প্রদ্যোত ডাক্তারের প্রায় পা চেপে ধরে বললে—ডাক্তারবাবু গো! আমাকে বাঁচান আপনি!
–কী হয়েছে? উঠুন। ভাল করে বলুন। চেঁচাবেন না মেলা।
–ওগো আমাকে বাঁচান গো। আমি আর বাঁচব না।
–কী হয়েছে যে তাই বাঁচবেন না?
–মশায় বললে গো! জীবনমশায়!
–কে? জীবন দত্ত?
–আজ্ঞে হ্যাঁ। বললে এই তোর মৃত্যুরোগ। শিবের বাবা এলেও বাঁচাতে পারবে না।
–জীবন ডাক্তারের সঙ্গে শিবের বাবার আলাপ-পরিচয় আছে তা হলে? না-মাথা খারাপ হয়েছে লোকটার।
–আজ্ঞে? ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল দাঁতু ঘোষাল।
–উঠুন, কী হয়েছে দেখি। চলুন ওই ঘরে, টেবিলের উপর শুয়ে পড়ুন। বলুন কী হয়েছে। সমস্ত শুনে ডাক্তার ভ্রূ কুঞ্চিত করে বললেন–এই সমস্ত লিখে আপনি আমাকে দিতে পারবেন?
–আজ্ঞে হ্যাঁ। হাজার বার। এখুনি লিখে দিতে পারি। বেটা কায়েত—
ডাক্তার ধমক দিয়ে বললও সব কী বলছেন? বেটা কায়েত কী? জানেন আমিও কায়স্থ?
জিভ কেটে দাঁতু বললে–আপনাকে তাই বলতে পারি? আমি বলছি ওই জীবনকে। বেটা হাতুড়েকে। কিন্তু আমি বাঁচব তো? ঝরঝর করে কেঁদে ফেললে দাঁতু।
–কী হয়েছে তাই বাঁচবেন না। ওষুধ খান–নিয়ম করে চলুন–
কম্পাউন্ডার হরিহর পাশের ঘরে ওষুধ তৈরি করছিল। সে বললে–তা দাঁতু পারবে না। রোগ তো ওর ডেকে আনা। খেয়ে খেয়ে করেছে। দুদিন ভাল থাকলেই ব্যস ছুটবে কারুর বাড়ি—আজ তোমাদের বাড়ি দুটো খাব। হাসতে লাগল সে।
ডাক্তার বলল-হাসপাতালে থাকতে হবে আপনাকে। থাকবেন?
—তাই থাকব। দাঁতু বাঁচতে চায়। সে মরতে পারবে না।
–ওকে ভর্তি করে নিন। বলেই ডাক্তার একটা কাগজ টেনে নিল—ম্যাজিস্ট্রেটকে লিখবে এই কথা। এই ধরনের নিদান হেঁকে মানুষের উপর মর্মান্তিক পীড়ন—এ যুগে এটা অসহনীয় ব্যাপার। এর প্রতিকার করা প্রয়োজন।
কিছুক্ষণ পরে আধলেখা দরখাস্তখানা টেনে ছিঁড়ে ফেলে দিলে। থাক।
লোকটিকে যেন একটা বাতিকে পেয়েছে। মৃত্যু ঘোষণা করে আনন্দ পাচ্ছে। আশ্চর্য! মৃত্যু পৃথিবীতে নিশ্চিতই বটে, সে কে না জানে? তাকে জয় করবার জন্য মানুষের চেষ্টার অন্ত নাই। সে সাধনা অব্যাহত চলে আসছে। আবিষ্কারের পর আবিষ্কার হয়ে চলেছে। আজও তাকে রোধ করা যায় নি। আজও সে ধ্রুব—তবু তো মর্মান্তিক, বিয়োগান্ত ব্যাপার। তার মধ্যে যেন একটা আধ্যাত্মিক কিছু আরোপ করে এই মৃত্যুদিন ঘোষণা চমকপ্রদ বটে, রোমান্টিকও বটে কিন্তু নিষ্ঠুর। ঠিক পশুকে বলি দেওয়ার মত। পূজা-অৰ্চনার আড়ম্বরে আধ্যাত্মিকতার ধূম্ৰজালে আচ্ছন্ন। এক কল্পলোক সৃষ্টি করে মৃত্যুকে মুক্তি বলে ঘোষণা করে খাঘাত করার মতই নিষ্ঠুর প্রথা। জীবন দত্ত তারই পুরোহিত সেজে বসে আছে।
হি মাস্ট স্টপ থামতে হবে তাকে। না থামে—থামাতে হবে, হি মাস্ট বি স্টপ্ড্।
এই অৰ্চনা মেয়েটির হাত দেখলেও ও নিদান হেঁকে যেত। ওকে তা না দেখতে দিয়ে ভাল করেছেন তিনি। অদৃষ্টবাদী এই দেশের এই নিদান-হাকিয়েরাই যোগ্য চিকিৎসক ছিল। কবচ মাদুলি জড়িবুটি চরণামৃত কিছু দিতে বাধে না এদের।
লোকটা নিজের ছেলেরও নাকি মৃত্যু ঘোষণা করেছিল এবং করেছিল মায়ের অর্থাৎ নিজের স্ত্রীর সম্মুখে। উঃ, কী নিষ্ঠুর! কল্পনা করা যায় না।
প্রদ্যোত ডাক্তার একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে সিগারেট ধরিয়ে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে নার্সদের অফিসের দিকে গেল। নার্সকে ডাকল—বলল—ওই পেশেন্ট ওই বুড়ো বামুনকে ভর্তি করা হয়েছে। ভাল করে নজর রাখবে। ওর স্ট্রল একজামিনেশন দরকার। আজই করে রাখবে।
তারপর সমস্ত ওয়ার্ডটা ঘুরে বেড়িয়ে এসে দাঁড়াল ফাঁকা মাঠে–নতুন বাড়িটার সামনে। সুন্দর হচ্ছে বাড়িখানা। ডিসেন্ট বিল্ডিং। চারিদিকে চারটে উইং থাকলে আরও সুন্দর হত। হবে, স্কিম আছে। পরে হবে।
নতুন কাল। বিজ্ঞানের যুগ। অদৃষ্ট নিয়তি নির্বাসনের যুগ। ব্যাধিকে জয় করবে মানুষ। মৃত্যুর সঙ্গে সে যুদ্ধ করবে। মৃত্যুর মধ্যে অমৃত খুঁজেছে মানুষ—অসহায় হয়ে। এবার জীবনের মধ্যে অমৃত সন্ধানের কাল এসেছে। একালে অনেক আয়োজন চাই। অনেক কিছুর আয়োজন। সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন—এই লোকগুলির নির্বাসন। এই জীবন মশায়দের। নিদান! নিদান! মৃত্যুর সঙ্গে যেন একটা প্রেম করে বসে আছে এদেশ! গঙ্গার ঘাটে গিয়ে জলে দেহ ড়ুবিয়ে মরাই এখানে জীবনের কাম্য। মতির মায়ের এক্স-রের রিপোর্ট পেয়ে প্রদ্যোত যেন প্রেরণা পেয়েছে। একটা। এক্স-রে রিপোর্ট নিয়ে মতি আজ সকালে বর্ধমান থেকে ফিরে এসেছে। বর্ধমানের হাসপাতালের ডাক্তার প্রদ্যোতের চেয়ে সিনিয়র হলেও তার সঙ্গে প্রদ্যোত ডাক্তারের বেশ একটি সম্প্ৰীতি আছে। সে তাকে লিখেছিল—আমাকে যেন সমস্ত রিপোর্ট অনুগ্রহ করে জানাবেন। কারণ এই কেসটিতে আমি খুবই ইন্টারেস্টেড; এই বুড়িকে মরণ ধ্রুব বলে খোল করতাল সহযোগে নাম সংকীর্তন করে জ্ঞানগঙ্গা পাঠাবার ব্যবস্থা হচ্ছিল এখানকার সে আমলের এক জ্ঞানবৃদ্ধ বৈদ্য মহাপ্রভু নিদান হেঁকেছিল—কয় মাস, কয় দিন, কয় দণ্ড, কয় পলে যেন বৃদ্ধার প্ৰাণ-বিহঙ্গ পিঞ্জর ত্যাগ করবে; এই পায়ের-ব্যথা রোগেই মরবে; সেই কেস আমি জোর করেই হাসপাতালে পাঠাচ্ছি। এখানকার লোকেরা নাকি মনে মনে হাস্য করছে এবং বলাবলি করছে—জীবন দত্ত যখন নাড়ি দেখে বলেছে বুড়ি মরবে তখন ওকে বাঁচায় কে?
এই কারণেই সেখানকার ডাক্তার রিপোর্টের পুরো নকল মতির হাতে পাঠিয়েছেন। সেই রিপোর্ট পড়ে প্রদ্যোতের মুখে ব্যঙ্গহাস্য ফুটে উঠেছিল—তার সঙ্গে বিরক্তিও জমা হয়েছিল। পড়ে গিয়ে বুড়ির একটা পায়ের গাঁঠে আঘাত লেগেছে, খানিকটা হাড়ের কুচি ভেঙে সেখানে থেকে গিয়েছে, সেই হেতুই বৃদ্ধার এই অবস্থা। ওই জায়গাটা কেটে হাড়ের কুচিটাকে বের করে দিতে হবে এবং হাড়ের যদি আর কোনো অংশ বাদ দিতে হয় দিতে হবে, দিলেই বুড়ি সেরে উঠবে। এতে আশঙ্কার কোনো কারণ নাই।
