মশায় কোনো জবাব দিলেন না। না, কোনো কথাই তিনি বলবেন না।
বিনয় বললে—আজ সকালে কিশোরদাদা তো খুব বলেছে আপনার কথা। সারা গাঁয়ে একেবারে হইহই করছে।
এ কথারও কোনো উত্তর দিলেন না মশায়। বিনয় বলেই গেল—প্রদ্যোত ডাক্তার শুনলাম খুব চটেছে।
মশায় এবার বললেন– আমি যাই বিনয়।
বিনয় চকিত হয়ে উঠল–হ্যাঁ। ওরা আসছে। আমিও যাই। কাল যাব আমি আপনার কাছে।
সে আবার দেওয়ালের পাশ দিয়ে অন্ধকারে মিশে গেল। চারুবাবু, প্রদ্যোত, প্রদ্যোতের বন্ধু বারান্দা থেকে নেমে চলে আসছে।
২৬. প্রদ্যোত ডাক্তারের বাসায়
প্রদ্যোত ডাক্তারের বাসায় সেদিন এ অঞ্চলের পাসকরা ডাক্তারেরা সকলেই এসে জমেছিলেন। প্রদ্যোতই উদ্যোগী হয়ে সকলকে ডেকেছে। এখানে একটি কো-অপারেটিভ মেডিক্যাল স্টোর্স খোলার কথা হবে।
বিনয়কে বয়কটের জন্য ঠিক নয়; তবে বিনয়কে মুশকিলে পড়তে হবে বৈকি। শুধু তাই নয়, এখানে ছোটখাটো ক্লিনিকও সে করতে চায়। ডাক্তারের বন্ধু ক্লিনিকাল প্র্যাকটিস করেন এই জেলার সদরে। সদর থেকে বিপিনবাবুর ইউরিন ও ব্লাড রিপোর্ট নিয়ে ডাক্তার নিজেই এসে গতকাল থেকে বসে আছেন। বিপিনের রিপোর্ট আশাপ্রদ বটে কিন্তু পরীক্ষক ডাক্তারের কী একটি সন্দেহ হয়েছে। তিনি আবার একবার ইউরিন ব্লাড নিজে নিয়ে যাবেন। সেইসঙ্গে এই মিটিঙেও যোগ দিয়েছেন তিনি। প্রদ্যোতের অনুরোধেই যোগ দিয়েছেন। প্রদ্যোত ডাক্তারের মত, একালে ক্লিনিকের সাহায্য ছাড়া চিকিৎসা করা অন্যায়; যে বিজ্ঞান নিয়ে সাধনা, সেই বিজ্ঞানকে এতে লঙ্ন করা হয়। সাধারণ ম্যালেরিয়া বা সামান্য অসুখবিসুখে উপসর্গ দেখে, থার্মোমিটার স্টেথোেসকোপের সাহায্যে চিকিৎসা করা হয়ত যায়, কিন্তু অসুখ যেখানে একটু জটিল বলে মনে হয়, যেখানে এতটুকু সংশয় জাগে, সেখানে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে রক্ত মল মূত্র—এসব পরীক্ষা না করে চিকিৎসা করার ঘোরতর বিরুদ্ধে সে। নাড়ি পরীক্ষার উপর বিশ্বাস তার নাই। বায়ু পিত্ত কফও বুঝতে পারে না। এবং চোখে উপসর্গ দেখে, রোগীর গায়ের গন্ধ বিচার করে রোগনির্ণয় দু-চার জন প্রতিভাবানের পক্ষে সম্ভবপর বটে, কিন্তু সাধারণ চিকিৎসকদের সে শক্তি নাই। যারা করেন তাঁরা পাঁচটাতেই ঠিক ধরেন—সঁচটাতে ভুল করে পরে শুধরে নেন পাঁচটাতে ভুল শেষ পর্যন্ত ধরাই পড়ে না। রোগী যখন মারা যায় তখন মনে হয় চিকিৎসা আগাগোড়াই ভুল হয়েছে। রোগটা বোধহয় ম্যালেরিয়া ছিল না, কালাজ্বর ছিল; অথবা কালাজ্বর ছিল না, ছিল ম্যালেরিয়া। ম্যালেরিয়াকে টি-বি ভুল করতেও দেখা গিয়েছে। সেদিন একটা ছেলের চিকিৎসার মারাত্মক ভুল হয়েছে। ছেলেটা মরা অবধি তার মন পীড়িত হয়ে রয়েছে।
বিনয়ের দোকানে যেসব প্রেসক্রিপশন সরবরাহ হয়, তার মধ্যে অসাধুতা আছে। কোনো ওষুধ না থাকলে নিজেরাই বুদ্ধিমত একটা বিকল্প দিয়ে চালিয়ে দেয়। তাও না থাকলে সেটা বাদ দিয়েই চালিয়ে দেয়। কোনো ওষুধটা যথানিয়মে ক্রম রক্ষা করে তৈরি করে না। ওষুধের শিশি। স্থির থাকলেই দেখা যায় বিভিন্ন ভেষজ স্তরে স্তরে স্বতন্ত্র হয়ে আসছে অথবা তলায় জমে রয়েছে। একদফা ওষুধ এনে তাতেই চালায় ছ মাস, এক বছর। নিস্তেজ, নিগুণ ওষুধের ক্রিয়া হয় না। সব থেকে বিপদ হয়েছে এখানকার বিশেষ ওষুধগুলি নিয়ে। পেনিসিলিন যে বিশেষ তাপমানে রাখার কথা তা রাখা হয় না। যেসব ওষুধ আলোকরশ্মিতে বিকৃত হয় সেগুলিও নিয়মমত রাখে না এরা। মানুষের জীবনমরণ নিয়ে যেখানে প্রশ্ন—সেখানে অবহেলা, অজ্ঞতা এবং কুটিল ব্যবসায়-বুদ্ধির স্বেচ্ছাচারে ব্যভিচারে মানুষের জীবন হচ্ছে বিপন্ন। এ ছাড়া জাল ওষুধ চালায়। বলেও প্রদ্যোত বিশ্বাস করে।
তার ওপর দাম। দরিদ্র মানুষ সরল গ্রামবাসী অসহায়ভাবে সর্বস্বান্ত হয়ে এই লোলুপতার খঙ্গের নিচে ঘাড় পেতে দিতে বাধ্য হচ্ছে। শুধু দামই নয়, বাকির খাতায় বাকি বেড়েই চলে। এদের পীতপাণ্ডুর চোখের দৃষ্টি দেখলে প্ৰদ্যোতের করুণাও হয়, রাগও ধরে। এক-এক সময় মনে হয়—মরুক, এরা মরুক, মরে যাক। শেষ হয়ে যাক। নির্বোধ মূর্খেরা নিজেদের অজ্ঞতা মূৰ্খতা নির্বুদ্ধিতা কিছুতেই স্বীকার করবে না। বললে শুনবে না। বুঝিয়ে দিলে বুঝবে না, বিশ্বাস করবে না। আজও কবচ-মাদুলি জড়ি-বুটি ঝাড়-ফুক ছাড়লে না এরা। এদের বিজ্ঞানবোধ জীবন মশায়ের নাড়িজ্ঞান পর্যন্ত এসে থেমে গেছে।
তাই অনেক চিন্তা করে সে এখানকার ডাক্তারদের এবং এই বন্ধুটিকে নিয়ে একটি নূতন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চায়। বড় একটি ওষুধের দোকান। তার সঙ্গে একটি ছোটখাটো ক্লিনিক।
এখানকার অবস্থা দেখে সে যা বুঝেছে তাতে বড় একটি কারবার বেশ সমৃদ্ধির সঙ্গেই চলবে। নবগ্রামে একটি মাঝারি ওষুধের দোকান আজ তিরিশ বৎসরেরও বেশি কাল ধরে ভালভাবেই চলে আসছে। তার আগে হরিশ ডাক্তারের বাড়িতে এক আলমারি ওষুধ নিয়ে তার নিজস্ব কারবার চলত। জীবন মশায়ের আরোগ্য-নিকেতন নাকি সমারোহের সঙ্গে চলেছে দীর্ঘকাল। আজ উনিশশো পঞ্চাশ সালে কি এখানে ক্লিনিক ও বড় ওষুধের দোকান চলবে না?
আজ নবগ্রামেই দুজন এম. বি., দুজন এল. এম. এফ. রয়েছেন। আশপাশে চারিদিকে দশ-বার মাইলের মধ্যে আরও চার জন এল. এম. এফ. আছেন। তাদের সকলেরই কোনো রকমে চলে যাচ্ছে। তাদের সকলকেই আজ নিমন্ত্রণ করেছেন প্রদ্যোত ডাক্তার। সকলে মিলে অংশীদার হয়ে এই কারবার গড়ে তোলার কল্পনা। তাতে সকলেরই লাভ। তাঁরা ব্যবসায়ীর মত লাভ করবেন না, তবুও যেটুকু লাভ হবে তারাই পাবেন। প্রেসক্রিপশনে কমিশন যে যেমন পান। পাবেন। এখানকার লোকও অপেক্ষাকৃত কম দামেই ভাল ওষুধ পাবে।
