—এ কী, আর গেল কোথায়?
–একটা মাছ বেড়ালে খেয়ে গেল।
–তা হলেও তো পনেরটা থাকে।
–খপ করে গর্ত থেকে একটা ইঁদুর বেরিয়ে একটা নিয়ে গেল।
–দুটো গেল। বাকি থাকে চোদ্দটা।
–ভূতে নিয়েছে দুটো। ওই শেওড়া গাছের ভূত মাছের গন্ধে জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে—
–তাই গেল, তবু থাকে বারটা।
–ভয়ে নড়ে বসতে গিয়ে হাতের ধাক্কায় দুটো পড়ল আগুনে।
সেতাব হাসেন আর বলেন—বুঝলি, এইভাবে জোলার বউ হিসেব দিলে পনেরটা কই মাছের। সেগুলি উনোনশালে রান্না করতে করতে গুবগুব করে তিনি ভক্ষণ করেছেন। তারপর পনেরটা মাছের যথাবিহিত হিসেব দিয়ে তিনি চেপে বসে বললেন–
আমি যাই ভালমানুষের ঝি–
তাই এত হিসেব দি।
তুই যদি ভালমানুষের পো—
তবে ন্যাজাটা মুড়োটা খেয়ে মাঝখানটা থো।
বলে পরম কৌতুকে সেতাব হা-হা করে আসেন।
* * *
বাইরে থেকে কে ডাকলে—মশায়? কই? কোথায়?
মশায় একটু চকিতভাবেই ঘাড় ফিরিয়ে তাকালেন; কিশোরের গলা। কিশোর কলকাতায় গিয়েছিল; ফিরেছে তা হলে। বোধহয় কিছু নিয়ে এসেছে। সে কলকাতায় গেলেই তার জন্য কিছু না কিছু আনে। একা তার জন্য নয়, অনেকের জন্য। আবালবৃদ্ধবনিতারই প্রিয়জন কিশোর। ছেলেদের জন্য পেন্সিল, বই; মেয়েদের জন্য সেলুয়ের সরঞ্জাম; দুঃস্থ মধ্যবিত্ত ছেলেদের জন্য জামা, প্যান্ট নিয়ে আসে। তাকে চার-পাঁচবার ফাউন্টেন পেন এনে দিয়েছে, প্রেসক্রিপশন লিখতে। সব হারিয়েছে। মধ্যে মধ্যে জুতো এনে দেয়। যেবার ওসব কিছু আনে না সেবার অন্তত কিছু ফল। কিশোর চিরদিন নবীন কিশোর দুলাল হয়েই রইল। তিনি সাড়া। দিলেন–কিশোর!
—কোথায়? বেরিয়ে আসুন; অনেক লোক আমার সঙ্গে।
মশায় বেরিয়ে এলেন, কিশোর কোন দায় এনে ফেললে কে জানে? কোনো গ্রামে মহামারীর। দায়, কোনোখানে হাঙ্গামার দায়—সব দায়েই মাথা পাতা ওর স্বভাব।
বেরিয়ে এসে মশায় বিস্মিত হয়ে গেলেন, কিছু বুঝতে পারলেন না তিনি। এ যে সম্ৰান্ত নাগরিকের দল। কোট-প্যান্ট-পরা, মার্জিতকান্তি, শিক্ষা-ও বুদ্ধিদীপ্ত-দৃষ্টি বিশিষ্ট ব্যক্তি সব। থানার দারোগা সঙ্গে; আরও কজন এখানকার সরকারি কর্মচারীও রয়েছে; প্রদ্যোত ডাক্তারও রয়েছে; নবগ্রামের ধনী ব্রজলালবাবুর উত্তরাধিকারীরা এখন সদর শহরে বাস করে, ব্রজলালবাবুর বড় নাতিও রয়েছে। ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট রয়েছে। তারা এখানে? তার দরজায়?
তবে কি প্রদ্যোত ডাক্তার সেই দরখাস্ত করেছে? হৃদয়হীন মূৰ্খ হাতুড়ে নিদান হেঁকে রোগগ্ৰস্তকে অকালে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়। মহান্তকে তিনি কয়েক দিন—অন্তত কয়েক ঘণ্টা আগেও মৃত্যুমুখে ঠেলে দিয়েছেন।
রগের শিরা দুটো তাঁর দাঁড়িয়ে উঠল। তিনি কিছু বলবার আগেই কিশোর ভদ্রলোকদের লক্ষ্য করে বললে–ইনিই আমাদের মশায়। তিন পুরুষ ধরে এখানকার আতুরের মিত্র। আতুরস্য ভিষমিত্রং। এই ভাঙা আরোগ্য-নিকেতনই একশো বছরের কাছাকাছি আমাদের হেলথ সেন্টার ছিল।
দলের বিশিষ্ট ব্যক্তিগুলির মুখে স্মিত হাস্যরেখা দেখা দিল। তার কতকটা যে কৃত্রিম তাতে সন্দেহ ছিল না। তারা নমস্কার করলেন মশায়কে। তিনিও প্রতিনমস্কার করলেন।
কিশোর তার হয়ে ওকালতি করছে। এককালে কত করেছেন—সেই কথা বলে একালের অপরাধ মার্জনা করতে বলছে। প্রদ্যোত গম্ভীরমুখে মাটির দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর একজন কোট-প্যান্ট-পরা তরুণ মৃদুস্বরে তাকে কী বলছে। হরেনও রয়েছে একপাশে।
কিশোর বললে—আর এঁরা হলেন আমাদের নতুন পশ্চিম বাঙলা গড়বার কর্তাব্যক্তি সব। বিশ্বকৰ্মার দল। কমিউনিটি প্রজেক্টের কথা শুনেছেন তো? একশোখানা গ্রাম নিয়ে নতুন আমলের দেশ তৈরি হবে। এখানেও আমাদের একটা প্রজেক্ট হচ্ছে। নবগ্রাম হবে সেন্টার। নতুন রাস্তা ঘাট, স্কুল-হাসপাতাল-ইলেকট্রিক অনেক ব্যাপার। সেই জন্যে এ অঞ্চল দেখতে এসেছেন। পথে আপনার আরোগ্য-নিকেতনের সাইনবোর্ড দেখে জিজ্ঞাসা করলেন। তাই বললাম আরোগ্য-নিকেতন ভেঙেছে, কিন্তু তার প্রাণ এখনও আছে, মশায় এখনও আছেন। তাকে না। দেখলে এখানকার প্রাণের কী দাম কী শক্তি তা বুঝতে পারবেন না।
অকস্মাৎ মশায়ের মনে হল—শুষ্ক সমুদ্রের বালুরাশির মত তাঁর অন্তরে কোনো গভীর অন্তরতল থেকে উথলে বেরিয়ে আসছে উচ্ছ্বসিত লবণাক্ত জলরাশি। ঠোঁট দুটি তার থরথর করে কেঁপে উঠতে চাইছে। কঠিন দৃঢ়তার সঙ্গে চোয়ালে চোয়ালে চেপে নিৰ্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি।
কিশোর বললে—আপনার নাড়িজ্ঞানের কথা বলছিলাম। সেই ডাঃ সেনগুপ্ত এসেছিলেন। কলকাতা থেকে ব্রজলালবাবুর নাতিকে দেখতে। মশায় পাঁচ দিনের দিন প্রথম রোগী দেখেছিলেন। রোগী দেখে বেরিয়ে এলেন। আমিও এলাম; আমিও ছিলাম সেখানে। তখন আমি আমাদের সেবাসঙ্গের সেক্রেটারি; আমি নার্সিং করছিলাম। মশায়ের সঙ্গে বেরিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলাম–
* * *
সে অনেক দিনের কথা। অনেক দিন।
টাইফয়েডের ওষুধ হিসেবে ফাজ তখন এদেশে সবে ব্যবহার আরম্ভ হয়েছে।
ব্রজলালবাবুর নাতির অসুখেই মশায় এই ফাজের ব্যবহার দেখেছিলেন। কলকাতার বিখ্যাত ডাক্তার সেনগুপ্ত এসে ব্যবহার করেছিলেন ফাজ। মহাশয় মহাপ্রাণ ধার্মিক লোক এই ডাক্তারটি।
জীবনমশায় তখন এ অঞ্চলের ধন্বন্তরি। ব্রজলালবাবু লক্ষপতি মানুষ, কীর্তিমান মহাপুরুষ, উইলিয়মস চ্যারিটেবল ডিসপেনসারির প্রতিষ্ঠাতা। তিনিও তাঁকে স্নেহ করতেন—শুধু স্নেহই নয় তার সঙ্গে সম্ভ্রমও। তিনি মশায়কে আধুনিক সাজে সাজিয়েছিলেন। দেখা হলেই হেসে বলতেনজীবন, এত বড় চিকিৎসক তুমি-তুমি ভাল পোশাক কর। জান, একবার কলকাতায় থিয়েটার দেখলাম। তাতে এক হালফ্যাশানের বাড়িতে এক বড় ডাক্তার দেখতে এল রোগী। তা সে রোগী বলেওর পায়ে মোজা নেই, ও কেমন ডাক্তার? চার টাকা ফি ওকে কক্ষনো দিতে পাবে না। পালাটি চমৎকার। তা কথাটিও সত্যি হে, ভেক চাই।
