রানা ঘাড় নাড়লে।
বার কয়েক ঘাড় নেড়ে বললে–উঁহুঁ। তা হলে আমি ভূদেব কবরেজের কাছে যাই। উ সব কড়া ডাক্তারি ওষুধ আমার ধাতে সইবে না। তা ছাড়া মশায়, ডাক্তারদের কথা বড় চ্যাটাং চ্যাটাং। বুঝেছেন—আমাদিগে যেন মানুষই মনে করে না। আপনি দেখতেন সেকালে—সে পসার তো দেখেছি আমি।—এরা টাকা রোজগার করে অনেক, ফি বেশি। ফি ছাড়ে না। কিন্তু সে পসার নাই। আপনারা রোগীর সঙ্গে আপনার লোকের মত কথা বলতেন। ঘরের লোকের মত। আমার আবার মেজাজ খারাপ। কে জানে ঝগড়া হয়ে যাবে কবে। তার চেয়ে কবরেজি ভাল। লোহাতে মাথা বাঁধিয়ে তো কেউ আসে নাই সংসারে, মরতে তো হবেই। আজ নয় কাল। তা কড়া কথা শুনে-খারাপ কথা শুনে মরি কেন?
রানা উঠে চলে গেল।
–রানা! অ–রানা!
–আজ্ঞে?
–কবিরাজিই যদি করবে বাবা তবে পাকুড়িয়া যাও। সেন মশায়দের বংশ বড় বংশ বড় আটন। বিচক্ষণ বৈদ্য আছেন—ভাল ওষুধ রাখেন—সেখানে যাও। বুঝেছ? এ অবহেলার। রোগ নয়।
–পাকুড়ে যাব বলছেন?
–হ্যঁ তাই যাও। ভূদেব এখনও ছেলেমানুষ! বুঝেছ? ইচ্ছে কর তো ভূদেবকে সঙ্গে নিয়ে যাও।
—দেখি! টাকাতে কুলানো চাই তো! হাসল রানা। আপনার কাছে আসা—সেজন্যেও বটে যে! কম টাকায় চিকিৎসা—এ আর কোথায় হবে?
চলে গেল রানা পাঠক। শক্তিশালী বিপুলদেহ অকুতোভয় রানা বন্যার সঙ্গে ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করে; কিন্তু অসহায় হয়ে পড়েছে আজ। মৃত্যুর কাছে মানুষ নিতান্ত অসহায়।
একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন জীবনমশায়। রানার কথাই ভাবছিলেন। কথাটা মিথ্যা বলে নি রানা। দরিদ্র দেশ, দরিদ্র মানুষ, টাকা পাবে কোথায়? ডাক্তারেরাই বা করবে কী? তারাই বা। খাবে কী? নিজের অবস্থা ভেবেই কথা বলছেন জীবনমশায়। আজ সকাল থেকে চারটি টাকা ফি পেয়েছেন। তাঁর পিতামহ, পিতা, তিনি—এতকাল পর্যন্ত যে সম্পত্তি করেছিলেন তার অনেক। চলে গিয়েছে এই পনের-কুড়ি বছরের মধ্যে। আজ তিনি প্রায় নিঃস্ব। লোকে বলে ভাগ্য। আতর-বউ নিজের কপালে করাঘাত করে। কিন্তু তিনি তো জানেন-দায়ী তিনি নিজে। তা ছাড়া আর কে দায়ী?
সশব্দে একখানা গরুর গাড়ি এসে দাঁড়াল।
–কই, গুরুদেব কই?
নামল শশী। শশীর চোখ লাল। মদ খেয়েছে এই দিনে-দুপুরে। রামহরিকে দেখবার জন্য নিতে এসেছে। রামহরি মৃত্যু-কামনায় জ্ঞানগঙ্গা যাবে। গত রাত্রের কথাগুলি আবার সব মনে হল মশায়ের। রামহরি যাবে মৃত্যুবরণ করতে?
চারটি টাকা নামিয়ে দিলে শশী।
–আমি বলেছি চার টাকা দিয়ে সারলে হবে না রামহরি। জীবন মশাকে শেষ দেখা দেখাবে, আরও লাগবে বাবা। আমাদিকে বরং সেকালে চোলাই মদ খাইয়েছ-পাটা খাইয়েছ, জীবন মশায়কে তো কিছু খাওয়াও নি। খাইয়ে থাকলে বড়জোর লাউ-কুমড়ো। বেটা উইলটুইল করছে। বললে, মশায়কে সাক্ষী করব। পেনামী দোব তখন। নিশ্চয় দোব।
হঠাৎ হাসি থামিয়ে বললে—দাঁতু ঘোষাল বেটা মরত, ও বেটার নিদান অ্যাঁকলেন কেন? বেটা কাঁদছে—প্রদ্যোত ডাক্তার তড়পাচ্ছে।
মশায় সেকথা গ্ৰাহ্য করলেন না। দাঁতু মরবে, এই রোগেই মরবে, প্রবৃত্তিকে এমন প্রবল রিপু হয়ে উঠতে কদাচিৎ দেখা যায়। কোনোমতেই বাঁচাতে পারবে না প্রদ্যোত। বাড়ির দিকে অগ্রসর হলেন তিনি, বললেন– দাঁড়া, গিনি বকছে কেন দেখি। আতর-বউয়ের তীক্ষ তিরস্কার তিনি শুনতে পেয়েছেন।
আতর-বউ তিরস্কার করছেন তাকেই যাকে আজীবন তিরস্কার করে আসছেন নিজের অদৃষ্টকে। হায়রে অদৃষ্ট, হায়রে পোড়াকপাল!
নন্দ ও-পাশে চুপ করে বসে আছে, মাথা হেঁট করে মাটি খুঁটছে। নন্দ জড়িত আছে, তাতে সন্দেহ রইল না তাঁর।
মশায় দুজনের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন–কী হল?
–কিছু না।
নন্দ বললে—দাঁতুকে উব বলবার আপনার কী দরকার ছিল? হাসপাতালের ডাক্তার যাতা বলছে—আমি শুনে এলাম। নিজের কানে।
–নিদান হাকবে তো আমার নিদান হক। দেখ হাত দেখ।
–তোমার নিদান হাত না-দেখেই আমি হাকতে পারি।
–বল, বল—তাই বল, কবে মরব আমি? এ জ্বালা আমি আর সইতে পারছি না। শুধু নাই। শুধু নাই আর নাই। আর তুমি ন্যায়ের অবতার সেজে বসে আছ। রতনবাবুরা চার টাকা ফি দিতে এসেছিল—তুমি দু টাকা নিয়ে দু টাকা ফেরত দিয়ে এসেছ। তুমি যাকে দেখছ তাকেই বলে আসছ—মরবে তুমি মরবে।
জীবনমশায় হা-হা করে হেসে উঠলেন এবার। সে হাসিতে স্তব্ধ হয়ে গেলেন আতর-বউ। জীবনমশায় বললেন–মরবার জন্যেই জন্ম আতর-বউ। সবাই মরবে, সবাই মরবে, কেউ অমর নয়।
ঘোরটা কাটিয়ে আতর-বউ অকস্মাৎ চিৎকার করে উঠলেন—পৃথিবীর কথা আমি জানতে চাই না। আমি কবে মরব তাই বল।
—আমার মৃত্যুর পর।
নিষ্ঠুর বজের মত কঠোর কথা! আতর-বউ নির্বাক বিমূঢ় হয়ে গেলেন।
–আমার মৃত্যু কবে হবে সেইটেই বুঝতে পারছি না। পারলে দিন-তারিখ বলে দিতাম! বনবিহারীর মৃত্যু জানতে পেরেছিলাম। তোমাকে বলেছিলাম, তুমি বিশ্বাস কর নি। এটা বিশ্বাস কোরো।
জীবনমশায় বেরিয়ে এলেন। শশী রাঙা চোখ মেলে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
–চল। শশী!
শশীর যেন এতক্ষণে চেতনা ফিরে এল। বললে–চলুন। হঠাৎ হেসে বললে–ঠিক বলেছেন। মরবে না কে? সবাই মরবে। ওই হাসপাতালের ডাক্তার, ও বেটা কি অমর নাকি?
ডাক্তার বললেন–চুপ কর। ওসব কথা থাক।
হায়রে মানুষ! নানা, হায় কেন? এই তো রামহরি, হাসতে হাসতে মরতে চলেছে।
সত্য সত্যই প্রদ্যোত ডাক্তার কঠিন ক্রোধে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেছে। গণেশ ভট্টাচার্যের মেয়েকে আর-একবার দেখে একটু আশান্বিত হয়েই এসে আপিসে বসেছে ঠিক এমনই মুহূর্তেই দাঁতু এসে হাউ হাউ করে কেঁদে পড়ল।
