কোয়ার্টারের বারান্দায় চেয়ার-টেবিল বিছিয়ে আসরটি বেশ মনোরম করেই পাতা হয়েছিল। সন্ধ্যার সময়ে চা-পর্ব থেকে শুরু হয়েছে। মাঝখানে একটা পেট্রোম্যাক্স আলো জ্বলছে। রাত্রে খাওয়াদাওয়া আছে। কিছু পাখি শিকার করা হয়েছে—তার সঙ্গে কয়েকটি মুরগিও আছে। রান্না করছে হাসপাতালের কুক। মঞ্জু ঘুরেফিরে রান্নাবান্নার তদ্বির করছে। বারান্দার আসরে একপাশে একটি অর্গান রাখা হয়েছে। মধ্যে মধ্যে গান গাইবে সে।
* * *
এখানে নবগ্রামের আশপাশে যারা প্র্যাকটিস করে—তারা সকলেই স্থানীয় লোক। গত পঞ্চাশ বছরের মধ্যে ডাক্তারিই সব পেশার চেয়ে ভাল পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ম্যালেরিয়ার প্রকোপই এর প্রধান কারণ। ম্যালেরিয়ার সঙ্গে আছে দু-চারটে টাইফয়েড, দু-দশটা রেমিটেন্ট, তার সঙ্গে আমাশয়, পেটের অসুখ। বসন্ত হয়, কিন্তু মহামারী হয়ে দেখা বড় দেয় না, তবে কলেরা মাঝে মাঝে হয়। সেকালে কলেরা হত মহামারীর মত, একালের টিকার কল্যাণে তা হয় না। এ ছাড়া এটা-ওটা নানান ব্যাধি লেগেই আছে। সেই কারণে ডাক্তার হতে পারলে নিশ্চিন্ত; উপার্জন হবেই। আগে লেখাপড়া শিখে সকলেই আইনটা পড়ত। চাকরি না পেলে উকিল হবে। কিন্তু উকিলদের পেশা অনিশ্চিত, যার কপাল খুলল সে রাজা, যার হল না সে ফকির বললেও চলে। ডাক্তারিতে তা নয়, কিছু হবেই। কপাল খুললে কথাই নাই। তার ওপর বাড়িতে বসে চলে। দশ বছর আগে এখানে চারিপাশে দুজন পাস-করা ডাক্তার ছিল। হাতুড়ে অনেক কজনই করে খেত। এখন এখানে ছজন পাস-করা ডাক্তার। কেউ বর্ধমানে, কেউ বাঁকুড়ায়, জনচারেক কলকাতায় ক্যাম্বেল এবং মেডিক্যাল স্কুলে পড়ে পাস করে এসেছেন। এঁরা সকলেই বিনয়ের পাইকিরি খদ্দের। বিনয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাদের নেই এমন নয়, আছে; পুরনো ওষুধ বিনয় চালায়। দাম বেশি ঠিক নেয় না তবে কো-অপারেটিভে দাম আরও কম হবে। ক্লিনিকের তেমন প্রয়োজন তারা অনুভব করে না। তবে হলে মন্দ কী? শক্ত রোগে দু-এক ক্ষেত্রে প্রয়োজন হতেও পারে। এবং প্রদ্যোত ডাক্তারকে একটু তুষ্ট রাখারও প্রয়োজন তাদের আছে। দু-একটা শক্ত রোগী, বিশেষ করে অপারেশন কেস, নিয়ে এলে হাসপাতালে সেগুলি করে দেবে প্রদ্যোত ডাক্তার। কিছুটা বিজ্ঞানের প্রেরণার তাগিদও অবশ্যই আছে। তারা সকলেই অপেক্ষা করে রয়েছে। বিপিনবাবুকে দেখে ডাক্তারেরা ফিরলেই আলোচনা আরম্ভ হবে।
প্রদ্যোতেরা বিপিনের কেস আলোচনা করতে করতেই ফিরলেন। বিপিনবাবু আজ বলেছেন—আপনারা কী বলছেন বলুন। এইভাবে আমি আর বেঁচে থাকতে চাইনে। জীবনমশায় বলে গেছেন আমি বাঁচব না।
রতনবাবু বলেছিলেন না, তা তো তিনি বলেন নি বিপিন। তাঁর উপর ইনজাস্টিস কোরো না তুমি।
দৃঢ়ভাবে বিপিনবাবু বলেছিলেন না, ইনজাস্টিস করি নি আমি। তিনি যেভাবে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না বলে চলে গেলেন, ফি না নিয়েই চলে গেলেন—তার মানে ও ছাড়া আর কিছু হয় না। বলুন না, আপনিই বলুন, তার মতামত সম্পর্কে আপনার কী মনে হয়েছে?
বিপিনবাবুর ছেলেটিও বলেছে–হ্যাঁ। উনি একরকম তাই-ই বলে গেছেন ইঙ্গিতে।
বিপিনবাবু বলেছেন—এখন আপনারা বলুন আপনাদের মত। এবং কতদিনে আমি বিছানা ছেড়ে–অন্তত ইনভ্যালিড চেয়ারেও একটু-আধটু ঘুরতে পারব বলুন। আমার রাশীকৃত কাজ পড়ে রয়েছে। মধ্যে মধ্যে প্রাণের দায়ে মক্কেলরা আসে, তাদের সঙ্গে আপনারা দেখা পর্যন্ত করতে দিচ্ছেন না। তাই বা কখন থেকে দেবেন বলুন। ফ্র্যাঙ্কলি বলুন। আমি শুনতে চাই।
চারুবাবু একটু বোঝাতে চেষ্টা করেছিলেন, বলেছিলেন আপনার মত লোক অধীর হলে আমরা কী করব বিপিনবাবু! আপনি তো নিজেই জানেন এ রোগের কথা। তা ছাড়া চঞ্চল হচ্ছেন। আপনি, এতে আপনার অনিষ্ট হবে।
—জানি। জেনেই বলছি। আমি এইভাবে থাকতে পারছি না। জীবনমশায় তাঁর কথা বলেছেন এবং চলে গেছেন একরকম। এখন আপনাদের পালা। আপনারা বলছেন ভাল আছি আমি। বেশ। এখন বলুন কতদিনে আমি উঠব। অবশ্য পূর্বের জীবন ফিরে পাব না আমি জানি। কিন্তু তার সামান্য অংশ। বলুন।
প্রদ্যোত বলেছে কলকাতায় ডাঃ চ্যাটার্জি আপনাকে দেখছিলেন। তাঁর নির্দেশমত এখানে আমরা চিকিৎসা করছি। মতামত তিনি দেবেন। আপনি তাকে আনান। আমরা বলতে পারি জীবন মশায়ের সঙ্গে আমরা একমত নই। আপনি আগের থেকে ভাল আছেন এবং এই উন্নতির যদি ব্যাঘাত না হয় তবে ক্ৰমে ক্ৰমে সেরে উঠবেন আপনি। কতদিনে, সে বলতে হলে ডাঃ চ্যাটার্জির সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে।
–বেশ তাই হোক। ডাঃ চ্যাটার্জি আসুন। হরেন, তুমি যাও—তাকে নিয়ে এস। যা চাইবেন দেব। লজ্জায় ঘেন্নায় আমি দগ্ধ হয়ে যাচ্ছি। এর শেষ কথা জানতে চাই আমি। আর–
মাথা তুলে সামনের দিকে তাকিয়ে বলেছেন–জীবন মশায়কে যেন আর না ডাকা হয়। আমি মরব কি না জানতে চাই না। মরবে সবাই একদিন। এ রোগে আমি বাঁচব কি না জানতে চাই।
কথাটা বলেছেন বাপকে লক্ষ্য করে।
সেই কথা বলতে বলতেই ফিরে এলেন ওঁরা। চাকর চা এনে সামনে নামিয়ে দিলে। হরিহর কম্পাউন্ডার চারুবাবুর সামনে নামিয়ে দিলে একটি কাচের গ্লাসে দু আউন্স ব্রান্ডি এবং একটি সোডার বোল। চারুবাবুরই এ প্রস্তাবে উৎসাহ বেশি। তিনিই হবেন সোসাইটির চেয়ারম্যান। ব্রান্ডির গ্লাসে চুমুক দিয়ে সিগারেট ধরিয়ে চারুবাবু পকেট থেকে ঘড়িটা বের করে বললেন– নটা সঁচ। কাজ শুরু করে দিন প্রদ্যোতবাবু। সময় এখন ভাল। দুৰ্গা দুৰ্গা-–সিদ্ধিদাতা গণেশ! করুন আরম্ভ।
