যাত্রার দলের অভিমন্যর চেয়ে বহুগুণ দীনতার সঙ্গে কাতর কান্না কেঁদে মরেছিল বনবিহারী। অবশ্য আসল নকলে তফাত আছে—কিন্তু যাত্ৰাদলের ওই মৃত্যুর অভিনয় সত্যও যদি হত—তবুও তার তুলনা ভুল নয়। বনবিহারী মারা গিয়েছে ম্যালেরিয়ায়। বনবিহারী রিপুর প্ররোচনায় দেহখানাকে করে রেখেছিল রোগের বীজের পক্ষে অতি উর্বর ক্ষেত্রের মত অনুকূল। দাহ্য বস্তুতে সামান্য একবিন্দু আগুন যেমন সর্বধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডে পরিণত হয়—ঠিক তেমনভাবেই ম্যালেরিয়া মৃত্যুরোগে পরিণত হল। আর. জি. কর স্কুল থেকে পাস করেই সে এসেছিল। বিলাসী তরলচিত্ত উল্লাসচঞ্চল উচ্ছঙ্খল বনবিহারী। তখন তার ধারণা সে ধনীর সন্তান। জমিদারের সন্তান।
হায়রে সেই এক আনা অংশের জমিদারি! তাকেও একদিন অহংকৃত করেছিল। তার উপর বনবিহারী তখন এক অবস্থাপন্ন মোক্তারের একমাত্র কন্যাকে বিবাহ করে তার সম্পত্তিরও ভাবী উত্তরাধিকারের স্বপ্ন দেখছে। বিবাহ অবশ্য তিনিই দিয়েছিলেন। তবে পছন্দ আতর-বউয়ের! তিনিও অমত করেন নি। পিতার একমাত্র উত্তরাধিকারিণী কন্যাকে তিনি পছন্দ করেছিলেন। শ্বশুর দিয়েছিল দামি সাইকেল, জামাই সাইকেল চড়ে ডাকে যাবে; দিয়েছিল ভাল ঘড়ি, ঘড়ি দেখে নাড়ির বিট গুনবে, হার্টের বিট গুনবে। নতুন চমৎকার বার্নিশ-করা আলমারি চেয়ার টেবিল, ডাক্তারখানার সরঞ্জাম। আরোগ্য-নিকেতনের ওই দিকে একখানা ছোট কুঠুরিতে বনবিহারী ডাক্তার বসতে শুরু করল। নতুন সাইনবোর্ড টাঙালে সঞ্জীবন ফার্মেসি। তিনি সকল কাজই করেছিলেন কিন্তু নিজে থেকে কিছু করেন নি। মনের মধ্যে ঘুরেছিল শশাঙ্কের স্ত্রীর কথা। তখন অবশ্য পাঁচ বছর হয়ে গিয়েছে। বনবিহারীও মৃত্যুকে নিমন্ত্রণের পথে অনেকটা এগিয়েছে। মদ ধরেছে।
জীবনমশায় সহজ রোগী বনবিহারীর কাছে পাঠিয়ে দিতেন। কিন্তু আশ্চর্য, এই মশায় বংশের কুলগত চিকিৎসাবিদ্যার বুদ্ধির এতটুকুও বোধ বনুর মধ্যে স্কুরিত হয় নি।
হবে কী করে? যে ধ্যানযোগে বিজ্ঞান ধারণায় ধরা পড়ে সে ধ্যান সে কোনোদিনই করে নি, করতে চায় নি। রোগীর চেয়ে ভিড় বেশি হত বন্ধুর। নামের ব্রাহ্মণবাবুদের ছেলেরা আসত বনুর ডিসপেনসারিতে। কাপের পর কাপ চা আসত। হাস্যধ্বনিতে আতুরালয়ের মৌন বিষণ্ণতা যেন চাবুকের আঘাতে মুহুর্মুহুঃ চকিত ত্রস্ত হয়ে উঠত। রোগীরা বসে থাকত। সংশয়াপন্ন রোগীর স্তিমিত জীবনদীপের শিখাকে সমুজ্জ্বল করবার জন্য শাস্ত্রোক্ত সঞ্জীবনী তৈলের মত ওষুধ যে ব্রান্ডি, সে ব্রান্ডি চলত উল্লাসের জন্য।
এখানে পড়বার সময় ব্যভিচার থেকে তার ব্যাধি হয়েছিল। কলকাতায় পড়তে পড়তে আবারও ব্যাধিগ্রস্ত হয়েছিল। সে কথা সে তাকে জানায় নি। কিন্তু তিনি বুঝেছিলেন, সালসা খাওয়া দেখে ধরেছিলেন। তখন সালভারশন ইনজেকশন উঠেছে বটে কিন্তু খুব প্রচলন হয় নি। রক্ত পরীক্ষার এত ব্যাপক প্রসার হয় নি, সহজ সুযোগও ছিল না। দুটি তিনটি ইনজেকশনে ক্ষত নিরাময় হলেই লোলাকে ইনজেকশন বন্ধ করত। প্রথম মহাযুদ্ধের পর তখন সালভারশনের দাম অনেক এবং ওষুধ দুষ্প্রাপ্য। ক্ষত নিরাময়ের পর লোকে সালসা খেত। উইলকিনসন্স্ সারসা পেরিলা।
তখন দাতব্য চিকিৎসালয়ের ডাক্তার চক্রধারী ঘোষ, বনবিহারী থেকে কয়েক বছরের বড়, বনবিহারীর বন্ধু। বনবিহারীর মজলিসে চক্রধারী আসত, বিকেলবেলা এখানেই চা খেত; সন্ধ্যার পর বনবিহারী যেত চক্রধারীর বৈঠকে। সেখানে গানবাজনার আসর বসত-নিরুদ্বেগে নিরুপদ্রব উল্লাস চলত। গানবাজনা পানভোজন। গভীর রাত্রে বনবিহারী ফিরত। যেদিন মশায় বাড়িতে থাকতেন সেদিন বনবিহারীর জড়িত কণ্ঠস্বর তাঁর কানে আসত। বনবিহারীর সঞ্জীবন ফার্মেসিতেও মধ্যে মধ্যে নৈশ আড্ডা বসত-পানভোজন চলত। সকালবেলা উঠে জীবনমশায় দেখতে পেতেন উচ্ছিষ্ট পাতা, ভুক্তাবশেষ, দাওয়ার ধারে দুর্গন্ধ উঠত, দেখতে পেতেন বমি করার চিহ্ন, অগন্ধের সঙ্গে বিকৃত মদ্যগন্ধ পেতেন—ভনভন করে মাছি উড়ত; দু-একটা কুকুর তাই চাটত আর মশায়কে দেখে লেজ নাড়ত। কিন্তু বলবার উপায় থাকত না। এসব ক্ষেত্রে প্রায়ই জড়িত থাকতেন—জামাতা। সুরমা সুষমার তখন বিবাহ হয়েছে।
দুটিই পয়সাওয়ালা বাপের সন্তান; উচ্চ কুলীন। কী করবেন? সেকালের বিচারে তারাই সুপাত্র। তবু তিনি খুঁতখুঁত করেছিলেন। পেয়েছিলেন ভাল ছেলে। স্কুলমাস্টার। কিন্তু সে অন্য কারও পছন্দ হয় নি। চল্লিশ টাকা মাইনে কি উপার্জন? লোকে নিন্দা করে বলেছে—ছি-ছি–ছি—এই বিশ-পঁচিশ বিঘে জমি-সম্বল পরিবার কি মশার বংশের যোগ্য কুটুম্ব সবচেয়ে বেশি বলেছিল আতর-বউ এবং বনবিহারী। শুধু ওরাই নয়, তিনি নিজেও দায়ী। উঁর মনও এতে সায় দিয়েছিল। তবে একটা বিষয়ে তিনি প্রতারিত হয়েছিলেন। তার জন্য মানুষ দয়ী নয়, কাল তাঁকে প্রতারিত করেছিল। তিনি বুঝতে পারেন নি যে কালধর্মে উত্তরপুরুষ কুলধৰ্ম ত্যাগ করেছে জীর্ণ কন্থার মত। এ অঞ্চলের বৈষ্ণব মন্ত্ৰ উপাসক কায়স্থ সমাজের ছেলেরা কালধর্মে মদ্যপানে অভ্যস্ত হয়েছে বা হবে এটা তিনি অনুমান করতে পারেন নি।
মহাসমারোহ করেই তিনি মেয়েদের বিয়ে দিয়েছিলেন। তারা আসত। তাদের আসার অজুহাতেই মশার বংশের অন্দরের রান্নাশালে মাংস প্রবেশ করেছিল।
অতীত কথা মনে করতে করতে গভীর দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন বৃদ্ধ জীবনমশায়।
