খুব পারবেন!।
ডাক্তারেরা বলছে বিপিন ভাল আছে। হিকা তার আর হয় নাই। সেখানেও নিত্য যেতে হয়। তিনি নাড়ি না দেখলে রতনবাবুর তৃপ্তি হয় না। প্রদ্যোত ডাক্তারও আসে। সে আসে তার পরে। কোনো কোনো দিন দেখা হয়ে যায়। দু-একটা কথাও হয়। সে শুধু নমস্কার-বিনিময় মাত্র। তিনি হাত দেখেই চলে আসেন। বলে আসেন ভালই আছে। এর বেশি কিছু না। মনের মধ্যে সেই কথাগুলিই ঘুরে বেড়ায়, মহান্তের তিরোধানের দিনে যে কথাগুলি তিনি হরেনকে বলেছিলেন।
হুঁকোটা হাতে ধরেই সেতাব চাল ভাবছিল।
মশায় বললেন–ও বাবা, ন হরি ব্ৰহ্মা ন চ শঙ্কর। ওর নিদান হেঁকে দিয়েছি মানিক। তিন চাল। তিন চালেই তোমার মন্ত্ৰী অকস্মাৎ গজের মুখে পড়ে কাত।
মশায় সেতাবের মন্ত্রীকে নিজের গজের মুখে চাপা দি য় রেখেছেন। এদিকে কিস্তি দিয়েছেন। সেতাব ভাবছে।
মশায় সেতাবের হুঁকো থেকে কল্কেটা ছাড়িয়ে নিয়ে টানতে শুরু করলেন। তামাকটা কেন পোড়ে মিছিমিছি! সেতাব বল ফেলে দিয়ে কল্কের দিকে হাত বাড়িয়ে বললে–দে! তোর পড়তা ভাল আজ।
মিথ্যে বলে নি সেতাব! মশায় আজ পর পর দু বাজি জিতলেন। সেতাব কঠিন খেলোয়াড়। ওর সঙ্গে জেতা কঠিন। প্রায়ই চটে যায় বাজি। একশো বাজির দ্বুই বাজি চটে যায়—দশ বাজিতে হারজিত হয়! সে-ও সমান সমান।
কঠিন রোগী থাকলে মশায় অনেক সময় খেলতে বসবার আগে সেকালের জুয়ার বাজির মত ভাবেন-আজ যদি সেতাব হারে তবে রোগকে হারতে হবে; সেরে উঠবে রোগী। সঙ্গে সঙ্গেই হাসেন। নাড়ি দেখার অনুভূতি মনে পড়ে যায়। ও মিথ্যা হয় না। হবার নয়। রোগের কথাই মাথায় ঘুরতে থাকে। যন্ত্রচালিতের মত খেলে যান, সেতাব একসময় বলে ওঠে-মাত।
সেতাব তামাক খেয়ে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে কথাটার পুনরাবৃত্তি করলে—তোর পড়তা ভাল, সত্যিই ভাল জীবন। রামহরিকে তুই যা বাঁচালি! খুব বাঁচিয়েছিস!
জীবনমশায় বললেন– পরমায়ু পরম ঔষধ সেতাব। রামহরির আয়ু ছিল। সারাটা জীবন কুস্তিকসরত করেছে—সেও এক ধরনের যোগ। সাধারণ মানুষের সঙ্গে এদের তফাত আছে। ওর সহ্যশক্তি কত! সেইটেই বিচার করেছিলাম আমি। শক্তিই হল আয়ুর বড় কথা। রোগের সঙ্গে যুদ্ধ করে কি ওষুধ? করে জীবনীশক্তি, আয়ু।
সেতাব হেসে বললো, তা হলেও হাতশটা তো তোমার বটে। সে তোমার চিরকাল আছে। নতুন ছক সাজাতে লাগল সেতাব। সাজাতে সাজাতে বললে—শশীর কথা শুনেছিল?
শুনেছেন, তাও শুনেছেন।
ঘুটি সাজাতে সাজাতেই ডাক্তার হাসলেন। পরমুহূর্তেই তার কপালের দুপাশে রগের শিরা দুটো মোটা হয়ে ফুলে উঠল। ক্ষোভে থমথমে হয়ে উঠল স্থবির মুখখানা।
সেই প্রথম দিনই শশী রামহরির ওখান থেকে একরকম পালিয়ে এসে মদ্যপান করে সারা নবগ্রামের প্রতি ডাক্তারখানায় চিৎকার করে বেড়িয়েছে আমি তো তবু কম্পাউন্ডার। বর্ধমানে রীতিমত পাস করে এসেছি। ওটা যে হাতুড়ে! পুঁজি তোে রঙলাল ডাক্তারের খানকতক প্রেসক্রিপশন আর বাপ-পিতামহের মুষ্টিযোগের খাতা! আর নাড়ি ধরে চোখ উলটে-খানিকক্ষণ আঙুল তুলে টিপে তারপর বায়ু পিত্ত ক! মনে হচ্ছে দশ দিন। না হয় ঘাড় নেড়ে তাই তো, এই বলা। রামহরিকে বাঁচাবে! কই বাঁচাক দেখি! তাও তো গ্লুকোজ ইনজেকশন দিতে হরেন ডাক্তারকে ডাকতে হয়েছে! আসল কথা রামহরির টাকা—বিষয়! সব, সব বুঝি বাবা, সব বুঝি। রামহরি তো হরে হরে করবে, এখন বাঁচবে বাঁচবে রব তুলে ইনজেকশন, ওষুধ, ফি, গাড়ি-ভাড়া, হেনো তেনো গোলযোগ বাঁধিয়ে পঞ্চাশ একশো দেড়শো যা মেলে—তাই বুড়োর লাভ। এ আর কে না বুঝবে! আমার নামে তো যা তা বলেছে; কিন্তু গোসাইকেচণ্ডীতলার গোঁসাইকে কে মারলে? উনি নন? আগের দিন রাত্রে এক ডোজ ওষুধে ঘুম পাড়িয়ে দিলাম। সকালে ভাল রইল। উনি গিয়ে ফুসমন্তর দিয়ে এলেন—সন্ধেতে যাবেন। ওষুধবিষুধ আর খাবেন। না। সারাদিন ওষুধ না পড়ে বিকেলে আবার দাস্ত হল। হবেই তো। ব্যস, নিদান সার্থক হয়ে গেল।
প্রদ্যোত ডাক্তারও তাই বলে।
বলে—সন্ন্যাসী মরেছে, তার জন্যে কারই বা মাথাব্যথা! কিন্তু ওই লোকটির জীবনের মূল্যে জীবনমশায় নিজেকে নাড়িজ্ঞানে অভ্রান্ত বলে প্রমাণ করেছেন। কিন্তু আমি বলব উনি তো ওকে মেরেছেন। ইয়েস, ইন দি টু সেন্স অব দি টার্ম। ওষুধ দিলে এবং ওইভাবে ঘর থেকে টেনে বের না করলে সন্ন্যাসী আরও দু-এক দিন অন্তত আরও ঘণ্টাকয়েক বাঁচত—এ সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নাই। এ তো নিজের নিদান সত্য করবার জন্য টেনেহেঁচড়ে, খোল করলে রোগীকে চমকে দিয়ে উত্তেজিত করে মেরে ফেলেছে।
কথাগুলি মনে পড়লেই রগের শিরা দপদপ করে ওঠে।
কথাটা উঠতেই এমন মগ্ন হয়ে গিয়েছিলেন জীবনমশায় যে, এ দানটায় হেরেই গেলেন তিনি। খপ করে দাবাটাই মেরে বসল সেতাব! বললে—এইবার!
তাই বটে। এইবারই বটে। বাঁকা পায়ে আড়াইপদ আড়ালে অবস্থিত একটা ঘোড়ার জোরে একটা বড়ের অগ্রগমন সম্ভাবনা তিনি লক্ষ্য করেন নি।
সেতাব হেসে বললে—দেখবি নাকি?
ছকের উপর দৃষ্টি বুলিয়ে মশায় বললেন–না। সবটাই এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। তুই ও কথা তুলে মনটা চঞ্চল করে দিলি। নন্দ রে, তামাক দে তো বাবা!
—আর একবার চা করতে বল। খেয়ে উঠি। দেরি হলে সে বুড়ি আবার পঞ্চ-উপচার সাজিয়ে বসবে।
অর্থাৎ রাত্রের খাওয়ার ব্যবস্থা শুরু করবে। গৃহিণীর খাওয়ার আয়োজন সেতাবের পক্ষে প্রায় বিভীষিকা। যাবার পথে তাঁকে দোকান থেকে দালদা কিনে নিয়ে যেতে হয়। যা হোক কিছু রসনাতৃপ্তিকর তৈরি করেন তিনি। সেতাব উপলক্ষ। নিজেই সেতার মধ্যে মধ্যে বলে বুঝলি জীবন, এ সেই ষোল কইয়ের ব্যাপার! সেই যে একজন জোলা ষোলটা কই মাছ কিনে এনে বউকে বলেছিল-ভাল করে রান্না কর, বেশ পেঁয়াজ গরমমসলা দিয়ে খোমাখো করে ঝোল রেখে, লঙ্কাবাটা দিয়ে–যেন জিভে দিলেই পরাটা জুড়িয়ে যায়। বউ রান্না করতে লাগল—জোলা মাকু ঠেলতে বসল ঘরে। একটি করে ছাক শব্দ উঠল আর ভোলা একটি করে দাগ কাটলে মাটিতে। তারপর ছক শেষ হতেই উঠে গিয়ে বলল—দে খেতে। বউ খেতে দিলে কিন্তু একটি কই মাছ।
