–আপনি আমাকে দমিয়ে দিলেন ডাক্তারবাবু। চারু ডাক্তার ঘাড় নাড়তে লাগলেন।–যুক্তি আপনার কাটবার উপায় নেই। উকিল হলে আপনি ভাল উকিলও হতে পারতেন কিন্তু।
—বলুন কিন্তু কী? খুব গম্ভীর মুখেই প্রদ্যোত প্রশ্ন করলে। এবং টেবিলের উপর হাত রেখে চারুবাবুর দিকে একটু ঝুঁকেও পড়লে আগ্রহ প্রকাশ করে।
হেসে ফেললেন চারুবাবু, বললেন– কিন্তু এটা এমন কিছু নয়, মানে ভাবছিলাম আপনাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া অবশ্যই হয়, তাতে জেতে কে?
সমস্ত মজলিসটাই হো-হো করে হেসে উঠল। মিসেস বোস হেসে উঠল সর্বাগ্রে।
হাসি একটু কমে আসতেই চারুবাবু বললেন–তবে ওই পঞ্চাশটা শেয়ার পাবলিকের জন্যে ভোলা থাক। কেউ একটার বেশি শেয়ার পাবে না। যারা কিনবে তারা ওষুধ পাবে একটা কনসেশন-রেটে।
—তাতে আমি রাজি। এবং ওটাকে বাড়িয়ে পঞ্চাশের জায়গায় একশো করার পক্ষপাতী আমি।
—বাস-বাস। দিন সই করে দি। নাও, সব সই কর!
সই করে চারু ডাক্তার কাগজখানা প্রদ্যোত ডাক্তারকে এগিয়ে দিয়ে বললেন–খাবার দেরি কত মিসেস বোস? অন্নপূর্ণার দরবারে শিব ভিখারি—তাকে চুপ করেই হাত পেতে থাকতে হয়। কিন্তু শিবের চ্যালারা হল ভূত। তারা খিদে লাগলে মানবে কেন?
—হয়ে গেছে। জায়গা করতে বলে এসেছি। হয়ে যেত এতক্ষণ। ঠাকুরটা যে ভয় পেয়ে মাটি করলে। চাকরটা তাকে আগলাচ্ছে। রান্নাঘর থেকে সব এ ঘরে এনে তবে জায়গা করবে।
–ওই দেখুন। ভূতের চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেছে।
–দেখছি আমি।
–দাঁড়ান।
–কী?
–আমি বলি কি, মাংসটা-ওটা না খাওয়াই ভাল।
–মাংস বাদ দেব? আপনি কি পাগল হলেন ডাক্তারবাবু?
–উঁহুঁ। মুসলমানের কবরখানা—তার উপর মুরগির মাংস। উঁহুঁ! মানে ভূত মানি চাই নাই মানি, আমরা ডাক্তারভূত মানা আমাদের উচিত নয়—মানবই বা কেন? তবে যখন একটা খুঁত হয়ে গেল, মানে বু-বু করবার সময় ঠাকুরটার থুতু-টুতু পড়ল কি না কে জানে? কিংবা আরও কিছু হল কি না কে বলতে পারে—তখন কাজ কী? মানে—আমি, মানে আমার ঠিক রুচি হচ্ছে না।
খাওয়ার সময় দেখা গেল মাংসের রুচি সমাগত স্থানীয় ডাক্তারদের কারুরই প্রায় হল না।
প্রদ্যোত ডাক্তার রেগে আগুন হয়ে উঠলেন ঠাকুরটার উপর। এ ওর বদমাইশি। আপনারা এটা বুঝতে পারছেন না? একেবারে স্পষ্ট হয়ে গেছে এইবার। এই রকম একটা ব্যাপার করলে আপনারা কেউ মাংস খাবেন না। নোকাল লোক এখানকার বিশ্বাস অবিশ্বাস জানে। ঠিক হিট করেছে। এইবার ব্যাটারা গোগ্রাসে গিলবে!
চারুবাবু বললেন–তাই খাক। ব্যাটারা খেয়েই মরুক। বুঝেছ না, হেভি ডোজে ক্যাস্টর অয়েল ইকব। তবে বুঝেছ না, আমাদের রুচি মানে বললাম তো। থাক না। যা আসল কাজ। তো হয়ে গেল নবগ্রাম কো-অপারেটিভ মেডিকেল স্টোর অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল ল্যাবোরেটরি। এ একটা মস্ত কাজ আপনি করলেন। ক্লিনিক্যাল টেস্ট ছাড়া এ যুগে এক পা এগুনো যায় না। উচিত না। অ্যান্ড—আপনি ওই কথাটা যা বললেন– সেটা আমি মানি। ঠিক বলেছেন। কবচ মাদুলি দৈব ওষুধে ফল যদি হয়—আমরা প্রতিবাদ করব না, কিন্তু ওকে প্রশ্রয় দেব না।
তাঁরা চলে গেলেন একে একে।
প্রদ্যোত চাকর এবং ঠাকুরকে ডেকে বললেন–কালই দুজনে মাইনে মিটিয়ে নিয়ে চলে যাবে।
মঞ্জু বললে—এটা তোমার অন্যায় হল।
–না, হয় নি।
—তুমি সে সময়ে ঠাকুরের চেহারা দেখ নি। লোকটা ঠকঠক করে কাঁপছিল। কী, বলুন। না মিস্টার সেন?
সেন বললেন–ভয় লোকটা পেয়েছিল প্রদ্যোত, সেটা মিসেস বোস ঠিক বলেছেন। হি ওয়াজ ট্রেমব্লিং লাইক এ লিফ। পাতার মত কাঁপছিল।
প্রদ্যোত বললেন–তোমাদের কথা মানতে হলে—আমি বুঝবলোকটা অত্যন্ত ভূতবিশ্বাসী; এটা কবরস্তান বঁধছে মুরগির মাংস সুতরাং কবর থেকে ভূত উঠে আসবে এইসব মনে মনে কল্পনা করছিল সন্ধে থেকে এবং তারই অবশ্যম্ভাবী পরিণতিতে সে ভিশন দেখেছে। এ লোককে আমি হাসপাতালে রাখতে পারব না। আমার রোগীরা ভয় পাবে। কাল ভোরেই ওদের চলে যেতে হবে।
২৭. সমস্ত রাত্রি জীবন মশায়ের ঘুম হল না
সমস্ত রাত্রি জীবন মশায়ের ঘুম হল না। মনের মধ্যে একটা ঝড় বয়ে গেল সর্বক্ষণ। শশাঙ্ক, শশাঙ্কের স্ত্রী, বনবিহারী, বনবিহারীর স্ত্রী, আতর-বউ, বিপিন, বিপিনের স্ত্রী, রতনবাবু যেন তাঁর শয্যা ঘিরে বসে ছিল। রতনবাবু, বিপিন, বিপিনের স্ত্রী তাকে বার বার প্রশ্ন করেছে—বলুন, আপনি বলুন। শশাঙ্ক, বনবিহারী, ওদের স্ত্রী, আতর-বউ ভ্রূ কুঞ্চিত করে ইশারা করেছে, নানা-না।
নিজেকেও তিনি বার বার বিশ্লেষণ করে দেখেছেন। মনে পড়ছে—তাঁর বাবা বলেছিলেন নিদান দেবার সময় সর্বাগ্রে অন্তরে অনুভব করতে হয় পরমানন্দ মাধবকে। তার প্ৰসাদে জন্মমৃত্যু জীবনমরণ হয়ে ওঠে দিবা এবং রাত্রির মত কালো এবং আলোর খেলা, পরমানন্দময়ের লীলা। তখন সেই মন নিয়ে বুঝতেও পারবে নাড়ির তত্ত্ব এবং বলতেও পারবে অসঙ্কোচে। জিজ্ঞাসিত না হয়ে এ কথা বলার বিধি নয়—তবে ক্ষেত্র আছে, যেক্ষেত্রে জিজ্ঞাসিত না হয়েও নিজে থেকেই তোমাকে বলতে হবে। পরমার্থ-সন্ধানী বৃদ্ধকে বলতে হবে, বলতে হবে বিশ্বাসবশে মুক্তির অভিপ্ৰায়ে বা আপনার বৈরাগ্যকে পরিপূর্ণ করে তুলবার জন্য যদি কোনো কাম্যতীর্থে যাবার বাসনা থাকে তবে চলে যান। কোনো গুপ্ত কথা যদি গোপন। দুশ্চিন্তার মত অন্তরে আবদ্ধ থাকে তাকে ব্যক্ত করে নিশ্চিন্ত হোন। কোনো ভোগবাসনা বা মমতাসংক্রান্ত বাসনা যদি মনে অতৃপ্তির আকারে নিদ্রার মধ্যে স্বপ্নের ছলনায় আপনাকে ছলিত করে—তবে তা পূর্ণ করে পূর্ণ তৃপ্তি সঞ্চয় করে নিন।
