অন্যমনস্কের মত মশায় বললেন– সকলে মিলে দেখবে!
২৪. বিপিন সুস্থ আছে
বিপিন সুস্থ আছে। নিজেই বললে—ভালই মনে হচ্ছে।
রতনবাবু বললে—আজ ইউরিন রিপোর্ট এসেছে। যে দোষটুকু ছিল অনেকটা কমে গিয়েছে।
মশায় যখন গেলেন, তখনও ডাক্তারেরা আসে নি। বিপিনের হাতের জন্য হাত বাড়িয়ে মশায় বললেন–ভাল হবার হলে এইভাবেই কমে। আমাদের সে আমলের একটা কথা ছিল।
রতন—তোমার নিশ্চয় মনে আছে—রোগ বাড়বার সময় বাড়ে তালপ্ৰমাণ, কমবার সময় কমে তিলে-তিলে।
—তুমি একবার নাড়ি দেখে আমাকে বল। কী বুঝছ? কী পাচ্ছ?
–রোজই তো বলছি রতন।
–না। আজ কেমন দেখলে—এখন কেমন আছে এ কথা নয়। সেই পুরনো আমলের নাড়ি দেখা দেখ। কত দিনে বিপিন উঠে বসতে পারবে।
বিপিন বললে—এ শুয়ে শুয়ে আর পারছি না। চাকাওয়ালা ইনভ্যালিড চেয়ারে যদি একটু বারান্দায় বসতে পাই—কি একটু বাইরে ঘুরে আসতে পারি তা হলে মনের অবসাদটা কাটে। তা ছাড়া এ যেন লজ্জায় আমি মরে যাচ্ছি। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের করুণার পাত্র। লোকে আহা উঁহুঁ করছে, গোটা সংসারের লোকের বোঝা হয়ে ঘাড়ে চেপে রয়েছি—এ আমার পক্ষে অসহ্য হয়ে উঠেছে।
মশায় চমকে উঠলেন মনে মনে। প্রতিষ্ঠাবান বিপিনের অন্তরলোকের অবস্থাটা যেন রঞ্জনরশ্মির মতই কোনো এক রশ্মিদ্টায় উদ্ভাসিত হয়ে প্রকাশিত হয়ে পড়ল। মশায়ের কাছে এটিও একটি উপসর্গ।
বিপিনের মুখের দিকে তাকিয়ে তার হাতখানি নিজের হাতের মধ্যে তুলে নিলেন। নাড়িতে উত্তেজনার আভাস ফুটে উঠেছে।
হাতখানি নামিয়ে রাখতেই বিপিন বললেকবে উঠতে দেবেন?
মশায় বললেন–কাল বলব। আজ তুমি নিজেই চঞ্চল হয়ে রয়েছ।
–চঞ্চল উনি অহরহই। সেইটেই আপনি নিষেধ করুন ওকে। বিপিনের খাটের ওদিকে দাঁড়িয়েছিল একটি মেয়ে বিপিনের স্ত্রী। রোজই থাকে। কথা বলে না। আজ সে বোধ করি থাকতে পারলে না, আজ সে কথা বলে ফেললে। প্রাণস্পর্শী সেবার মধ্যে এ উপসর্গটি তার মনে কাটার মত ঠেকেছে; সব থেকে গভীরভাবে বিদ্ধ করছে বলে মনে হয়েছে। তাই বোধ করি থাকতে পারে নি।
পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ বৎসর বয়স; শান্ত শ্ৰীময়ী মেয়ে; কপালে সিঁদুরের টিপসিঁথিতে সিঁদুর উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে, পরনে লালপেড়ে শাড়ি। ঘোমটা সরিয়ে আজ প্রাণের আবেগে তাঁর সামনে আত্মপ্রকাশ করে দাঁড়িয়েছে।
তিনি উত্তর দেবার আগেই উত্তর দিলে বিপিনদুর্বল কণ্ঠস্বর কাঁপছে, চোখ দুটি ঈষৎ। প্রদীপ্ত। সে বলে উঠল—নিষেধ করুন! নিষেধ করুন! নিষেধ করলেই মন মানে? মেয়ে জাত! কী করে বুঝবে তুমি আমার এ যন্ত্রণা!
মশায় ব্যস্ত হয়ে বললেন–বিপিন, বাবা! বিপিন।
রতনবাবু ডাকলেন বিপিনবিপিন!
দুটি জলের ধারা গড়িয়ে এল বিপিনের দুটি চোখ থেকে। শ্ৰান্ত ভগ্নকণ্ঠে সে বললে–আমি আর পারছি না। আমি আর পারছি না।
রতনবাবু গিয়ে মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়ালেন। বিপিনের স্ত্রী পাখা নিয়ে এগিয়ে এল; বিপিন অভিমানভরেই বললে–না। শ্ৰীমন্ত, তুমি বাতাস কর।
শ্ৰীমন্ত বিপিনের ছেলে। সে পাখাঁখাঁনি নিলে মায়ের হাত থেকে।
মশায় স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন—রোগীর দিকে লক্ষ্য রেখে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আলস্যের ভারে চোখের পাতা দুটি ভেঙে পড়ল বিপিনের। হাতখানি স্পর্শ করলেন মশায়। বিপিন আয়ত চোখ দুটি মেলে দেখে আবার চোখ বুজলে। বিপিনের নাড়িতে স্তিমিত উত্তেজনা অনুভব করতে পারছেন মশায়। দীর্ঘক্ষণ নাড়ি পরীক্ষা করে তিনি বেরিয়ে এলেন।
–জীবন! পিছন থেকে মৃদুস্বরে ডাকলেন রতনবাবু!
চিন্তিত হবার কারণ নাই রতন। অনিষ্ট কিছু ঘটে নি। কিন্তু সাবধান হতে হবে। এ রকম উত্তেজনা ভাল নয়, সে তো তোমাদের বলতে হবে না।
–সচরাচর এ রকম উত্তেজিত বিপিন হয় না। আজ হল। কিন্তু আমি যা জানতে চাইছি। তোমাদের বংশে নিদান দেবার মত নাড়িজ্ঞানের কথা আমি জানি বিশ্বাস করি। আমি তাই জানতে চাচ্ছি।
হেসে মশায় বললেন–সে নাড়ি দেখার আমল চলে গিয়েছে রতন। এ আমল এ কাল আলাদা। আজ কত ওষুধ কত চিকিৎসা আবিষ্কার হয়েছে। এখন কি আর সে আমলের বিদ্যেতে চলে? ধর ম্যালেরিয়ার জ্বর, আমার বিদ্যেতে ন দিনে জ্বর ছাড়বে, কিন্তু এখন ইনজেকশন বেরিয়েছে, প্যালুদ্রিন এসেছে, তিন দিনে জ্বর ছেড়ে যাচ্ছে। টাইফয়েড দেখে আমরা বলব আঠার দিন, একুশ দিন, আটাশ দিন, বত্রিশ দিন, আটচল্লিশ দিন। অথচ নতুন ওষুধে দশ-বার দিনে জ্বর ছেড়ে যাবে। আজ নাড়ি দেখে আমি কী বলব? আজ তো ডাক্তারেরা আসছেন, দেখবেন, তাদের জিজ্ঞেস কোরো।
–আপনি বলছেন না, আপনি লুকোচ্ছেন। কিন্তু নিজের ছেলের বেলায় তো লুকোন নি। নারীকন্ঠে এই কথাগুলি শুনে চমকে উঠলেন মশায়। ফিরে পিছনের দিকে তাকালেন। পিছনে দাঁড়িয়ে বিপিনের স্ত্রী। কপালে সিঁদুর-বিন্দু, সিঁথিতে সিঁদুরের দীর্ঘ রেখা। উৎকণ্ঠিত মুখে স্থির দৃষ্টিতে প্রশ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
স্মৃতি যেন তাকে চাবুক দিয়ে নির্মম আঘাত করলে। নিজেকে প্রাণপণে সংযত করে তিনি বললেন– সত্যি বলছি মা, আমি ঠিক কিছু বুঝতে পারছি না। তোমার বাড়ি এলেই আমার নিজের ছেলেকে মনে পড়ে। চঞ্চল হয়ে পড়ি। বুঝতে ঠিক পারি না। এর মধ্যে কোনো কোনো অৰ্থ নাই। আমাকে তোমরা ভুল বুঝে না।
জীবনমশায় হনহন করে বেরিয়ে এলেন।
–ডাক্তারবাবু, ফি-টা; ডাক্তারবাবু।
–কাল। কাল দিয়ে। কাল।
* * *
মর্মান্তিক স্মৃতি একেবারে মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনে হচ্ছে—ঠিক যেন সেই! প্রভেদ আছে। সে ছিল তরুণী যোল-সতের বছরের নিতান্তই গ্রাম্য মেয়ে। ঠিক এমনি দৃষ্টি নিয়েই প্রথম তার দিকে তাকিয়েছিল শশাঙ্কের স্ত্রী।
