তিনি রোগের বিবরণ শুনে ফাজ নিয়ে এসেছিলেন। ফাজ সেই প্রথম ব্যবহার হল এ অঞ্চলে।
জীবন মশায়ের সঙ্গে তিনি পরামর্শ করেছিলেন। নাড়ি দেখে অনুমানের কথা শুনে বলেছিলেন আপনার অনুমানই বোধহয় ঠিক। তবু আমাকে চেষ্টা করতে হবে। শেষ পর্যন্ত দেখতে হবে। কৰ্তব্য করে যেতে হবে। কী করব?
আঠার দিনের দিনই ব্রজলালবাবুর দৌহিত্র মারা গিয়েছিল। আঠার দিনের সকালবেলা বাম অঙ্গ পড়ে গিয়েছিল, বা চোখটি পর্যন্ত নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
চারদিকে জীবন মশায়ের নাড়িজ্ঞানের খ্যাতি রটে গিয়েছিল এরপর।
কিশোর বলে চলেছিল—সেকালের জীবন মশায়ের কথা।
শুধু খ্যাতিই নয়—একটা দৃষ্টিও তার খুলে গিয়েছিল এরপর থেকে। তিনি বুঝতে পারতেন। সে আসছে কি না আসছে, নাড়ি ধরলে অনুভব করতে পারতেন অনায়াসে। এবং সে কথা ক্ষেত্রবিশেষে অর্থাৎ রোগী প্রবীণ হলে স্পষ্টই বলতেন; মণি চাটুজ্জের মায়ের বেলা বলেছিলেন বাবাজী, এবার বুঝি মাথা কামাতে হয় গো!
মণি চাটুজ্জের চুলের শখ ছিল অসাধারণ।
রাম মিত্তিরকে তার বাপের অসুখে প্রথম দিন দেখেই বলেছিলেন রাম, বাবার কাছে যা জানবার শুনবার জেনেশুনে নিয়ো। উনি বোধহয় এ যাত্রা আর উঠবেন না।
রোগী অল্পবয়সী হলে ইঙ্গিতে বলতেন—তাই তো হে, রোগটি বাঁকা ধরনের, তুমি বরং ভাল ডাক্তার এনে দেখাও।
কাউকে অন্যভাবে জানাতেন।
এরই মধ্যে একদিন সুরেনের ছেলে শশাঙ্কের বড় ভাই এসে বললে—মশায়কাকা, একবার শশাঙ্ককে দেখে আসবেন।
–কী হয়েছে শশাঙ্কের?
–জ্বর হয়েছে আজ দিন চারেক।
–আচ্ছা যাব। কাল সকালে যাব বাবা। আজ বনু এল কলকাতা থেকে। বাঁশি, বায়াতবলা এনেছে; গান-বাজনা হবে। একটু খাওয়াদাওয়াও হবে। আসিস বাবা তুই। আমি কাল। সকালেই যাব।
বনবিহারীর বন্ধু শশাঙ্ক। বছরখানেকের ছোট। জমিদারি সেরেস্তার হিসাবনবিস তাঁর সেই বাল্যবন্ধু সুরেনের ছোট ছেলে। বাল্যকালেই মাতৃবিয়োগ হয়েছিল। সুরেন বেঁচে থাকতেই তার বিয়ে দিয়ে সংসারী করে দিয়ে গেছে। ভাল ছেলে, মিষ্টভাষী ছেলে শশাঙ্ক। কী হল ছেলেটার?
***
পরের দিন সকালেই গিয়েছিলেন শশাঙ্ককে দেখতে।
সুরেনের গৃহিণীহীন সংসারে বধূরাই আপন আপন স্বামী নিয়ে স্বাধীনা। তরুণী বধূটিই শশাঙ্কের শিয়রে বসে ছিল। সম্ভবত শশাঙ্কের জ্বরোত্তপ্ত কপালে নিজের মুখখানি রেখেই শুয়ে ছিল। মশায়ের জুতার শব্দে উঠে বসেছে।
শশাঙ্কের কপালে সিঁদুরের ছাপ লেগে রয়েছে। একটু হাসলেন ডাক্তার। মেয়েটি ছেলেটি দুজনেই তাঁর স্নেহাস্পদ। বধূটিও তার জানাশোনা ঘরের মেয়ে, বাল্যকাল থেকেই দেখে। এসেছেন। স্নেহের বশেই মশায় মেয়েটির দিকে চাইলেন। চোখ তার জুড়িয়ে গেল। লালপাড়শাড়ি-পরা ওই গৌরতনু বধূটির নতুন রূপ তার চোখে পড়ল। একটি অপরূপ ছবি দেখলেন যেন। তাকে দেখে মেয়েটির মুখখানি রাঙা হয়ে উঠল। মাথায় ঘোমটা টেনে সে সরে বসল। মনে হল মেয়েটির এই বন্ধুরূপেই তার সকল রূপের চরম প্রকাশ।
ডাক্তার বসে শশাঙ্কের হাত ধরলেন। তাঁর নিজের হাত কেঁপে উঠল, চোখ দুটি চকিতে যেন খুলে গেল, একবার বধূটির দিকে তাকালেন। আবার চোখ বুজলেন। এ কী? আজ তৃতীয় দিন। এরই মধ্যে এত স্পষ্ট লক্ষণ! আবার দেখলেন। না, ভ্রান্তি তো নয়! ভ্ৰান্তি নয়। এই বধূটির এমন অপরূপ রূপ মুছে দিয়ে শশাঙ্ককে যেতে হবে? দু সপ্তাহ?
হ্যাঁ তাই! ভ্ৰান্তি নয়, তিনি বিমূঢ় নন, অন্যমনস্ক তিনি হন নাই। শশাঙ্ককে যেতে হবে। এমন স্পষ্ট মৃত্যুলক্ষণ তিনি কদাচিৎ প্রত্যক্ষ করেছেন নাড়িতে। শেষ রাত্রের পাণ্ডুর আকাশের দক্ষিণ-পূর্ব কোণাংশে অগ্নিকোণে শুক্রাচার্যের প্রদীপ্ত স্পন্দিত উদয় যেমন রাত্রি-শেষ ঘোষণা করে—এমনকি দণ্ড পলে উদয়কালের বিলম্বটুকু পর্যন্ত পরিমাপ করে দেয়, তেমনিভাবে ঠিক তেমনিভাবে-নাড়ি-লক্ষণ বলছে দু সপ্তাহ! চোদ্দ দিন।
মনে আর অশান্তির সীমা ছিল না। বেদনার আর অন্ত ছিল না। শশাঙ্ক বনবিহারীর বয়সী, কিছু ছোট। মাতৃহীন ছেলেটা তাঁর ডাক্তারখানার সামনে খেলে বেড়াত। তার চোখের সামনে বড় হল। আর এই বধূটি? লালপাড় শাড়িতে শাখায় রুলিতে, সিথিতে সিঁদুরের রেখায় সুন্দর ছোট কপালখানির মাঝখানে সিঁদুরের টিপে লক্ষ্মী ঠাকরুনের মত এই মেয়েটি?
এই সমস্ত শোভার সবকিছু মুছে যাবে? থান কাপড়, নিরাভরণা মূর্তিকল্পনা করতে পারেন নি জীবনমশায়। মনে পড়েছে মেয়েটির বাল্যকালের কথা। পাশের গায়ের মেয়ে। এ অঞ্চলে জাগ্ৰত কালী ঠাকুরের সেবায়েতের মেয়ে। বড় সমাদরের কন্যা। মেয়েটিকে ছেলেবয়সে বাপমায়ে বলত—বিল্লী। পুষি।
ওই আদর-কাঙালিপনার জন্য আর আমিষে রুচির জন্য। একখানি ড়ুরে কাপড় পরে কালীস্থানের যাত্রীদের কাছে সিঁদুরের টিপ দিয়ে বেড়াত আর পয়সা আদায় করে পেঁয়াজবড়া কিনে খেত। অন্তরটা বেদনায় টনটন করে উঠল।
দুদিন পর শশাঙ্কের নাড়ি দেখে তিনি একেবারে আর্ত হয়ে উঠলেন। স্থির জেনেছেন–শশাঙ্ককে যেতে হবে। নাড়িতে যেন পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন, সে আসছে। ওষুধ ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে।
সেই আৰ্ত মানসিকতার আবেগে একটা কল্পনা করে আতর-বউকে ডেকে বললেন–দেখ, কাল রাত্রে আমি স্বপ্ন দেখেছি—মা-কালীকে ভোগ দিচ্ছি, মা যেন সেই ভোগ নিজে হাত পেতে নিচ্ছেন। আর আশ্চর্য কী জান? কালী-মা যেন আমাদের শশাঙ্কের বউ।
আতর-বউ বলেছিলেন—তা আর আশ্চর্য কী; শশাঙ্কের বউ কালীমায়ের দেবাংশীর মেয়ে। হয়ত–।
