মঞ্জু আবার খিলখিল করে হেসে উঠল, বললে—আপনি ভূত বিশ্বাস করেন নাকি ডাক্তারবারু?
চারুবাবু বললেন– হ্যাঁ। মানে, করি আবার করিও না। করি না আবার করি, দুই-ই বটে। মানে, কী যে আছে কী যে নাই-এ ভারি মুশকিল।
প্রদ্যোত ফিরে এলেন। গম্ভীর মুখ। আস্তিন পর্যন্ত জামা গুটানো। ডিসইন-ফেকট্যান্টের মৃদু গন্ধ উঠছে। চেয়ারের উপর বসে পড়ে বললেন––ছোট ছেলে, ছ-সাত মাস বয়স। গরম দুধ পড়ে একেবারে
চারু ডাক্তার আপনার অজ্ঞাতসারেই একটা জৈবিক যন্ত্ৰণাকাতর শব্দ করে উঠলেন।–আঃ!
অন্য সকলে শিউরে উঠল। উঃ!
প্রদ্যোতের বন্ধু প্রশ্ন করলে–টিকবে?
—মরে গেছে। টেবিলের উপরে শোওয়াবার পর মিনিট কয়েক ছিল। তারপর বার কয়েক স্প্যাজ্ম্–ব্যস। আমি আর করি নি কিছু। শুধু দেখলাম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।
মঞ্জু স্থির হয়ে গিয়েছে। তার সকল চঞ্চলতা, হাসি, কৌতুকসব যেন শুকিয়ে গিয়েছে।
প্রদ্যোতের বন্ধু বললে–এখানে আর-এক হাঙ্গাম!
–হাঙ্গাম? মানে?
–তোমার ঠাকুর ভূত দেখেছিল। বু-বু শব্দে চিৎকার—সে এক কাণ্ড।
–ননসেন্স! বদমায়েশি করছে বেটা! বোধহয় মাংস-টাংস সরিয়েছে। পরে বলবে ভূতে খেয়ে গেছে।
চারু ডাক্তার বললেন– ঊঁহুঁ। সব ওরকম করে উড়িয়ে দেবেন না! ঊঁহুঁ।
প্রদ্যোত হেসে উঠল।—আপনি ভূত মানেন নাকি?
চারু ডাক্তার বললেন– মানি মানে? এই গোরস্তানেওদিকে একটা মানুষের বাচ্চা মল অপঘাতে, এদিকে মাংসের গন্ধে ঘরে ঢেলা পড়ল; খোনা-সুরে কথা কইলে। ব্রান্ডির আমেজ কেটে গেল। দিন, এখন আমাকে আর-এক আউন্স ব্রান্ডি দিন। সব মাটি। এক আউন্সের বেশি। না। ব্যস, ব্যস।
প্রদ্যোত গ্লাসটি বাড়িয়ে দিয়ে বললে—সে যা হোক, ভূত থাক বা না থাক, মারামারি নাই। এদিকের কথা বলুন। তা হলে আমাদের এদিকের সব ঠিক তো!
–হ্যাঁ, ঠিক বৈকি। না কি হে সব?
–তা হলে কাগজখানা দেখুন, সই করে দিন।
–আপনি পড়ুন ডাক্তার। ইউ সি ব্যান্ডি খেয়ে চালশের চশমা চোখে দিলে বড্ড বেশি। উঁচু-নিচু লাগে আমার। আরে, ওই জন্যে রাত্রে কল এলে আমি যাই না। নেভার। রাত্রে রোগী মরলে চারু ডাক্তার ইজ নট রেসপনসিবল। পড়ুন-আপনি পড়ুন।
প্রদ্যোত বলে গেল—কোম্পানির নাম হবে নবগ্রাম কো-অপারেটিভ মেডিক্যাল স্টোর অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল ল্যাবোরেটরি।
চারু ডাক্তার বললেন–গুড।
ক্যাপিটাল পাঁচ হাজার টাকা। শেয়ার দশ টাকা হিসেবে। চারুবাবু একশো শেয়ার নিচ্ছেন। মঞ্জু বোস একশো। আমার বন্ধু নির্মল সেন একশো। হরেনবাবু পঞ্চাশ।
—না মিঃ বোস। আমার পঁচিশ করুন।
কেন হে হরেন? তোমার তো চলতি ভাল হে। জীবনমশায় তোমায় ডেকে ইনজেকশন দেওয়াচ্ছেন, ওদিকে রতনবাবুর ছেলে বিপিনবাবুর অ্যাটেন্ডিং ফিজিশিয়ান তুমি, এই দুটো কেসেই তো তোমার পঞ্চাশের দাম উঠে যাবে হে!
হরেনের মুখখানা লাল হয়ে উঠল। কুরনাহারের ডাক্তার হরিহর পাল এতক্ষণে বললে—তা রামহরিকে জীবনমশায় আর হরেনবাবু বাঁচিয়েছেন খুব। আমাকেই প্রথম ডেকেছিল পাগলা শশী। একেবারে সরাসরি কথা বলেছিল। উইল একখানা করে রেখেছে রামহরি—তাতে সাক্ষী হতে হবে তোমাকে। টিপসই আমরা দিয়ে নোব। তুমি সাক্ষী হয়ে যাও। হাঙ্গামা-হুজ্জত কিছু হবে না, ভয় কিছু নাই। যদি হয় বলবে-সজ্ঞানেই টিপসই করেছে রামহরি। টনটনে জ্ঞান ছিল। পঞ্চাশ টাকা শেষে বলে একশো টাকা। কিন্তু আমি বললামওতে আমি নাই শশীবাবু। মাফ করবেন আমাকে। টাকায় কাজ নাই। আমি যা দেখেছিলাম—তাতে তো প্রায় শেষ অবস্থা। ও কেসটা খুব বাঁচিয়েছেন জীবনমশায়।
চারুবাবু বললেন– ওইটেই জীবন মশায়ের ভেলকি। আমি ভেলকি বলি বাপু। বুঝেছ না। রোগটা ঠাওর করতে পারে। তা পারে। নাড়িজ্ঞানই বল আর বহুদৰ্শিতাই বল, যাই বল লোকটা এগুলো প্রায় ঠিক ঠিক বলে দেয়। আর লোকটির গুণ হচ্ছে—ধার্মিক। কিন্তু ওই একটা ব্যাপারওই, এ রোগী বাঁচবে না-ওই নিদানওইটেতে যেন একটা কেমন বেঁক আছে।
প্রদ্যোত ডাক্তার বললে–আমি কিন্তু কথার মধ্যে একটু ইন্টারাপ্ট করছি। আমরা আসল কথা থেকে সরে যাচ্ছি। আমাদের কাজটা পাকা করে নিতে হবে।
হরেন বলেন আমার তা হলে চল্লিশখানা শেয়ার লিখুন।
চারু বাবু বললেন–তোমার দশখানার দাম আমি এখন দিয়ে দেব হে। তুমি আমাকে মাসে মাসে দিয়ে। যাও যাও, আপত্তি কোরো না, বস্ খতম। ওয়ান্ টু থ্রি।
টেবিলের উপর চড় মেরে হাসতে লাগলেন। তারপর আবার বললেন–এই তো সাড়ে তিন হাজার উঠে গেল। বাকি দেড় হাজার রইল—এরা দিক। এরা রয়েছে পাঁচজনে, ওরা দুশো করে মানে, কুড়িখানা করে দেবে। আর বাকি পাঁচশো আমি বলি ওপন থাক—দু-চার জন কোয়াক আছে—তারা যদি–
প্রদ্যোত দৃঢ়কণ্ঠে বললে–আমি কিন্তু এর বিরোধী ডাক্তারবাবু।
টাকে হাত বুলিয়ে চারুবাবু বললেন– আপনার এখন নতুন রক্ত প্রদ্যোতবাবু। অনেক। কোয়াক ভাল চিকিৎসা করে, তাদের ভাল প্র্যাকটিস, তাদের টানুন। এই ধরুন জীবনমশায়।
বাধা দিলে প্রদ্যোতবাবু। বললে—এ নিয়ে তর্ক আমি করব না। কিন্তু এ ইনস্টিটিউশন খাঁটি পাস-করা ডাক্তারদের। এখানে খ্ৰীটি সায়ান্স ছাড়া ভেল্কিকে আমরা প্রশ্রয় দেবার কোনো দরজা খোলা রাখব না। ডাক্তারবাবু আপনি অস্বীকার করবেন না যে এখানে এখনও দৈব ওষুধ অনেক চলে। কবচ মাদুলি চলে। এই তো আপনাদের এখানকার ধর্মঠাকুরের বাতের তেল ওষুধের খুব খ্যাতি। কলকাতা থেকে লোক আসে। কিন্তু আপনি ডাক্তার হয়ে প্রেসক্রিপশনে অবশ্য লিখবেন না-ধর্মঠাকুরের তেল এক আউন্স। এবং সে তেলও আপনি এই ডাক্তারখানায় রাখতে বলবেন। না। কবচ মাদুলিও আমাদের মেডিক্যাল স্টোর থেকে অবশ্যই বিক্রি হবে না।
