জীবনমশায় ভুরু কুঁচকে বলেছিলেন—এ অবস্থায় এলি কেন? আসা ঠিক হয় নি। খবর দিলেই তো পারসি!
কে একজন বলেছিল—তোমার তো টাকা আছে শুনতে পাই হে। না হয় মশায়কে দু টাকা দিতে।
—অ্যাঁ, কী বলছে এঁটে বল গো!
–বলি, তোমার তো টাকা আছে হে।
—আছে। সাত কুড়ি টাকা আমার আছে। পুঁতে রেখেছি। তাই তো এয়েচি মশায়ের কাছে, মশায় বলুক। আমি তা হলে জীবন-মচ্ছবটা করে ফেলি। ছেলে নাই পরিবার নাই-ভাইপোরা টাকা কটা নেবে, কিছুই করবে না। জমি আছে—সে ওদের পাবার, ওরা নিক। টাকাটা আমি জীবন-মচ্ছবটা করে আর মা চণ্ডীর পাট-অঙ্গন বাঁধিয়ে খরচ করে যাব। তা দেখ। ভাল করে দেখে বল কতদিন আর বাকি।
—বোস। একটু জিরিয়ে নে।
গণেশ খুব সমঝদারের মত ঘাড় নেড়ে বলেছিলা। সে বুঝেছ, ওই রোগ হতেই আমি বুঝেছি। উই ইনি যেসে লয়। ইনি সে-ই তিনি। মন ঠিক বলে দিয়েছিল। তবু বলি, কে জানে মুরু-সুরুক্ষু মানুষ, যাই ছোটমশায়কে দেখিয়ে আসি। তার তো ভুল হবে না! তা হলে ঠিক আছে! চণ্ডীমায়ের পাট-অঙ্গন বাধাবার কাজ লাগিয়ে দিই। তাপরেতেজীবন-মম্ব। হরি হরি বল মন। হরি হরি বল।
বলে প্রণাম করে দুটো টাকা নামিয়ে বলেছিল—না বোলো না। স্রোল বিনা পয়সায় দেখেছ। এই দুই টাকাতে শোধ!
মনে মনে সেদিন প্রশ্ন জেগেছিল-–গণেশ কি সত্যিই বুঝতে পেরেছিল?
শরৎ চন্দের দিদিমার কথা মনে পড়েছিল। বনুর মৃত্যুর মাস আষ্টেক আগের কথা।
তাকে হাত দেখতে ডেকেছিল।
সেও বুঝতে পেরেছিল। ডাক শুনতে পেয়েছিল। বৃদ্ধা চিরদিনই খেতেদেতে ভালবাসত। খাওয়াদাওয়া আয়োজন করতেও জানত। শরতের দিদিমার হাতের ফুলবাড়ি আর পঁপর ছিল উপাদেয় সামগ্রী। সেই কারণেই মশায় হাত দেখে জিজ্ঞাসা করেছিলেন কী খেতে ইচ্ছে হয় গো?
জিভ কেটে বৃদ্ধা বলেছিল—আমার পোড়াকপাল। এই কথা তুমি জিজ্ঞাসা করলে বাবা?
—তবে কী সাধ হয় বল।
–শরৎকে দেখব শুধু। দেখে বল, কদিন বাঁচব। শরৎ ফিরে আসা পর্যন্ত থাকব?
শরৎ তখন বি. এ. পরীক্ষা দিচ্ছে। শরতের মা বলেছিল—বলুন, টেলিগেরাপ করব কি না।
—নাঃ, দিন পনের দেবউ আছে। শরৎ তো সাত দিন পরে আসবে?
–হাঁ।
—তা হলে ঠিক আছে। নাতি দেখতে তুমি পাবে দে-বউ। কিন্তু কষ্ট কী বল। খোরাক কয়েক ওষুধ দেব।
–কষ্ট অস্বস্তি। আর কী? মনে হচ্ছে—গেলেই সুখ। নিশ্চিন্দি। বাঁচি।
এমন অনেক মানুষকে দেখেছেন। এই যাওয়াই তো যাওয়া। মৃত্যুর সমাদরের অতিথি। একালে তেমন অতিথি বোধ করি মৃত্যু পায় না।
আর কি হবে না? ঠিক এই সময়েই আতর-বউ চিৎকার করে কেঁদে উঠেছিলেন–ওরে বনু রে!
***
বিপিন সম্পর্কে তিনি বলতে পারবেন না।
বিপিন বনবিহারীর মত অসহায় আর্তের মত চিৎকার করে নি, করার কথাও নয়। সে কর্মবীর। সে কাঁদবে না। কিন্তু প্রসন্ন প্রশান্তভাবেও আত্মসমর্পণ করতে পারবে না। তার বেদনা ক্ষোভের হাহাকারে ফেটে পড়বে।
অন্ধকারের মধ্যে আত্মমগের মত পথ হাঁটছিলেন তিনি। সত্য সত্যই যেন স্থানকাল সম্পর্কে চেতনা ছিল না তার। চেতনা ফিরে এল নবগ্রামের বাজারের আলোয়।
চৌমাথাটায় দোকানে দোকানে আলো জ্বলছে। সেকালের মত ম্লান আলো নয়। উজ্জ্বল আলো। পেট্রোম্যাক্স, লণ্ঠন, দেওয়ালগিরি আড়াইশো বাতি, পঁচিশ বাতি, চল্লিশ বাতি। এই আলোর ঝলক তার চোখে লেগে তাঁকে সচেতন করে দিল। সামনে একটা মনিহারীর দোকানের ঝকমকে জিনিসগুলি চোখে যেন রঙ ধরিয়ে দেয়। হরেন ডাক্তারের দোকানে ওরা কারা?
প্রদ্যোত ডাক্তারের স্ত্রী আর সেই আগন্তুক বন্ধুটি। তারা দুজনেই বেরিয়ে এল এই সময়। ডাক্তারের স্ত্রী সুন্দরী মেয়ে, তার ওপর সেজেছে। মনোরমা করে তুলেছে নিজেকে। মশায় দাঁড়ালেন। তারা দুজনে চলে গেল, টর্চ জ্বালিয়ে ডানপাশের অন্ধকার পথ ভেদ করে। ওই পথে তাকেও যেতে হবে।
কোলাহল উঠছে চারিদিকে। বাজারের কেনাবেচা চলছে। বেছে অল্প আলো যেদিকটায় পড়েছিল সেই দিকটা ধরে তিনি চৌমাথাটা পার হয়ে মোড় ফিরলেন। এবার পথ আবার অন্ধকার। বাঁচলেন তিনি। বিপিনের কথা কেউ জিজ্ঞাসা করলে কী বলতেন তিনি? অনেকটা আগে ডাক্তারের স্ত্রী আর ডাক্তারের বন্ধুটি চলেছে।
অন্ধকার রাস্তায় বালি-কাঁকরের উপর মশায়ের পায়ের জুতোর শব্দ উঠছে। এই জায়গাটা নির্জন, বসতিহীন। অনেকটা পিছনে নবগ্রামের বাজারপটির আলোর ছটা শূন্যলোকে ভাসছে। এতটা দূরে বাজারের কোলাহল স্তিমিত হয়ে এসেছে, ক্ষীণ হয়ে আসছে ক্রমশ। বর্ষার মাঠে ব্যাঙের ডাকের ঐকতান উঠছে। কলরব করছে। ওটা কী যন্ত্ৰণাকাতর শব্দ! ওঃ, সাপে ব্যাঙ ধরেছে! মশায় থমকে দাঁড়ালেন। আবার চললেন।
বড় পুকুরটার পাশ দিয়ে এসে মাঠের মধ্যে রাস্তার একটা বাঁক ফিরতেই আলো পেলেন। মশায়। হাসপাতালের কোয়ার্টারের জানলায় বারান্দায় আলোর ছটা পড়েছে; হাসপাতালের বারান্দায় আলো জ্বলছে। প্রদ্যোত ডাক্তারের বারান্দায় পেট্রোম্যাক্স জ্বলছে। ওই যে ডাক্তারের স্ত্রী আর বন্ধুটি। প্রদ্যোত ডাক্তার বসে রয়েছে। চারুবাবু ডাক্তার। আরও কজন।
–এতক্ষণে ফিরছেন ডাক্তারবাবু?
–হাসপাতালের বাইরের দেওয়ালের পাশ থেকে কে একটি লোক বেরিয়ে এল। কে? বিনয়? চিনতে পেরে আশ্চর্য হলেন মশায়। বি-কে মেডিক্যাল স্টোর্সের মালিক বিনয়।
—ডাক্তারদের মিটিং হচ্ছে।
–মিটিং?
–হ্যাঁ। আমাকে বয়কটের ব্যবস্থা হচ্ছে।
–তোমাকে বয়কটের?
–হ্যাঁ। কাল যাব আমি আপনার কাছে। মিটিং শুধু আমাকে নিয়েই নয়, আপনিও আছেন। বলব, কাল সকালে সব বলব। যাব আমি। এখানকার সব ডাক্তার এসেছে। ওই দেখুন না। এখন হরেন শুধু আসে নি। চারুবাবু প্রদ্যোতবাবু যাচ্ছে, হরেনকে নিয়ে বিপিনবাবুকে দেখে। আসবে; এসে মিটিং হবে। আপনি দেখে এলেন বিপিনবাবুকে? আপনি থাকলেন না? ও আপনাকে বলে নাই বুঝি?
