শুধু দুঃখ হয়েছিল বনুর জন্যে। কাঁদছে বনু!
মনে পড়েছিল হাসিমুখে যারা মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের কথা।
* * *
দেখেছেন বৈকি এমন রোগী। কদাচিৎ নয়—একটি দুটি নয়। অনেক অনেক দেখেছেন তিনি। একালের ডাক্তারেরা দেখতে পায় না, পাবে না। তিনি দেখেছেন। অনেক দেখেছেন, নিতান্ত সাধারণ মানুষের মধ্যেই দেখেছেন।
নবগ্রামের রায় বংশের ভুবন রায়ের কথা মনে পড়ছে।
তখন মশায়ের বাবার আমল। জীবন মশায়ের তরুণ বয়স। ভুবন রায় তখন প্রায় সর্বস্বান্ত। জগৎ মশায়কে ডেকে পাঠালেন—মশায়কে বোলো, আমাকে যেন একবার দেখে যায়।
জগৎ মশায়ের চেয়ে বয়সে অনেক বড় ছিলেন ভুবন রায়। দরিদ্র বৃদ্ধ নিজের বাড়ির ভাঙা। দেউড়িতে হুঁকো হাতে বসে থাকতেন। অভাব এমনই প্রচণ্ড যে, যে-কোনো পথচারীকে তামাক খেতে দেখলে তাকে ডাকতেন, কুশল প্রশ্ন করতেন, পরিশেষে বলতেন—দেখি, তোমার কষ্কেটা একবার দেখি।
তরুণ জীবন দত্ত সেদিন ভুবন রায়ের ডাক শুনে মনে মনে হেসেছিলেন। অবশ্য জগৎ মশায়কে বলতে সাহস করেন নি। ভেবেছিলেন, উঃ, মানুষের কী বাঁচবার লালসা! এই বয়স সংসারের কোথাও কোনো পূর্ণতার আকর্ষণ নাই—তবু ভুবন রায় মরতে চায় না।
জগৎ মশায়ের সঙ্গে তিনিও গিয়েছিলেন। হেঁড়া ময়লা বিছানায় শুয়ে ভুবন রায় ক্ষীণকণ্ঠে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন—এস মশায়, এস। এস।
–কী হল?
–যেতে হবে কি না দেখ তো ভাই।
–যেতে তো হবেই রায়মশাই। বয়স মানেই কাল–
হেসে রায় বলেছিলেন—সে কথা ভুবন রায় ভুলে যায় নি জগৎ। সেই কাল পূর্ণ হল কি না দেখ। কাল পূর্ণ না করে অকালে যাওয়া যে পাপ। সেও ভুবন রায় যাবে না। লোকে বলে গেলেই খালাস। তা অকালে জেলখানা থেকে পালালে কি খালাস হয় রে ভাই? পালিয়ে যাবেই। বা কোথা? আবার এনে ভরে দেবে। এখন খালাসের সময় যদি হয়ে থাকে–দেখ দেখি। এখানকার কটি কৃত্য আছে আমাকে সারতে হবে।
ভুবন রায়ের বিষয় থাকতে বন্ধুর কাছে পাঁচশো টাকা নিয়েছিলেন। সে টাকার দলিল ছিল না, বন্ধুও সর্বস্বান্ত ভুবন রায়কে কোনোদিন তাগাদা করতেন না, কিন্তু ভুবন রায় সেটি ভুলতে পারেন নি। অনেকবারই এ সম্পর্কে তার কর্তব্য করবার চেষ্টা করেছিলেন। পারেন নি। কিন্তু কল্পনা ছিল। বন্ধুর কাছে মাফ চেয়ে নিতে হবে। কিন্তু সে কি সহজ? ভেবে রেখেছিলেন মৃত্যুর পূর্বেতা সে বন্ধুরই হোক আর নিজেরই হোক, চেয়ে নেবেন মুক্তি। তাই নিজের মৃত্যুর কথা স্থির জেনে তবে বন্ধুকে ডেকে হাত জোড় করে বলবেন—আমাকে মুক্তি দাও।
অবশ্য বিঘাখানেক নিষ্কর জমি রেখেছিলেন, সেইটুকু দেবারও সংকল্প ছিল ভুবন রায়ের।
একটি টাকা বালিশের তলা থেকে বের করে মশায়ের হাতে দিয়েছিলেন। জগৎশায় হাত জোড় করে বলেছিলেন—আমাকে মার্জনা করুন, রায়মশাই।
—তা হয় না জগৎ। বৈদ্যপ্রণামী না দিলে মুক্তি আসবে না আমার। তারপরেই হেসে বলেছিলেন—আমার শ্রাদ্ধ তো একটা হবেই, তাতেই তুমি এক টাকার জায়গায় দু টাকা নৌকুতো দিয়ে।
বন্ধুর কাছে মুক্তি নিয়ে ভুবন রায়ের হাসিমুখে চোখ বোজার কথা অনেকদিন পর্যন্ত মানুষ স্মরণ করে জীবনে ভরসা সঞ্চয় করেছে। তিনি নিজেও করেছেন।
শুধু কি ভুবন রায়? গণেশ বায়েন! এ তো বিশ বছর আগের কথা। তার আরোগ্য নিকেতনের দাওয়ার সামনে খোলা একখানা গাড়িতে চেপে আশি-পঁচাশি বছরের বুড়ো গণেশের সেই আসার কথা আজও চোখের উপর ভাসছে। লম্বা লাঠিখানায় ভর দিয়ে বুড়ো নেমে শোরগোল তুলেছিল সেদিন। চিরদিনের কালা গণেশের শোরগোল তুলে কথা বলাই অভ্যাস। ছোটমশায় কই গো? আমাকে আগে দেখ। কই? পরের গাড়ি চেয়েচিন্তে এসেছি। ওরা আবার চলে যাবে, লবগেরামের লটকোণের দোকানে জিনিস লেবে। বুড়োকে আগে বিদেয় কর।
লোকজন সকলেই অবাক হয়েছিল গণেশের দাপট দেখে।
মশায়ও গণেশকে দেখে প্রথমটা চিনতে পারেন নি। কে?
শীর্ণ দীর্ঘদেহ বৃদ্ধ! কে? গণেশ বায়েন নয়? চিতুরার গণেশ বায়েন! হ্যাঁ, সেই তো!
গণেশ তার চেয়েও বয়সে বড়। দশ-পনের বছরের বড়। গণেশ তাঁর বিয়েতে ঢোল বাজিয়েছে, মায়ের চন্দনধেনু শ্রাদ্ধে, বাবার বৃষোৎসর্গে ঢাক বাজিয়েছে, বনুর বিয়েতেও বাজনা বাজিয়েছে; গণেশ দাবি করে দীনবন্ধু মশায়ের অর্থাৎ তার পিতামহের শ্রাদ্ধেও সে ঢাক বাজিয়েছে। আশি-পঁচাশি বৎসর বয়স হবে গণেশের। সেই কারণেই গণেশ তাঁকে ছোটমশায় বলত।
জীবনমশায় প্রশ্ন করেছিলেন-গণেশ? কী রে? তোর কী হল?
—অ্যাঁ? কান দেখিয়ে গণেশ বললে—জোরে বল!
ভুল হয়ে গিয়েছিল তার, গণেশ চিরদিন কালা, বৃদ্ধ বয়সে বেশি হয়েছে। নিজেই চিৎকার করছে অর্থাৎ নিজেই শুনতে পাচ্ছে না নিজের কথা। মশায় কণ্ঠস্বর উঁচু করেই বলেছিলেন-কী ব্যাপার?
—অসুখ! ব্যাধি ধরেছে।
–তোরও অসুখ হল শেষে?
–হবে না? যেতে হবে না?
–হবে নাকি?
–তাই তো দেখতে বলছি গো। দেখ। মনে যেন তাই লাগছে, বুঝেছ?
–অসুখটা কী তাই বল আগে।
–পেটের গোলমাল গো!
–পেটের গোলমাল?
–হ্যাঁ। হাতখানা বাড়িয়ে দিয়ে মুখর বৃদ্ধ বলেই গিয়েছিল—বুঝেছ, আরও হয়ত ছ মাস। এক বছর বাতাম। তা সেদিন ঢাক বাজিয়ে ভাইপো একটা পঁঠার চরণ এনেছিল; তা মনে হল জীবনে এম পিথিমীতে, মাংস তো খেলাম না। সারাজীবনে বাদ্যি বাজিয়ে পেসাদী মাংস পেলাম। অনেক, মুখে দিলাম না। অথচ সাধ তো আছে। ও না খেলে তো ছুটি হবে না। তাই বাপু খেলাম। ভালই লাগল। কিন্তু ওতেই লাগল ফ্যাসাদ। পেটের ব্যামো হল—দুদিন খুব পেটে মোচড় দিলে, তাপরেতে ঘাটে গেলাম একদিন; খুব সে ঘাটে-যাওয়া। সেই সূত্রপাত। এখন তোমার দু মাস হয়ে গেল—সেই চলেছে। এখন আবার আমেশা হয়েছে। কী রকম মনে হচ্ছে বাপু।
