না থেকে উপায় ছিল না। বনবিহারী ওই রোগাক্রান্ত হয়েই ক্ষান্ত হল না; রোগমুক্ত হওয়ার পরই সে লজ্জা-সংকোচ ঝেড়ে ফেলে দিলে অশোভন বেশভূষার মত। বৎসর খানেকের মধ্যেই বাপ এবং মায়ের যুধ্যমান অবস্থার সুযোগে প্রায় স্বাধীনতা ঘোষণা করে বসল। একদা সে এসে বললে—স্কুলে পড়া আর হবে না আমার দ্বারা।
মশায় তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন–হবে না?
–না। সংস্কৃত, অঙ্ক-ও আমার মাথায় ঢোকে না।
–ততঃ কিম্? হেসেই জীবনমশায় প্রশ্ন করেছিলেন।
অন্তরালবর্তিনী জননী প্রবেশ করে বলেছিলেন কলকাতায় নতুন ডাক্তারি স্কুল হয়েছে সেইখানে পড়বে ও। এখানে বছর বছর কত ফেল করবে?
—সেখানেও যদি ফেল করে?
–তখন তোমার মত ডাক্তার হবে। তুমি তো না পড়ে না পাস করে মুঠো মুঠো টাকা আনছ। বাপ যখন, তখন কুলবিদ্যেটা না হয় দয়া করে ছেলেকে শিখিয়েই দেবে।
—আমাদের কুলবিদ্যেতে যে সংস্কৃত বিদ্যে কিছু দরকার হয় ভদ্রে।
–কী, কী বললে আমাকে?
–ভদ্রে বলেছি। ভাল কথাই। মন্দ নয়।
–কিন্তু ঠাট্টা করে তো! তোমার মত অভদ্র আমি দেখি নি। বাপ হয়ে ছেলের উপর মমতা নাই?
চুপ করেই ছিলেন জীবনমশায়। কী বলবেন? ছেলের উপর মমতা? বনবিহারীকে এম. বি. পড়াবার বাসনা ছিল তাঁর। সে বাসনার মর্ম আতর-বউ বুঝবে না। ইচ্ছা ছিল ইচ্ছা ছিল বনবিহারী এম. বিহা তখন এল. এম. এস. উঠে এম. বি. হয়েছে—পড়তে আরম্ভ করলে তার বিয়ের আয়োজন করবেন। ঘটক পাঠাবেন। কান্দীতে কোনো জমিদার ঘরের মেয়ে আনবেন। গ্রামের জমিদারির এক আনা অংশ নবগ্রামে জমিদারি বলে গ্রাহ্য হলেও কান্দীতে গ্রাহ্য হয় না; বনবিহারী এম. বি. ডাক্তার হলে সে অগ্রাহ্য সাদর সাগ্ৰহ গ্রাহ্যে পরিণত হবে। কান্দী যাওয়ার বাসনা পূর্ণ করবেন। ওই ভূপীদের জ্ঞাতিগোষ্ঠীর ঘরের মেয়ে আনবেন। থাক, সে থাক।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মশায় বলেছিলেনভাল, তাই হবে। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন—তুমি তো বেলগাছিয়া আর. জি. কর মেডিক্যাল স্কুলের কথা বলছ?
–হ্যাঁ, সেখানে পাসটাসের দরকার হয় না।
—জানি বাবা, জানি। কিন্তু সেখানেও ফেল হয়, আমাদের নবগ্রামের রায়বাবুদের অতীন পাস করতে পারে নি। স্কুলে পাস করতে না পার সেখানে পাস করতে হবে তো। সেইটে যেন মনে রেখো।
—সে পাস ঠিক করবে। তিন পুরুষ এই বিদ্যে ঘটছে। দেখিস বাবা, ভাল করে পড়িস। হাতুড়ে বলে লোকে যেন মুখ না বাঁকায়। মশায় বংশের এই অখ্যাতিটা তোকে ঘুচোতে হবে।
ডাঃ আর. জি. কর মহাপুরুষ। অল্পবিদ্যা অল্প-সম্বল গৃহস্থ ছেলেদের মহা উপকার করেছিলেন। দেশে তখন ম্যালেরিয়ার মহামারণ চলেছে—বিলাতি ডাক্তারির হাঁকেডাকে, সরকারি অনুগ্রহে, তাঁর পসারে কবিরাজদের ঘরগুলি বন্ধ হতে বরু হয়েছে। দেশে বৈদ্যের অভাব। সেই সময়ে এইসব আধাডাক্তারেরা অনেক কাজে এসেছিল। শতমারি ভবেদ্ বৈদ্য, সহস্ৰমারি চিকিৎসক। হাজার হাজার লোক হয়ত এদের ভুলে ত্রুটিতে মরেছে ভুগেছে—কিন্তু হাজারের পর লোকেরা বেঁচেছে, সেরেছে।
হাসলেন বৃদ্ধ জীবনমশায়। আর. জি. কর মেডিক্যাল স্কুলে পড়তে গেল বনবিহারী। বনবিহারীর সঙ্গে গেল মামুদপুরের গন্ধবণিকদের ছেলে-বনবিহারীর অন্তরঙ্গ বন্ধু রামসুন্দর। মাস ছয়েক পরে বনবিহারী প্রথম ছুটিতে বাড়ি এল। গায়ে ডবল ব্রেষ্ট কোট, ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, সে আর এক বনবিহারী। বনবিহারীর মুখে সিগারেট। গায়ে কাপড়ে জামায় সিগারেটের গন্ধ; ডান হাতের তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল দুটির আগায় হলদে রঙের দাগ ধরেছে। সিদ্ধ জ্যোতিষী যেমন মানুষের আচারে আচরণে বাক্যে রূপে কর্মে নিজের গণনার রূপায়ণ দেখতে পান, অনিবার্য অবশ্যম্ভাবীকে সংঘটিত হতে দেখেন এবং লীলাদর্শন-কৌতুকে মৃদু হাস্য করেন, ঠিক তেমনি হাসিই তার মুখে ফুটে উঠেছিল সেই মুহূর্তে। পরমুহূর্তেই সে হাসি বিস্ময়ে পরিণত হয়েছিল তার। ইন্দির গাড়ি থেকে নামিয়ে রেখেছিল হারমোনিয়ামের বাক্স, এক জোড়া বায়া-তবলা, একটা পিতলের বাঁশি, জোড়া দুই মন্দিা, একজোড়া ঘুঙুর।
তা ভাল, তা ভাল। নৃত্যগীত-কলাবিদ্যা চৌষট্টি কলার শ্রেষ্ঠ কলা, তা আয়ত্ত করা ভাল। নাদব্ৰহ্ম। সঙ্গীতে ঈশ্বর-সাধনা হয়, প্রেম জন্মায় তা ভাল! এবং দীনবন্ধুমশায় নাম-সংকীর্তন করতেন—জগৎমশায় পদাবলী শিখেছিলেন, জীবনকে শিখিয়েছিলেন, তিন পুরুষের তিনটে মৃদঙ্গ—আরোগ্য-নিকেতনেরই উপরের ঘরে যত্ন করে রাখা আছে। হাল আমলে তার কেনা বড় খোলখানাই এখন ব্যবহার হয়, এরপর নূতন কালে এবং কালের অবশ্যম্ভাবী পরিণতিতে বংশের কর্মফলে অর্থাৎ তার কর্মফলে পরবর্তী পুরুষ খোল তিনখানার সঙ্গে বায়া-তবলা মন্দিরা বশি হারমোনিয়াম ঘুঙুর যোগ করলে তা ভাল! তা ভাল!
সময়টা ছিল সন্ধ্যা। আকাশে মাথার উপরে ছিল একাদশী দ্বাদশীর দ। জ্যোৎস্না ফুটিফুটি করছে। স্থানে স্থানে গাছপালা ঘরবাড়ির ছায়ার মধ্যে অন্ধকার যেখানে গাঢ় হয়েছে সেইসব স্থানে ফাঁকে ফাঁকে বেশ স্পষ্ট হয়ে ফালি ফালি ধোঁয়া কাপড়ের মত এসে পড়েছে। কোথাও কোথাও মনে হচ্ছে বোয়া কাপড় পরে কেউ যেন রহস্যময়ী আড়ালে গোপনে দাঁড়িয়ে সংকেত জানাচ্ছে। অতর্কিতে এই ছায়া দেখে চমকে উঠেছিলেন জীবনমশায়। প্রশ্ন করেছিলেন—কে? কে ওখানে?
হঠাৎ মঞ্জরীকে মনে পড়ে গিয়েছিল।
বনবিহারীর কুৎসিত রোগ প্রথম প্রকাশ হলেও তাকে মনে পড়েছিল। মনে হয়েছিল ভূপীর কুৎসিত রোগে তিনি হেসেছিলেন, তাই বোধহয় বনবিহারী সেই রোগ ধরিয়ে তাকে উপহাস করলে।
