চারুবাবু আগে থেকেই পাজি দেখে রেখেছেন। প্রদ্যোত এসব মানে না, বরং মানা অপছন্দ করে, তবু এক্ষেত্রে চারুবাবুর ইচ্ছায় বাধা দেয় নি।
প্রদ্যোত কাগজ-কলম টেনে নিয়ে বসল।
চারুবাবু হেসে বললেন–কী রকম মিটিং মশায়? একটা ওপনিং সঙ হবে না? হারমোনিয়ম মিসেস বোস উপস্থিত থাকতে!
ডাক্তারের স্ত্রী অত্যন্ত সপ্রতিভ মেয়ে। সে মাথাটি নত করে সসম্ভ্ৰমে বললে—সভাপতির আদেশ শিরোধার্য। এবং অর্গানটার সামনে বসে গেল।
একটা ব্যাঘাত পড়ল।
হঠাৎ হাসপাতালের ফটকে চার-পাঁচ জন লোক এসে ঢুকল। একটি মেয়ে বুক চাপড়ে কাঁদছিল—ওরে সোনা রে, ও মানিক রে! ওরে বাবা রে!
প্রদ্যোত একমনে হিসেব কষে যাচ্ছিল। কান্না শুনে কাগজ-কলম ধীরতার সঙ্গে গুছিয়ে রেখে উঠে দাঁড়াল। এত রাত্রে এমন বুক চাপড়ে কাঁদছে-হাসপাতালে ছুটে এসেছে—নিশ্চয় অ্যাকসিডেন্ট। ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডের কেস। কিন্তু এখানে ইমার্জেন্সি ওয়ার্ড মানে দুটি বেড এখন। একটি বেড ছিল, প্রদ্যোত এসে অনেক চেষ্টা করে কিশোরবাবুকে দিয়ে চেষ্টা করিয়ে আরএকটা বাড়িয়েছে। থানা হেলথ সেন্টার হলে পাঁচটা বেড হবে। কিছু নূতন ব্যবস্থাও করেছেন। কিন্তু ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডের সব থেকে বড় প্রয়োজন রক্তের। রক্ত কলকাতার ব্লড ব্যাঙ্কে দেড়শো মাইল দূরে।
–আমি আসছি। দেখি কী হল। প্রদ্যোত চলে গেল।
চারুবাবু বললেন–এমন কর্তব্যপরায়ণ লোক আমি দেখি নি। আমিও একসময় এখানে ছিলাম তো। আমারও খুব কড়াকড়ি ছিল। বুঝলেন মিসেস বোস, আমিও খুব কড়া লোক ছিলাম। তবে করব কী? সে কালই ছিল আলাদা। তখন হাসপাতাল ছিল বাবুদের, ডি-বি গ্র্যান্ট ছিল এই পর্যন্ত। বাবুরাই হৰ্তাকৰ্তা বিধাতা। ডিসপেনসারিতে কাজ করছি, বাবুদের কল এল, আসুন, আরজেন্ট। কী করব, যেতে হল! গিয়ে দেখি ছোট ছেলে খুব চিৎকার করছে। তারস্বরে। বাবুর মেয়ের প্রথম ছেলে, বার বছরের মেয়ের ছেলে-বুঝছেন ব্যাপার?
–বার বছরের মেয়ের ছেলে? মঞ্জুর বিস্ময়ের আর অবধি রইল না।
—তার আর আশ্চর্য কী? সে আমলে এ তো হামেশাই হত। এগার বছরের মেয়ের ছেলে আমি দেখেছি। চোদ্দ বছর বয়স পর্যন্ত ছেলে না হলে সেকালে হায় হায় পড়ত সংসারে। আর ছেলে হল না। দেবতাস্থানে মানত করত।
মঞ্জু বললে–আমার মায়ের মা, গ্ৰেট-গ্র্যান্ডমা—তার ছেলে হয়েছিল তের বছরে, আমার মায়ের মা। তাই শুনি যখন তখন আশ্চর্য হয়ে যাই সে বুড়ি আজও বেঁচে আছে। ওঃ, যা কালা হয়েছে বুড়ি! জানেন–
হঠাৎ একটা ভয়ার্ত চিৎকারে সকলে চমকে উঠল। কী হল? চিৎকারটা ডাক্তারের বাসার ভিতরে।
কেউ যেন বু-বু করে চেঁচাচ্ছে। কে? ঠাকুরের গলা বলে মনে হচ্ছে।
মঞ্জু দাঁড়িয়ে উঠে ছুটল। সঙ্গে সঙ্গে প্রদ্যোতের বন্ধুও ছুটল। চারু ডাক্তার বললেন–কী হল, চোরটোর নাকি? হরেন বললে—কী জানি।
–না, কড়াই-ফড়াই উলটে ফেললে পায়ে? না কি? চারুবাবু বললেন–দেখ হরেন। সকলেই সচকিত হয়ে চেয়ে রইল দরজার দিকে।
চারুবাবু শেষ ব্রান্ডিটুকু পান করে ডাকলেন ও মশায়, ও মিসেস বোস! হল কী।
ওদিকে ভিতরে হাউমাউ করে কী বলছে ঠাকুরটা। কিছু বুঝতে পারা যাচ্ছে না। প্রদ্যোতের বন্ধু ধমকাচ্ছে। ডাক্তারের বউ খিলখিল করে হাসছে।
চারু ডাক্তার বললেন–বলি হরেন!
–আজ্ঞে!
–এ মেয়েটা কী হে? কী হাসছে দেখ তো? আবার বন্দুক নিয়ে নাকি শিকার করে। হরেন বললেন—হাঁ, সাইকেলও চড়েন।
চারু ডাক্তার এবার বললেন–এ একটা গেছো মেয়ে! ডাক্তারটি লোক ভাল কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই গেছো মেয়ের পাল্লায় পড়ে গাছে উঠে না বসতে হয়; লেজ না গজায়।
সব ডাক্তাররাই হেসে উঠল।
চারুবাবু মাথার টাকে হাত বুলিয়ে সরস হেসে বললেন––কিন্তু ওরা আছে বেশ। কপোতকপোতী সম। বেশ! হাসছে খেলছে গাইছে। বেশ আছে! মাঝে মাঝে মনে আফসোস হয় হে। বলি একালে জন্মলাম না কেন? ডাক্তার এবার নিজেই হেসে উঠলেন।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই খিলখিল করে হেসে যেন বর্ষার ঝরনার মত ঝরে পড়তে পড়তে ওদিক থেকে বেরিয়ে এল প্রদ্যোত ডাক্তারের গেছো বধূটি। ডাক্তারের বন্ধুও হাসছিল, সে বললে–ইডিয়ট কোথাকার! কাণ্ড দেখুন তো!
চারু ডাক্তার বললেন– হল কী?
মঞ্জু বললে—ভূত। চারুবাবু-ভূত এসেছিল। আবার সে উচ্ছ্বসিত হয়ে হাসতে লাগল।
ভূত! চারু ডাক্তারের আমেজ ছুটে গেল।
হ্যাঁ। চাকরটা ঘরে খাবার জায়গা করছে, ওদিকে রান্নাঘরে ঠাকুর গরমমসলা বেটে মাংসের সঙ্গে গুলে দিচ্ছে; সারি সারি থালা বাটি সাজানো হঠাৎ টুপটাপ শব্দে ঢিল পড়তে শুরু করে। ঠাকুর তাইতে উঠে জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখে আপাদমস্তক সাদা কাপড় পরে কে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখেই বলেছে—একটু মাংস পেঁ! একটু পেঁ! বাস ঠাকুর অমনি বু-বু করে উঠেছে।
প্রদ্যোতের বন্ধু বললে—আমার ইচ্ছে হল ব্যাটার গালে ঠাস করে চড় কষিয়ে দিই গোটা কয়েক।
চারু ডাক্তার বললেন–উঁহুঁ। এতটা উড়িয়ে দিলে চলবে না। জায়গাটা ভাল নয়। বহু লোকে বহুবার ভয় পেয়েছে এখানে। একটু এগিয়ে গিয়ে একটা বড় গাছ ছিল। সেখানে নানা প্রবাদ ছিল। আর হাসপাতাল যেখানে-ওখানটা তো ছিল মুসলমানদের কবরস্থান। ওই ভয়ে হাসপাতালে সেকালে রোগী হত না। গোটা সাত বছরে সাতটা রোগী হয় নি। যা গোটা চারেক হয়েছিল তাও মরণদশায় ভিখিরি আর নাকারিগোটা দুয়েক অ্যাকসিডেন্ট কেস প্রায় আনক্লেমড় প্রপার্টির মত। সেসব ওই কিশোরবাবুর সোসাল সার্ভিসের দল কুড়িয়ে-বাড়িয়ে ভরে দিত। একটা ছাড়া মরেছেও সব কটা। এবং সব রোগীতেই ভয় পেত।
