পরান হেসে লোকটিকে বললে—আর কিছু ভয় তুমি করিয়ো না বেটা। মশায় বলেছেন ভয় নাই। উ একেবারে বেদবাক্যি!
পরান তার মন রাখছে সে জীবনমশায় জানেন কিন্তু এ মন রাখাটুকু তার ভাল লাগে। পরান লোক ভাল। কৃতজ্ঞতা আছে। সেই তার প্রথম জীবনে জীবন দত্ত তাকে টাইফয়েড থেকে বাঁচিয়েছিলেন, তখন পরানের অবস্থা সচ্ছল ছিল না, দিনমজুরি করত। জীবন দত্তের বাড়িতেই মজুরি খেটেছে, তখন তিনি তার বিনা পয়সায় চিকিৎসা করেছিলেন—সে কথা পরান আজও ভুলে যায় নি। সে এখন বড় ডাক্তার ডাকতে পারে। দৈনিক চার টাকা ফি দিতেও তার গায়ে লাগে না, তবু সে জীবন দত্ত ছাড়া কাউকে দেখায় না। শুধু কৃতজ্ঞতাই নয়—জীবনমরণ প্রশ্ন নিয়ে রোগ আসে মানুষের শরীরে, সেখানে কৃতজ্ঞতার ক্ষেত্র খুব বড় নয়, বড় বিশ্বাসের কথা সেই বিশ্বাস আছে পরানের। যে তাকে এত বড় বিশ্বাস করে, তাকে স্নেহ না করে কি পারেন। তিনি? তবে বিবির জন্য পরানের ভাবনায় ডাক্তার কিঞ্চিৎ কৌতুক না করে পারেন না। একবার তিনি নিজেই বলেছিলেন, পরান বিবিকে একবার না হয় কলকাতা নিয়ে যাও। এখন সব নানা রকম পরীক্ষা হয়েছে—পরীক্ষা করিয়ে নিয়ে এস। ডাক্তার কথাটা গুরুত্ব দিয়ে বলেছিলেন। কৌতুক করেন নি।
ডাক্তার বলেছিলেন—তা হলে এক কাজ কর, হাসপাতালের ওই বড় ডাক্তারকে একদিন কল দাও। ওঁকে দেখাও। উনি বলে দেবেনচিঠি দিয়ে দেবেন কোথায় কার কাছে দেখাতে হবে।
প্রদ্যোত ডাক্তার রোগিণীকে দেখে একটু হেসেছিলেন। বলেছিলেন—অসুখ মনের, শরীরের নয়। এবং—হুঁ। একটু থেমে বলেছিলেন—কোনো মনস্তাত্ত্বিক ডাক্তারকে দেখালে ফল হতে পারে।
মশায় কথাটা বুঝেছিলেন, পরান বুঝতে পারে নি; কিন্তু তবু পরান ওই নতুন ডাক্তারের উপর বিরক্ত হয়েছিল। তার বিবি তার চোখের সামনে রোগে ভুগছে—সে তার সেবা করছে, চোখে দেখে স্পৰ্শ দিয়ে সে অসুখ অনুভব করছে—আর ডাক্তার বলছে অসুখ নয়!
সে শুধু প্রদ্যোত ডাক্তারকেই বাতিল করে নি—কলকাতায় যাওয়ার কথাও বাতিল করে দিয়েছিল। শুধু প্রশ্ন করেছিল—আপুনি কী বুঝছেন বলেন যদি, বুঝেন কি পরানের ভয় আছে মিত্যু হতে পারে—তা হলে না হয়
—না, সে ভয় নেই। তবে ভুগতে পারে। বুঝছ না?
–তা ভুগুক। না হয় ভুগবে কিছুদিন। আপুনি ছাড়া কারুর দাওয়াই আমি খাওয়াব না।
সে অবধি এই চলছে। ডাক্তার তিন দিন অন্তর যান। কিন্তু পরানের ইচ্ছা রোজ যান তিনি। ডাক্তার তা যান না। পরান রোজ আসে। খবর বলে যায়, বলে—কিছু বদল করবেন নাকি?
–না—না। ওই যা চলছে—চলুক।
–এই পোস্টাই যদি কিছু দিতেন! আর এই ঘুম হবার ওষুধ! রাতে একবারও চোখ বোজে না, ছটফট করে। এ পাশ আর ও পাশ। আর টুকটুক করে জল খাবে।
একটা কিছু দিলেই পরান খুশি।
আজও পরানের একটা ওষুধ চাই। সে ভয়ার্ত জোয়ানটিকে জীবন মশায়ের অদ্ভুত চিকিৎসা পারঙ্গমতার কথা বোঝাতে বসেছে সেই উদ্দেশ্যেই।
ডাক্তার রোগীর পর রোগী দেখে চলেছেন। এই সময়ে এসে দাঁড়াল এক ছফুট লম্বা মানুষ—মশায়, একবার যে দেখতে হবে। গম্ভীর ভরাট গলা।
–কী? তোমার কী হল?
–কী হল বুঝতে তো পারছি না। কাশি সর্দি—মধ্যে মধ্যে জ্বর; কিছুতেই ছাড়ছে না। হাতখানা বাড়িয়ে দিলে—ছ-ফুট লম্বা—তেমনি কাঠামো—এক পরিণত বয়সের জোয়ান। ঘাট মহেশপুরের রানা পাঠক। এ অঞ্চলে রানা পাঠক শক্তিশালী জোয়ান; লাঠি খেলা, কুস্তি করা, নদীর ঘাটে নৌকা খেয়া দেওয়া, দেবস্থানে বলিদান করা তার কাজ। বছর কয়েক আগে পর্যন্ত প্রতি বৎসর অম্বুবাচীতে কুস্তি প্রতিযোগিতায় রানা পাঠকের নাম একবার কয়েক দিনের জন্য মুখে। মুখে ফিরত। আর-একবার রানার নাম শোনা যেত কালীপূজার সময়। রানার মহিষবলির কৃতিত্ব লোকের মুখে গল্পের কথা। বাড়িতে কিছু জমিজেরাত আছে—তার ধানে ফসলে আর খেয়াঘাটের নৌকার আয়ে রানা পাঠকের বেশ ভালই চলে যায়। মহেশপুরের ঘাটের ডাক তার একচেটে। ও ঘাটে অন্য কেউ ডাক নিয়ে নৌকা পার করতে পারে না। রানা পাঠকের অসুখ কখনও শোনেন নি মশায়। কিন্তু আজ রানাকে দেখে জীবনমশায় বিস্মিত হলেন। এ কী চেহারা হয়েছে রানার? চোখের কোলে কালি পড়েছে, শক্ত বাঁশের গোড়ার দিকের মত মোটা কবৃজির হাড় বেরিয়ে পড়েছে—জামার ফাঁক দিয়ে কণ্ঠ দেখা যাচ্ছে।
–রানা, বাবা এ তুমি ভাল করে দেখাও। তুমি বরং বর্ধমানে গিয়ে দেখিয়ে এস। নয়তো এখানেই আজকালকার ভাল ডাক্তারদের দেখাও। এ তোমার টোটকাতে কি মুষ্টিযোগে যাবে না।
রানা মাথাটা ঝাঁকি দিয়ে বললে—উঁহুঁ! ওরা গেলেই বলবে যক্ষ্মা হয়েছে। বুঝলেন না–ওদের এইটে বাতিক। তারপর ফর্দ দেবে ইয়া লম্বা। বুকের ফটো তোলাও, চায়ের থুতু পরীক্ষা করাও-এই কর—তা কর। চিকিৎসা তারপর! যক্ষ্মা হয়ত আমার হয়েছে। বুঝেছেন…একটা মেয়েছেলের কাছ থেকে ধরার কথাই বটে। তার আবার পরীক্ষা কিসের? এত পরীক্ষাই যদি করতে হবে তো—ডাক্তারি কিসের? আপনি হাত দেখুন। বলে দেন কী করতে হবে। ওষুধ দেন। আমি সব ঠিক ঠিক করব। তারপরে আমার পেরমায়ু আর আপনার হাতযশ! আর ওইসব ফোঁড়া-যুঁড়ি আমার ধাতে সইবে না মশায়। যক্ষ্মার ওষুধ তো আপনাদেরও আছে।
–আছে। কিন্তু এখন যেসব ওষুধ বেরিয়েছে সেসব অনেক ভাল ওষুধ রানা। অনেক ভাল।
–আপনি বলছেন?
–বলছি রানা। তাতে তো লজ্জা নাই বাবা। তুমি বরং হরেন ডাক্তারের কাছে যাও। আর ওই বুকের ফটো তোলানোর কথা বললে না বাবা, ওটা করানো ভাল। এক্স-রে করলে বোঝা যাবে, চোখে দেখা যাবে কতখানি রোগ হয়েছে। আবার ভাল হলে একবার এক্স-রে করলে বুঝতে পারবে—একেবারে নির্দোষ হল কি না। এখন ধরহয়ত একটু থেকে গেল। শরীর ভাল হয়েছে—সেটা ধরা গেল না। সেই একটুই আবার বাড়বে—কিছুদিন পর।
