সে তাঁকে একরকম অভিসম্পাত দিয়েছিল। সে অভিসম্পাত পূর্ণ হয়েছে। বনবিহারী মরেছে। শশাঙ্ক মরেছিল আগন্তুক ব্যাধির আক্রমণে। তার নিজের কোনো অপরাধ ছিল না। নিজের প্রবৃত্তি রিপু হয়ে মৃত্যুকে সাহায্য করে নি। একালের বীজাণু পরীক্ষার ব্যবস্থা এবং একালের বিস্ময়কর বীজাণুনাশক ওষুধ থাকলে হয়ত–। না। আপন মনেই ঘাড় নাড়লেন মশায়। বাচত না শশাঙ্ক। একালেও পেনিসিলিন প্রয়োগ করে সকল রোগীকে বাঁচানো যায় না। রোগের কারণ, বীজাণুর স্বরূপ নির্ণয় করেও ফল হয় না। তবু শশাঙ্কের কোনো অপরাধ ছিল না। তার মৃত্যু মানুষের চিকিৎসাবিজ্ঞানে অপূর্ণতা অসম্পূর্ণতা। মৃত্যু ধ্রুব—কিন্তু সে মৃত্যু–আয়ুর পরিপূর্ণ ভোগন্তে সূর্যাস্তের মত; প্রসন্ন-সমারোহের মধ্যে। সেই কারণেই শশাঙ্কের কোনো অপরাধ ছিল না এবং ওই বটির প্রতি মমতায় তিনি অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন। মুখে বলতে পারেন নি, ওই বধূটিকে নিমন্ত্রণ করে জীবন শেষবারের মত মাছ-মাংস খাইয়ে মনের বেদনাকে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে মেয়ে বিচিত্র মেয়ে! এই অদ্ভূত দেশের অদ্ভুত মেয়ে। যারা সেই কোন্ আদিকাল থেকে বৈধব্য পালন করে আসছে, দেহের ভোগকে ছেড়ে দিয়ে ভালবাসাকে বড় করতে চেয়েছে, এ মেয়ে সেই জাতের মেয়ে। অসাধারণ মেয়ে। বুঝতে পারেন নি মশায়।
সে তাঁকে অভিসম্পাত দিয়েছিল।
বিচিত্র যোগাযোগ, বনবিহারী এই অভিসম্পাত ফলবতী করবার জন্য আগে থেকেই সকল আয়োজন করে রেখেছিল তার জীবনে। সেই মেলার পর–প্রমেহ হয়েই শেষ হয় নি। বনবিহারী ক্ষান্ত হয় নি। আবারও হয়েছিল তার ওই ব্যাধি।
সে স্মৃতি তাঁর মর্মান্তিক।
দেহ যতক্ষণ জীর্ণ না হয় ততক্ষণ মৃত্যু কামনা করা পাপ, সে কামনা আত্মহত্যার কামনার শামিল। তিনি তাই করেছিলেন। আহার, বিহার সমস্ত কিছুর মধ্যে জীবনমশায় হয়ে উঠেছিলেন আর-এক মানুষ। কুলধর্মকে তিনি লঙ্ন করেন না। লঙ্ন করেছিলেন আয়ুকে রক্ষা করার, দীর্ঘ করার নিয়মকে। কোনো ব্যভিচারের পাপে কলঙ্কিত করেন নি বংশকে কিন্তু নিজের উপর অবিচারের আর বাকি রাখেন নি। মন উদ্ভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিল। দু হাতে উপার্জন করে চার হাতে খরচ করেছেন। অন্তর্দাহে যত পুড়েছেন তত সমারোহ বাড়িয়ে তুলেছেন বাইরের জীবনে। শুধু চিকিৎসাধর্মেই নিজেকে আবদ্ধ রাখেন নি, নানান কর্মে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। মদ খেয়ে নেশা করে লোক শোক দুঃখ ভুলতে চায়। তিনি কাজের নেশায়, নামের নেশায় নিজেকে ড়ুবিয়ে দিয়েছিলেন।
তাঁর আরোগ্য-নিকেতনের পাশে এই ইন্দারা করিয়েছিলেন তখনই। সেই শুরু। নিজে ছিলেন প্রেসিডেন্ট পঞ্চায়েত সরকারকে ধরে তিন ভাগ টাকা আদায় করে সিকি টাকা নিজেই দিয়েছিলেন। গ্রাম থেকে হাসপাতালের সামনে দিয়ে সেই দুর্গম পথচোর ধরার খানা, ঠ্যাঙভাঙার খন্দ-সঙ্কুল পথকে সুগম করে তুলেছিলেন। তাতেও দিয়েছিলেন সিকি টাকা।
দু-তিনখানা গায়ের মজুরেরা মজুরি না পেলে আরোগ্য-নিকেতনের সামনে এসে দাঁড়াত। তিনি যে-কোনো কাজে লাগিয়ে দিতেন।
মশার বংশের মহাশয়ত্ব তো যাবেই, যাবার আগে রক্তসন্ধ্যার মত সমারোহ করে তবে যাক।
নিজের দেহের উপর অবিচারেরও শেষ ছিল না।
সারাটা দিন না খেয়ে ঘুরেছেন। কল থাক বা না থাক, ঘুরেছেন—নেপালের ভাই সীতারামের ওষুধের দোকানে বসে গল্প করেই একবেলা কেটে গেছে। যে ডেকেছে গিয়েছেন চিকিৎসা করেছেন, ফিজ দিয়েছে নিয়েছেন—না দিয়েছে নেন নি। আবার পরদিন গিয়েছেন। সারারাত দাবা খেলা তখনই শুরু। গানবাজনার আসর বসিয়েছেন, যে-কোনো ওস্তাদ এলে সংবর্ধনা করেছেন, তার সঙ্গে খাওয়াদাওয়ার সমারোহ জুড়ে দিয়ে বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে উল্লাস করেছেন। কিন্তু সন্ধ্যার সময় কালীমায়ের নাটমন্দিরে জনকয়েককে নিয়ে হরিনাম সংকীর্তন করতে বিস্মৃত হন নি। কল থেকে ফিরতে রাত্রি হলেও একবার মায়ের ওখানে গিয়ে একা হাত জোড় করে গেয়ে এসেছেন—
রাধাগোবিন্দ জয়, রাধাগোবিন্দ।
ওটুকু ভুলে যান নি। মশার বংশের বৈষ্ণব মন্ত্রের চৈতন্য তাঁর জীবনে হল না। পরমানন্দ মাধবকে পাওয়া তার ভাগ্যে নাই—তবে স্মরণ কীর্তন করতে ভুলে যান নি। উদ্দাম উদ্ভ্রান্ততার মধ্যেও ওইটুকু স্থিতি প্রশান্তি ছিল।
আতর-বউ বার বার আপত্তি করত, বলত-পস্তাবে শেষে বলে রাখছি।
হা-হা করে হাসতেন মশায়—কাছাকাছি কেউ না থাকলে বলতেন—আরে মঞ্জরীর জন্যে সে আমলে বাজারে ধার করে খরচ করেও পস্তাই নি আমি। তার বদলে তোমাকে পেয়েছি। আজ রোজগার করে খরচ করছি—তাতে পস্তাব?
–কত রোজগার কর শুনি? আতর-বউয়ের মুখ লাল হয়ে উঠত।
–কত দরকার বল না! কত টাকা! আজই এখুনি দিচ্ছি তোমাকে। বল কী গয়না চাই। কী চাই?
—কিছু চাই না। আমি তোমার কিছু চাই না। মেয়েদের বিয়ে—ছেলের লেখাপড়া হলেই হল। আমি দাসীবাদী হয়ে এসেছিলাম—তাই হয়েই থাকব।
–মিছে কথা বলছ। তুমি এসেছিলে শাসনদণ্ড হাতে নিয়ে। সেই শাসন চিরকাল করছ। বুঝছ না, তোমার ছেলের জন্যে বড় আটন উঁচু আসন তৈরি করে দিয়ে যাচ্ছি। ছেলে তো। তোমার আমার মত হাতুড়ে হবে না। হবে পাস-করা ডাক্তার। কিন্তু আমাদের ঘর তো নবগ্রামের ব্রাহ্মণ বনেদি জমিদারদের চেয়ে খাটো হয়েই আছে আজও। তাকে উঁচুতে তুলে ওদের সঙ্গে সমান করে দিয়ে যাচ্ছি।
এইখানে আতর-বউ চুপ করত। স্তব্ধ হয়ে বিশ্বাস এবং অবিশ্বাসের দোলার মধ্যে স্থিরদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকত।
