পরক্ষণেই হেসেছিলেন না কেউ নয়। জ্যোত্স পড়েছে দুটি ঘরের মাঝের গলিতে।
মঞ্জরী নয়, কৌতুকে সে হাসছে না।
মঞ্জরী তো মরে নি; সে ছায়ামূর্তি ধরে আসবে কী করে? তবে এ তারই অভিশাপ। তাঁর অভিশাপে মঞ্জরীর জীবন ব্যর্থ হয়েছে। মঞ্জরীর অভিশাপ তাঁকে লাগবে না? অথবা তার নিজের অভিশাপ মঞ্জরীর মত একটা সামান্য মেয়ের জীবন পুড়িয়ে শেষ হয় নি—ফিরে তাকে নিজেকেই লেগেছে।
মঞ্জরী বিধবা হয়েছে। ভূপী বোস মরেছে। ওই সেদিন আতর-বউ ছেলের সামনে মঞ্জরীর কথা তুলে তাঁকে মনে করিয়ে দিলে নতুন করে। তারপর তিনি খোঁজ নিয়েছিলেন। মঞ্জুরী বিধবা হয়েছে। সন্তান বলতে একটি মেয়ে। সে পেয়েছে বাপের সোনার মত রঙ আর মায়ের তনুমহিমা, মুখশ্ৰী। ভূপী সর্বস্বান্ত হয়ে মরেছে। মেয়েটির কিন্তু ওই রূপের জন্য এবং বংশগৌরবের জন্য বড় ঘরে বিয়ে হয়েছে। মঞ্জুরী এখন মেয়ের পোষ্য। মেয়ের মেয়েকে নিয়ে সে নাকি সব ভুলেছে। পরমানন্দে আছে।
দাঁড়িয়ে ভাবছিলেন জীবনমশায়।
আতর-বউ এসে ডেকেছিল—বাড়ির মধ্যে এস! ছেলে এল। তুমি দাঁড়িয়ে রইলে।
জীবনমশায় বলেছিলেন আজ রাত্রে বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে একটা খাওয়াদাওয়া করব ভাবছি। বনু এল।
—তা কর না।
জীবনমশায় ইন্দিরকে ডেকে একটা ফর্দ তৈরি করে দিলেন—কালাচাঁদ চন্দ রোকায় অবগত হইবা। ফর্দ অনুযায়ী জিনিসগুলি ফৰ্দবাহককে দিবা। দাম পরে পাইবা। ফর্দের শেষে পুনশ্চ লিখে দিলেন—আমার নামে বরং একটা হিসাব খুলিবা। অতঃপর তোমার দোকান হইতেই জিনিস আনিব। মাহ চৈত্র ও আশ্বিনে দুই দফায় হিসাবমত টাকা পাইবা।
নন্দ তখন ছোট। নন্দকে ডেকে বলেছিলেন নোটন জেলেকে ডেকে আন, বল। চার-পাঁচজন জাল নিয়ে আসবে। মাছ ধরানো হবে পুকুরে।
আর ডাকতে পাঠালেন বিখ্যাত পাখোয়াজী বসন্ত মুখুজ্জেকে। গাইয়েও তিনি নিয়ে আসেন।
হোক, গানবাজনা হোক। বাকি যে কটা দিন আছে—সে কটা দিন খেলে হইহই করেই কাটুক। পরমানন্দ মাধবকে পাওয়া তার ভাগ্যফলও নয়, কর্মফলও নয়।
২৫. গলির সেই লম্বা ফালি জ্যোৎস্নাটা
গলির সেই লম্বা ফালি জ্যোৎস্নাটা ধীরে ধীরে আকাশে চাঁদের অগ্রগতির সঙ্গে গলির ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে গলির মুখে তখনও যেন দেওয়ালে ঠেস দিয়ে ঠিক মানুষের মত দাঁড়িয়েছিল। ওইটেই শশাঙ্কের বাড়ির গলি। ওই দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েই শশাঙ্কের স্ত্রী তাকে অভিসম্পাত দিয়েছিল।
বনবিহারী অকালেই মারা গিয়েছে। কিন্তু বনবিহারীর মৃত্যুর নিষ্ঠুর আঘাতে বিচলিত বিহ্বল হয়ে মনে মনেও কোনোদিন পুত্ৰশোককে ওই মেয়েটির অভিশাপ বলে স্বীকার করেন নি।
নিজে ডাক্তার হয়েও বনবিহারী মৃত্যুকে নিমন্ত্রণ করেছিল মৃত্যু ফিরে যাবে কেন? ডেকে এনে তার সে কী ভয়? সে কী বাঁচবার ব্যাকুলতা! ওই দাঁতুর মত। ওই মতির মায়ের মত! যখন মনে পড়ে তখন শশাকের চেয়ে দুঃখ হয় বেশি। যে মানুষ মরতে চায় না, জলমগ্ন মানুষের মত দু হাত শূন্যে বাড়িয়ে আমাকে বাঁচাও বলে ড়ুবে যায় তার জন্যেই শোক হয় মর্মান্তিক। নইলে শোক তো শুভ্র শান্ত-জীবনের মহাতত্ত্ব। শান্ত শোক জীবনকে কয়েকটি দিনের জন্য বৈরাগ্যের গৈরিক উত্তরীয় পরিয়ে নিয়ে মনোহর করে তোলে। কানের কাছে সত্যসঙ্গীত ধ্বনিত করে। তোলেবাউল বৈরাগীর মত। অন্যহনি ভূতানি গচ্ছন্তি যমমন্দিরং। অন্য বংশে অন্য কুলে এ হয়ত সম্ভব নয় কিন্তু মশায় বংশে–সে তো অসম্ভব ছিল না। মনে পড়ছিল প্রথম যৌবনে। বিখ্যাত শখের দলের অভিমন্যুবধ পালার কথা। সেই প্রসঙ্গে চণ্ডীতলার সাধক মহান্ত রঘুবর গোঁসাই কয়েকটি কথা বলেছিলেন যাত্ৰাদলের অধিকারীকে সেই কথাগুলি মনে গেঁথে আছে। সপ্তরথীর অস্ত্রাঘাতে ক্ষত-বিক্ষত দেহে কুরুক্ষেত্রের মাটিতে পড়ে ষোল বছরের কিশোর অভিমন্যু কাতর স্বরে কেঁদেছিল; সুকণ্ঠ প্ৰিয়দৰ্শন ছেলেটি কান্নামেশানো সুরে গান ধরেছিল–
অন্যায় ঘোর সমরে অকালে গেল প্ৰাণ আমার–
তৃতীয় পাণ্ডব পিতা মাতুল গোবিন্দ যার।
একে একে মা সুভদ্ৰা, প্রিয়া উত্তরার নাম ধরে সে এক মর্মচ্ছেদী করুণ সঙ্গীত! সারা আসরের লোকের চোখের জলে বুক ভেসে গেল।
গান শেষ হল; অভিমন্যু টলতে টলতে চলে গেল সাজঘরে। অঙ্ক শেষ হল—ঐকতানবাদন শুরু হল। রঘুবর গোস্বামী গম্ভীর কণ্ঠে অধিকারী মশায়কে ডেকে বললেন– অধিকারী মশায়, এ কী হইল ভাই?
-আজ্ঞে? অধিকারী প্রশ্ন বুঝতে না পেরে প্রশ্নই করল—খুলে বলুন?
–অভিমন্যু এমন করে কাদল কেন ভাই? অর্জুনের ছাওয়াল-কিষণজীর ভাগনাসে মরণকে ডরে এমন করে কাঁদবে কেন ভাই? কাঁদবে তো লড়াইমে সে আইল কেন দাদা? এমন করে সাত সাত বীরের সাথে লড়াই দিল কাহে ভাই? সে তো ভাই, হাত দুটা বঢ়ায়ে দিয়ে বন্ধন পরে বাঁচতে পারত ভাই? ভাঙা রথের চাকা নিয়ে লড়তে কেন গেল? অভিমন্যু তো কাঁদবে না। বীর বংশের সন্তানসে তো ভাই মরণকে ডরবে না।
অধিকারী হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন। এমন প্রশ্ন তো সাধারণত কেউ করে না! মানুষ কেঁদে সারা হয়ে আসর জমিয়ে তোলে। ধন্য ধন্য পড়ে যায়। তিনি সবিনয়ে সেই কথাই বলেছিলেন। বলেছিলেন-বাবা মানুষ এতে কাঁদে।
কথা কেড়ে নিয়ে গোস্বামী বলেছিলেন—তাই বলে দুখ দিয়ে কাঁদাবে ভাই; যাতনা দিয়ে কাঁদাবে? কাদন খুব ভাল জিনিস, মনকে ময়লা ধুয়ে যায়—দিল সাফা হয়—ঠিক বাত। কিন্তু তার জন্যে মাথায় ডাণ্ডা মারকে কাঁদাবে দাদা? প্রেমসে কাদাও; আনন্দসে কাদাও। তবে তো ভাই! অৰ্জুন মহাবীর। কিরাত বেশ ধরকে শিব আইলেন, তার সাথে লড়লেন; তার ছাওয়াল মরণকে ডর না করে বলুক, আওরে তু মরণ! মরণ আসুক হাত জোড় করকে আসুক। বলুকহামারা পুরী ধন্য হামি আজ ধন্য হইল। মরণকে ডরসে পরিত্রাণকে পথ দেখে মানুষ আনন্দসে কাঁদুক; তবে তো ভাই!
