জীবনমশায় বলতেন আজ্ঞে কর্তাবাবু, ওসব যদি এ জন্মেই গায়ে দিয়ে শেষ করে শখ। মিটিয়ে যাব তবে আসছে জন্মে এসে শখ মেটাব কিসে?
কর্তাবাবু হা-হা করে হেসে বলতেন—কোট-প্যান্ট পরবে মশায়, বিলেত-ফেরত সাহেব ডাক্তার হবে।
জীবনমশায়ও হটতেন না, বলতেন—সে ডবল প্রমোশন হবে, কর্তাবাবু, সামলাতে পারব। না। শেষে বলতেনকর্তাবাবু আপনার কথা আলাদা। আপনার যুক্তি কর্মযোগে। বাড়িতে কাশী প্রতিষ্ঠা করেছেন, বৃন্দাবন তৈরি করেছেন—ভগবানকে বেঁধেছেন, স্কুল দিয়েছেন, চিকিৎসালয় দিয়েছেন, মুক্তি আপনার করতলগত। আমরা সাধারণ মানুষ, ভক্তিটক্তি করে ত্ৰাণ পাব। ওসব
জামাকাপড়-পোশাকের গরমে ভক্তি উপে যায়, থাকে না। ওসব আমাদের নয়।
কর্তাবাবু কিন্তু এতেও মানেন নি। তার সেবার কলকাতার কাকড়া খেয়ে খেয়ে হয়েছিল আমাশয়, সেই আমাশয় মশায় ভাল করেছিলেন। তখন শীতকাল। ভাল হয়ে উঠে ব্রজলালবাবু দরজি পাঠিয়ে মশায়ের গায়ের মাপ নিয়ে কলকাতা থেকে দামি চায়না কোট তৈরি করে এনে তাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ব্রজলালবাবুর বাড়িতে অসুখ একটু বেশি হলেই তার ডাক পড়ত। সাধারণত দেখত তাঁর চ্যারিটেবল ডিসপেনসারির ডাক্তার। তাঁর ডিসপেনসারির ডাক্তারকে তিনি বাড়িতে না ডাকলে অন্য লোকে ডাকবে কেন?
ব্রজলালবাবুর নাতি—তার দৌহিত্রের অসুখ। একজ্বরী জ্বর। কলকাতা থেকে মাতামহের বাড়ি এসে জ্বরে পড়েছে। ডিসপেনসারিতে এসেছে তখন একজন তরুণ ডাক্তার। হরিশ প্রায় বছর আষ্টেক আগে চলে গেছে। তারপর দুজন এসেছে, দুজনই পার না হওয়ায় চলে গেছে। তারপর এই তরুণটি, চক্রধারী। যে চক্রধারী এখন চিকিৎসা ছেড়ে প্রায় সন্ন্যাসী। চক্রধারী তার ছেলে বনবিহারীর বন্ধু। চক্রধারীই দেখছিল, পাঁচ দিনেও জ্বরের বৃদ্ধিমুখ কম না পড়ায় তাকে ডেকেছিলেন ব্রজলালবাবু। অবশ্য উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ ঘটে নি তখন। তবু ধনী মানুষ, দৌহিত্র এসেছে কলকাতা থেকে তাই তাকে ডেকে একজনের স্থলে দুজন ডাক্তার দেখানো। শীতকালের দিনে জীবনমশায় চায়না কোটটি গায়ে দিয়েই দেখতে গিয়েছিলেন। কর্তাবাবু রসিকতা করেছিলেন—কোট গায়ে দিয়েছ জীবন? ভক্তিকে উপিয়ে দিলে নাকি?
মশায় বলেছিলেন আজ্ঞে, ভক্তিকে এ জন্মের মত শিকেয় তুলে রাখলাম কর্তাবাবু। সে যা হয় আসছে জন্মে হবে। তা ভক্তিই যখন শিকেয় তুললাম তখন কোট গায়ে দিতে দোষ কী বলুন।
ছেলেটির নাড়ি দেখবার আগে তার কানে এসেছিল কয়েকটি মৃদুস্বরের কথা। কলকাতারই কেউ অসন্তুষ্ট হয়ে পাশের ঘরে বলছিল—এসব কী করছেন এঁরা। হাতুড়ে ডেকে হাত দেখানো—এগুলো ভাল নয়!
জীবন মশায়ের পায়ের ডগা থেকে রক্তস্রোত বইতে শুরু করেছিল মাথার দিকে। প্রাণপণে নিজেকে সংযত করে হাত দেখতে বসেছিলেন।
তাঁর বাবা বলেছিলেন-ধ্যানযোগে নাড়ি পরীক্ষা করতে হয়। সেদিন সেই যোগ যেন মুহূর্তে সিদ্ধিযোগে পরিণতি লাভ করেছিল। সেই ধ্যানযোগে তিনি অনুভব করেছিলেন কঠিন সান্নিপাতিক-দোষদুষ্ট নাড়ি!
নাড়ি ছেড়ে উঠে বাইরে এসে হাত ধুয়ে দৃঢ়কণ্ঠে বলেছিলেন ছেলেটির জ্বর সান্নিপাতিক, মানে টাইফয়েড, কর্তাবাবু। এবং
–কী জীবন?
–বেশ শক্ত ধরনের টাইফয়েড। ভাল চিকিৎসা চাই। সদর থেকে কাউকে এনে দেখান।
ওই পাশের ঘরের কথা তাঁর কানে না গেলে হয়ত এমনভাবে তিনি বলতেন না। একটু ঘুরিয়ে বলতেন।
সদরের ডাক্তার এসে দেখে বলেছিলেন যিনি বলেছেন তিনি বোধহয় একটু বাড়িয়ে বলেছেন। টাইফয়েড বটে তবে কঠিন কিছু নয়। সেরে যাবে।
জীবনমশায় তার সামনেই ঘাড় নেড়ে বলেছিলেন-আজ্ঞে না। আমার জ্ঞানে রোগ কঠিন। তবে যদি বলেন আমি হাতুড়ে, সে অন্য কথা।
কিশোর তখন তরুণ। সে বাইরে তাঁর সঙ্গে এসে তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন–কী দেখলেন ডাক্তারবাবু? খুব শক্ত?
মশায় তাকে বলেছিলেন–ব্যাপারটা জটিল বাবা কিশোর। সদরের ডাক্তার বুঝতেই পারছে। না। জিভের দাগ, পেটের ফাপ, দুবার জ্বর ওঠানামা, জ্বরের ডিগ্রি দেখে ও বিচার করছে। আমি নাড়ি দেখেছি। ত্ৰিদোষদুষ্ট নাড়ি। এবং—হুঁ। তুমি বোলোনা কিশোর, এ রোগ আর ব্ৰহ্মা-বিষ্ণুর হাতে নাই! এক শিব—যিনি নাকি মৃত্যুর অধীশ্বর, তিনি যদি রাখেন তো সে আলাদা কথা।
দশ দিনের পর থেকে রোগ হঠাৎ কঠিন হয়ে উঠল। শহরের ডাক্তার আবার এসে বললেন–হ্যাঁ, দ্বিতীয় সপ্তাহে এ রোগ বাড়ে। তাই বেড়েছে। তা হোক, ওষুধ দিয়ে যাচ্ছি আমি। কমে যাবে এতেই।
তের দিনের দিন রোগ হয়ে উঠল কঠিনতর।
কিশোরকে মশায় বললেন–বিকার আসছে কিশোর। আঠার দিন অথবা একুশ দিনে ছেলেটি মারা যাবে। মনে হচ্ছে তার আগে সান্নিপাত দোষে একটি অঙ্গ পঙ্গু হয়ে যাবে। কিশোর, আমি দেখতে পাচ্ছি। সান্নিপাতিক জ্বর এমন পূর্ণমাত্রায় আমি আর দেখি নি বাবা।
চোদ্দ দিনের দিন ছেলে অজ্ঞান হয়ে গেল। মেনিনজাইটিস যোগ দিলে। কলকাতায় লোক গেল, বড় ডাক্তার চাই। যা লাগে।
জীবনমশায় বললেন–তা হলে অবিলম্বে কর্তাবাবু। আজই। নইলে আক্ষেপ করতে হবে। রোগ বড় কঠিন কর্তাবাবু।
সে মুহূর্তেই চোখ পড়েছিল কলকাতার সেই আত্মীয়টির দিকে। একটু হেসে বলেছিলেন আমার অবিশ্যি হাত দেখে মনে হচ্ছে রোগ অত্যন্ত কঠিন।
কলকাতা থেকে বড় ডাক্তার এসেছিলেন, এম. ডি; অল্প বয়স হলেও বিচক্ষণ চিকিৎসক। জাতিতে বৈদ্য; নাড়ি দেখার অধিকার রাখেন; ধীর স্থির মিষ্টভাষী। ডাক্তার সেনগুপ্ত সত্যকারের চিকিৎসক।
