ওই চক্রধারী ডাক্তারকে মশায় বলেছিলেন–চক্রধারী, বনবিহারী এত সালসা পেরিলা খায় কেন হে? জিজ্ঞাসা কোরো তো।
চক্রধারী হেসে বলেছিল বনবিহারী তো নিজেই ডাক্তার; ওসব ওর উপরে ছেড়ে দিন।
–হুঁ। কিন্তু—
–ও নিয়ে আপনি ভাববেন না। সেসব সেরে গিয়েছে। সালসা পেরিলা খায় শরীর ভাল হবে বলে। আমিও খাই।
—ভাল।
কিন্তু প্রকৃতি অনাচার সয় কতদিন? অমিতাচারী অসতর্ক বনবিহারী পড়ল ম্যালেরিয়ায়। বিচিত্র ব্যাপার; ডাক্তার বনবিহারী কুইনিন খেত না; কুইনিনের বদলে প্রতিষেধক হিসেবে খেত ব্রান্ডি। মশায় নিজে খেতেন শিউল পাতার রস, মধ্যে মধ্যে কুইনিনও খেতেন। বনবিহারী হাসত। দেশে তখন প্রবল ম্যালেরিয়া। বছরের পর বছর পাহাড়িয়া নদীর বন্যার মত দেশকে বিধ্বস্ত করে চলেছে। ওই দাঁতুর মত। জ্বর হলে বনবিহারী ম্যালেরিয়া মিকশ্চারের সঙ্গে আউন্স দুয়েক ভাইনাম গ্যালেসিয়া মিশিয়ে নিত। নিজেই প্রেসক্রিপশন করে নিজের ডাক্তারখানা থেকেই আনিয়ে নিত। নিজের ডাক্তারখানায় না থাকলে পাঠাত নবগ্রামে সীতারামের দোকানে। সীতারাম বনবিহারীর সঙ্গী হয়ে উঠেছিল। সীতারামও মরেছে অকালে। অমিতাচারের নিমন্ত্রণে মৃত্যু তার জীবনে এসে প্রবেশ করেছিল কদর্যতম মূর্তিতে। কুষ্ঠ হয়েছিল সীতারামের। কখন হয়েছিল উপদংশ—তাকে গোপন করেছিল। তারই বিষজর্জরতায় সীতারামের দেহরক্ত কুষ্ঠবীজ সংক্রমণের গুপ্তপথ খুলে দিয়েছিল। হতভাগ্য সীতারাম।
হতভাগ্য বনবিহারী। ক্রমে ক্রমে অমিতাচার অনিয়মের প্রশ্রয়ে রোগ হয়ে উঠল জটিল। আয়ুও ক্ষয় হল, দেহ জীৰ্ণ হল।
লিভার, প্লীহ্যাঁ, পুরনো ম্যালেরিয়া, রক্তহীনতা, পানভোজনের প্রতিক্রিয়া—সব জড়িয়ে সে এক জটিল ব্যাধি।
জীবনমশায় মনে মনে বনবিহারীর অকালমৃত্যুর কথা অনুমান করেছিলেন। মশার বংশের আয়ু মহৎ সাধনার পরমায়ু সে পাবে না, পাবার অধিকারীই নয়। কিন্তু এত শীঘ্ৰ যাবে, ভাবতে পারেন নি। অকস্মাৎ একদিন চোখে পড়ে গেল। সকালবেলা বাড়ির ভিতরে দাওয়ায় বসে বনবিহারী চা খাচ্ছিল। আরোগ্য-নিকেতন থেকে কী একটা বিশেষ প্রয়োজনে বোধ করি টাকা নেবার জন্য তিনি বাড়ি ঢুকেছিলেন। পূর্বন্বারী কোঠাঘরের বারান্দায় বনু বসেছিল, পরিপূর্ণ রৌদ্র উপভোগের জন্য।
বনবিহারীর রৌদ্রালোকিত মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি থমকে দাঁড়িয়েছিলেন। রক্তহীন বিবৰ্ণ মুখ বনবিহারীর, দৃষ্টি ক্লান্ত এবং ওই বিবৰ্ণ পাণ্ডুরতার উপরে যেন একটা পাংশু অর্থাৎ ছাই রঙের সূক্ষ্ম আস্তরণ পড়েছেনয়?
সেদিন তিনি বিধিলঙ্ন করে গোপনে ঘুমন্ত বনবিহারীর নাড়ি পরীক্ষা করেছিলেন; সন্তৰ্পণে হাতখানি নামিয়ে রেখে নেমে এসেছিলেন। তিনিই সেদিন নিজে চক্রধারীর কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন বনবিহারীর রোগ কি কমেছে চক্রধারী? কী বুঝছ?
চক্রধারী একটু চিন্তিত হয়েই বলেছিল—আমার মনে হচ্ছে ব্যাপারটা অন্যরকম। আমি বলব বলব ভাবছিলাম। বনবিহারীকে আমি বলেছি। আমার মনে হচ্ছে কালাজ্বর।
–কালাজ্বর?
–হ্যাঁ। বনবিহারীকে একবার কলকাতায় পাঠান। একবার দেখিয়ে আসুক।
–যাক। তাই যাক। তুমি যখন বলছ। যাক।
–আপনি একদিন দেখুন ভাল করে।
–না। দেখা উচিত নয়। আর–যাক। যাক, কলকাতা গিয়ে দেখিয়ে আসুক।
বনবিহারী কলকাতা গেল, সঙ্গে আতর-বউ গেল। মশায় বলেছিল—বউমাকেও নিয়ে যাও সঙ্গে।
—বউমাকে? কেন? না। ওই সৰ্বনাশীকে বিয়ে করেই বনু আমার গলে গেল রোগে। না। ওর নিশ্বাস আমি লাগতে দেব না।
মশায় আবার বলেছিলেন—এসব বলতে হয় না আতর-বউ। ওতে ছেলে-বউ দুজনের মনেই কষ্ট হয়। বউমাকে সঙ্গে নিয়ে যাও, আমার কথা শোন, তোমার সাহায্য হবে, তা ছাড়া বনুর মন ভাল থাকবে। এখন মন ভাল থাকাটা আগে দরকার।
এই শশাঙ্কর বধূটির কথা সেদিন মনে পড়েছিল। মনে মনে বলেছিলেন তোমাকে মাছের মুড়ো খেতে দিয়েছিলাম। এবং তোমাকে দেওয়া কথা অনুযায়ী আমার পুত্রবধূকে স্বামীসঙ্গ ভোগের জন্যই সঙ্গে পাঠাচ্ছি।
আসামের কালব্যাধি কালাজ্বর। এককালে মৃত্যু-আশ্রিত ম্যালেরিয়াই বলত লোকে। তারপর কালাজ্বরের স্বতন্ত্র স্বরূপ ধরা পড়েছে। জীবাণু আবিষ্কৃত হয়েছে। বাঙালি ডাক্তার ইউ. এন. ব্রহ্মচারী তার ওষুধ আবিষ্কার করেছেন।
তার বাবা বলতেন—আসামে এক ধরনের বিষজ্বর আছে। সাক্ষাৎ মৃতু; মহামারীর মত। গতিপ্রকৃতি। সেই রোগে ধরল বনবিহারীকে?
না। চক্রধারী নূতন ডাক্তার, নূতন কালের রোগ এবং নূতন ওষুধের উপর একটি ঝোঁক আছে। তিনি নাড়ি দেখে বুঝেছিলেন জীৰ্ণ জ্বর পুরনো ম্যালেরিয়া-জীবনকে ক্ষয় করে শেষ সীমান্তে উপনীত করেছে। অন্ধকার মৃত্যুলোকের ছায়ার আভাস ওই আস্তরণ।
তার কথাই সত্য হয়েছিল। রক্তপরীক্ষায় কালাজ্বরের বীজাণুর সাক্ষাৎ পাওয়া যায় নি। কলকাতায় বনবিহারীর শিক্ষকেরা যত্ন করেই দেখে ব্যবস্থাপত্র করে তাকে বায়ু পরিবর্তনে। যেতে আদেশ করেছিলেন।
কিন্তু সেখান থেকে ফিরে এল জীর্ণতর হয়ে।
রোগ মৃত্যুরোগে পরিণত যখন হয়তখন রিপুই জীবনের বুদ্ধিদাতা। অমৃত বলে বিষ খাওয়ার দুৰ্ম্মতি দেয় সে। পোর্ট ওয়াইন খেতে দিয়েছিলেন ডাক্তার। বনবিহারী দুদিনে এক বোতল পোর্ট খেত, তার সঙ্গে দ্রুত শক্তি সঞ্চয়ের জন্য মুরগি খেতে শুরু করেছিল।
মৃত্যুর তিন দিন আগে মশায় আতর-বউকে বলেছিলেন-বুক বাঁধতে হবে আতর-বউ। বনুর ডাক এসেছে।
আতর-বউ বজ্ৰাহতের মত কয়েক মুহূর্ত স্তম্ভিত থেকে বজ্ৰবহ্নিতে জ্বলে উঠেছিলেন, বলেছিলেন বলতে তোমার মুখে বাঁধল না? তুমি বাপ!
