—আমার যে মশায় বংশে জন্ম আতর-বউ। আমার যে একটা কর্তব্য আছে। বনুকে প্ৰায়শ্চিত্ত করানো আমার কর্তব্য।
–না-না-না।
বনবিহারী সে কথা শুনতে পেয়েছিল। হাউহাউ করে কেঁদেছিল সে।বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও। প্ৰায়শ্চিত্ত আমাকে করিয়ো না। তা হলে আমি আরও বাঁচব না।
—বেশ, তা হলে কিছু খেতে যদি সাধ থাকে—খেতে দিয়ে। আতর-বউ তাও পারেন নি। সেদিনের জ্বরটা ছেড়ে গেলে বনবিহারী নিজেই আচার চেয়ে খেয়েছিল।
আতর-বউ দেন নি, দিয়েছিল বনবিহারীর স্ত্রী। পরের দিন বনবিহারী ভাল রইল। চক্রধারী। কুইনিন ইনজেকশন দিয়ে গেল।
জীবনমশায় জানতেন—এরপর একটা প্রবল জ্বর আসবে। আগামীকালের মধ্যে।
কখন আসবে জ্বর?
বিনিদ্র হয়েই শুয়ে ছিলেন। ভাবছিলেন।
গভীর রাত্রে সেদিন আবার ডাক এসেছিল।
—ডাক্তারবাবু! ডাক্তারবাবু!
–কে?
–আজ্ঞা, পশ্চিম পাড়ার হাজি সাহেবের বাড়ির লোক।
–কী? ছেলে কেমন আছে? ডাক্তার উঠে বসেছিলেন। হাজির ছেলের সান্নিপাতিক চিকিৎসা তিনিই করেছেন।
—আসতে হবে একবার। বড় বাড়াবাড়ি।
–যাচ্ছি। চল।
পথ সামান্য। মাইল দেড়েক। কিন্তু অন্ধকার রাত্রি, ধানক্ষেতের ভিতর দিয়ে পথ। মশায় ভারী পায়ে শব্দ তুলে ভাবতে ভাবতে চলেছিলেন। লোকটা চলেছিল আলো হাতে কাঠের কলবাক্স মাথায় নিয়ে আগে আগে । যমে-মানুষে লড়াই। রোগে ভেষজ দ্বন্দ্ব। মনে আছে, সব ভুলে শুধু চিন্তা করেছিলেন–ষ্ট্ৰিকনিন, ডিজিটেলিস, এড্রেনলিন। হার্ট, নাড়ি, রেসপিরেশন। গভীর চিন্তায় মগ্ন মশায় যেন ঘুমের ঘোরে পথ চলেছিলেন সেদিন, রাত্রির অন্ধকার, দুপাশের ধানক্ষেত এসব যেন কিছু ছিল না। মধ্যে মধ্যে নক্ষত্রঝলমল আকাশের দিকে চোখ পড়েছিল। ক্ষণিকের জন্য, আবার সঙ্গে সঙ্গেই চোখ নামিয়ে নিয়েছিলেন।
সেখানে গিয়ে রোগীর বিছানার পাশে বসে নাড়ি পরীক্ষা করে আলো তুলে ধরে রোগীর উপসর্গ লক্ষ্য করে চোহারা দেখে গন্ধ বিশ্লেষণ করে অনেক চিন্তা করে ওষুধ দিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ বসে ওষুধের ক্রিয়া লক্ষ্য করে বাড়ি ফিরেছিলেন। হাজির নাতির ক্রাইসিস কাটবে। প্রশান্ত অথচ অবসন্ন মনেই আকাশের দিকে তাকিয়ে ভগবানের কাছে বনবিহারীর মঙ্গল কামনা করেছিলেন। সবই জানেন—তবু কামনা করেছিলেন।
পূর্বদিগন্ত থেকে পাণ্ডুর জ্যোত্মাকে গ্রাস করে অন্ধকার সম্প্রসারিত হচ্ছে, দূরের গ্রামান্তর। অন্ধকারে অস্পষ্ট হয়ে হয়ে অন্ধকারে ঢাকা পড়ছে।
ঠিক রোগীর দেহে মৃত্যুলক্ষণ সঞ্চারের মত; নখের কোণ নীল হয়ে উঠছে, হাত-পায়ের তালুর পাণ্ডুরতা ক্রমশ সর্বদেহে ব্যাপ্ত হচ্ছে।
বাড়ি ফিরে একবার থমকে দাঁড়িয়েছিলেন। ‘
না। তখনও জ্বর আসে নি। ভালই আছে বনু। সকলে গাঢ় ঘুমে ঘুমুচ্ছে।
তিনিও ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। মনে হল—তার ঘরের দরজায় কে তাঁকে ডাকছে।-বাবা!
বনু!
কী হল? তাড়াতাড়ি দরজা খুলেছিলেন; সামনে উঠানে অন্ধকার থমথম করছে, গাঢ় নির্জনতার মধ্যে ঝিঝি ডাকছে। কই বনু? কে ডাকলে সম্ভবত তার মনে হয় বনু ডেকেছে। একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে তিনি বনুর ঘরের দরজায় গিয়ে ডেকেছিলেন—আতর-বউ!
—অ্যাঁ! সাড়া পেয়ে চমকে উঠেছিলেন জীবনমশায়। আতর-বউ জেগেছে। তবে আসছে।
–বনু কেমন আছে?
শীতশীত করছে বলছে, হয়ত জ্বর আসবে।
আসবে নয়, তখন এসেছে! উঃ, সে কী ভীষণ কম্প!
***
সেই কম্পই শেষ কষ্প বনুর।
মশায় সেদিন শেষরাত্রির আকাশের দিকে তাকিয়ে একা দাঁড়িয়ে ছিলেন আরোগ্যনিকেতনের দাওয়ার উপর। উত্তর-পশ্চিম কোণে কালীতলা, দাওয়ার পাশেই কুয়ো, করবীর গাছ দুটো ফুলে ভরা। সামনে শিশির ভেজা ধুলোয়-ভরা নিথর পথখানা পড়ে ছিল। তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে তারাগুলিকে দেখছিলেন, কোথায় কোন্ তারা? কোথায় সপ্তর্ষিমণ্ডল, অরুন্ধতী কোথায়? ধ্ৰুব? ধ্রুবতারা গেল কোথায়? কাল পুরুষ? পূর্বদিগন্তে তখন দণ্ড দুয়েক আগে চঁদ উঠেছে; কৃষ্ণপক্ষের দ্বাদশীর চাঁদ। তাদের মতে ক্ষয়রোগগ্রস্ত চাদ; পাণ্ডু বিবৰ্ণ, ক্ষয়িত কলেবর, পাঁচ ভাগের চার ভাগ ক্ষয়ে গিয়েছে; ক্লান্তির আর পরিসীমা নাই যেন। জ্যোক্সও স্নান। আকাশে ছড়িয়েছে কিন্তু তাতে আকাশের দ্যুতি খোলে নাই। নীলিমার মধ্যেও যেন পাণ্ডুরতার ছায়া পড়েছিল। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই শশাঙ্কের বউয়ের কথা মনে পড়েছিল। দৃষ্টি নামিয়ে তাকিয়েছিলেন শশাঙ্কের বাড়ির গলিপথটার দিকে। সেদিনও ওই গলিটার মুখে তখন জ্যোত্মার একটা ফালি মলিন-থানকাপড়-পরা একটি বিষণ্ণ নারীমূর্তির মত দেওয়ালের গায়ে লেগেছিল; কিন্তু সেদিন আর শশাঙ্কের স্ত্রী বা মঞ্জরী বলে ভ্ৰম হয় নাই।
ঠিক এই সময়েই বনুর উচ্চ চিৎকার শোনা গিয়েছিল—গেল! গেল! গেল! ধর! ধর! ধর! আঃ! হা-হা-হা! মা! মা! মা! প্ৰলাপ বকতে শুরু করেছিল বনু।
–বাবা! বনু! বনু রে! সাড়া দিয়েছিলেন আতর-বউ।
শেষ সময়ে বনুর একবার জ্ঞান ফিরেছিল। কেঁদেছিল সে।
—আমাকে বাঁচাতে পারলে না!
মশায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
আতর-বউ ডেকেছিলেন—একবার দেখে যাও। কিছু ওষুধ দাও। লোকে বলে তোমার ওষুধে মরণ ফিরে যায়।
—যায় না। কারুর ওষুধে যায় না। আমাকে ডেকো না।
চক্রধারী অবশ্য এসেছিল; শিয়রে সে-ই বসেছিল। দুটো ইনজেকশনও সে দিয়েছিল। কিন্তু মৃত্যুকে ডাকলে সে কোনো প্রতিরোধই মানে না। সে শক্তির আবিষ্কার হয় নি, হবে না। যতক্ষণ ব্যাধি ততক্ষণ ওষুধ, কিন্তু ব্যাধির হাত ধরে মৃত্যু এসে আসন পাতলে সব ব্যর্থ।
