, এ-চর আপনাদের ষোলআনা। তবে ধম্মের কথা যদি ধরেন, তবে আমরা পেতে পারি। আপুনি বলেছিলেন, ধম্মকে বাদ দিয়ে কি কিছু করা যায় বাবা, তোমরা নিশ্চিন্ত থাক। তাতেই মা, সেই দাবিতে আমরা আবদার করে বলেছিলাম, আমরা দিতে পারব না সেলামী।
সুনীতি একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, সবই বুঝলাম বাবা, কিন্তু এখন আমি কি করব, বল?
নবীন বলিল, আমাকে হুকুম দেন মা আমি কাউকেই জমি চষতে দেব না। গোটা বাগদীপাড়া লাঠি হাতে গিয়ে দাঁড়াব। থাকুক জমিই এখন খাসদখলে।
রংলাল বাহির হইতে গভীর ব্যাগ্রতা-ব্যাকুল স্বরে বলিয়া উঠিল, এখুনি আমি আড়াই শ টাকা এনে হাজির করছি নবীন, জমি আমাদিগে বন্দোবস্ত করে দেন রাণীমা।
নবীন বলিল, সেই ভাল মা, ঝঞ্জাট পোয়াতে হয় আমরাই পোয়াব, আপনাদের কিছু ভাবতে হবে না।
সুনীতি অনেক কিছু ভাবিতেছিলেন। তাহার মধ্যে যে কথাটা তাঁহাকে সর্বাপেক্ষা পীড়িত করিতেছিল, সেটা নবীন ও রংলালের কথা। নিজের স্বার্থের জন্য কেমন করিয়া এই গরীব চাষীদের এমন রক্তাক্ত বিরোধের মুখে ঠেলিয়া দিবেন? তাহার মনের বিচারে-স্বার্থটা ষোলআনা যে একা তাঁহারই।
মানদা কিন্তু হাসিয়া বলিল, সস্তায় কিস্তি মেরে ঝঞ্জাট পোয়াতে গায়ে লাগে না, না কি গো লগদী? আমিও কিন্তু বিঘে পাঁচেক জমি নেব মা। আমারও তো শেষকাল আছে। আমিও টাকা দেব। লগদী যা দেবে তাই দেব। লগদীর চেয়ে তো আমি পর নই মা।
মানদার কথার ধরনটা শুধু ধারালোই নয়, বাঁকাও খানিকটা বটে। নবীন অসহিষ্ণু হইয়া পড়িল, দুয়ারের ও-পাশে রংলাল দাঁতে দাঁতে টিপিয়া নিরালা অন্ধকারের মধ্যেই নীরব ভঙ্গিতে তাহাকে শাসাইয়া উঠিল। সুনীতি কি বলিতে গেলেন কিন্তু তাহার পূর্বেই বাহিরের সদর দরজার ওপাশে কে গলার সাড়া দিয়া আপনার আগমনবার্তা জানাইয়া দিল। গলার সাড়া সকলেরই অত্যন্ত পরিচিত। সুনীতি চঞ্চল হইয়া উঠিলেন, মানদা সবিস্ময়ে বলিল, ওমা লায়েববাবু যে।
পরমুহর্তেই শান্ত বিনীত কণ্ঠস্বরে মজুমদার বাহির হইতে ডাকিলেন, বউঠাকরুন আছেন নাকি?
নবীন খানিকটা দুর্বলতা অনুভব করিয়া চঞ্চল হইয়া পড়িল, দরজার আড়ালে রংলালের মুখ শুকাইয়া গেল। মানদা মৃদুস্বরে সুনীতিকে প্রশ্ন করিল, মা?
সুনীতি মৃদুস্বরেই বলিলেন, আসতে বল।
মানদা ডাকিল, আসুন, ভেতরে আসুন।
সুনীতি বলিলেন, একখানা আসন পেতে দে মানদা।
প্রশান্ত হাসিমুখে যোগেশ মজুমদার ভিতরে আসিয়া সবিনয়ে বলিল, ভাল আছেন বউঠাকরুন? কর্তা ভাল আছেন?
অবগুণ্ঠন অল্প বাড়াইয়া দিয়া সুনীতি বলিলেন, উনি আছেন সেই রকমই। মাথার গোলমাল দিন দিন যেন বাড়ছে ঠাকুরপো।
মজুমদার একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিল, আহা-হা। কণ্ঠস্বরে, ভঙ্গিতে যতখানি সমবেদনার আভাস প্রকাশ পাইতে পারে, ততখানিই প্রকাশ পাইল। তারপর মজুমদার বলিল, একবার বৈদ্যপারুলিয়ার কবিরাজদের দেখালে হত না? চর্মরোগে, বিশেষত কুণ্ঠ ইত্যাদিতে ওরা ধন্বন্তরি।
সুনীতির মুখ মুহূর্তে বিবর্ণ হইয়া গেল। সমস্ত শরীর যেন ঝিমঝিম করিয়া উঠিল, মজুমদারের কথায় তিনি মর্মান্তিক আঘাত অনুভব করিলেন। তিনি কোনরূপে আত্মসম্বরণ করিয়া বলিলেন, না না ঠাকুরপো, সে তো সত্যি নয়। সে কেবল ওর মাথার ভুল।
উত্তরে মজুমদার কিছু বলিবার পূর্বেই মানদা ঠক করিয়া একটা প্রণাম করিয়া বলিল, তবু ভাল, লায়েববাবুকে দেখতে পেলাম। আমি বলি-মথুরাতে রাজা হয়ে নন্দের বাদার কথা বুঝি ভুলেই গেলেন। তা লয় বাপু, পুরনো মনিবের ওপর টান খুব।
মজুমদারের মুখ চোখ রাঙা হইয়া উঠিল, সে বার দুই অস্বাভাবিক গম্ভীরভাবে গলা ঝাড়িয়া লইল; মানদা বলিয়াই গেল, লায়েববাবু আমাদের ভোলেন নি বাপু। কত্তাবাবুর খবরটবর রাখেন।
সুনীতি লজ্জায় যেন মরিয়া গেলেন, মুখরা মানদা এ বলিতেছে কি? কিন্তু তাহাকেই বা কেমন করিয়া তিনি নিরস্ত করিবেন? মুখের দিকেও একবার চাহে না যে, ইঙ্গিত করিয়া বারণ করেন। মজুমদার নিজেই ব্যাপারটাকে ঘুরাইয়া লইল, আরও একবার গলা পরিষ্কার করিয়া লইয়া বলিল, বিশেষ একটা জরুরী কথা বলতে এসেছিলাম বউঠাকরুন!
সুনীতি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিয়া হাসিমুখে বলিলেন, বলুন।
বলছিলাম ওই চরটার কথা। ওই চরের ওপর এক শ বিঘে জায়গা মহীবাবু শ্রীবাস পালকে বন্দোবস্ত করেছেন। আমিই চেক কেটে দিয়েছি মহীবাবুর হকুম মত। টাকা অবিশ্যি তিনিই নিয়েছিলেন। ছ শ টাকা। পাঁচ শ টাকা সেলামী, এক শ টাকা খাজনা।
সুনীতি মৃদুস্বরে কুণ্ঠিতভাবে বলিলেন, আমি তো সে কথা জানি নে ঠাকুরপো।
একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া মজুমদার বলিল, জানবেন কি করে বলুন, এ কি আপনার জানবার কথা? তা ছাড়া, সেই দিনই বেলা তিনটের সময় ননী পাল খুন হয়ে গেল। বলবার আর অবসর হল কই, বলুন? এখন শ্রীবাসের সেই জমি থেকে পঞ্চাশ বিঘে জমি রংলাল নবীন– এরা দখল করতে চাচ্ছে। ওদের অবশ্যি জবরদস্তি। সেলামীর টাকা পর্যন্ত দেয় নি।
