ঘরে এদিকে রোজগারের অভাবে হাঁড়ি ঢনন—আর রোগীদের অবহেলা! বকেই চলেছে দাঁতু।
নন্দ বার কয়েকই বলেছে—এই দেখ ঠাকুর, ভাল হবে না। যা-তা বোলো না বলছি। কিন্তু দাঁতু ঘোষাল গ্রাহ্য করে নি। বলেছে—তুই বেটা বাঁশ চেয়ে কঞ্চি দড়, পীর চেয়ে খাদিম জিলে—সকাল থেকে পাঁচবার বলেছি তামাক দিতে। গ্রাহ্যই করলি না! তোর কি, মাস পোহলেই মাইনে নিবি। চুরি করে মশায়বাড়ির যাও ছিল শেষ করলি। এইবার রোগী তাড়িয়ে লক্ষ্মী ছাড়িয়ে তুই ছাড়বি।
পরান খাঁও প্রতিবাদ করেছিল—দেখ ঘোষাল, কথাগুলান তুমি অন্যায় বলছ। কঠিন রোগী দেখতে গেছেন মশায়, তাতে দেরি যদি হয়ে থাকে তবে ই সব কথা তুমি কী বলছ? ছিঃ আর কারে কী বলছ?
বলুক খা, ওকে বলতে দাও। ওই কথা ছাড়া অন্য কথা এখন ওর মুখে আসবে না। ওর বুদ্ধিই এখন বিপরীত বুদ্ধি। সর্বনাশকালে মানুষের বিপরীত হয়। আর মৃত্যুকালের চেয়ে সর্বনাশের কাল তো মানুষের আর হয় না। ঘোষাল যাবে। যাবার কাল যত কাছে আসবে তত এটাই ওর বাড়বে।
হেসেই কথাগুলি বললেন– জীবনমশায়। তিনি আরোগ্য-নিকেতনের ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন। চণ্ডীতলা থেকে গ্রামে ঢুকবার পথটাই সদর-রাস্তার উলটো দিকে। সেই পথে কবিরাজখানার পিছন থেকে ঢুকে তিনি বেরিয়ে এলেন সামনে।
দাঁতু ঘোষাল এক মুহূর্তে যেন জমে পাথর হয়ে গেল। ভয়ার্ত বিস্ময়ে বিস্ফারিত দৃষ্টিতে চেয়ে রইল জীবন মশায়ের দিকে। হতবাক হয়ে গিয়েছে সে। হাত দুটো শিথিল হয়ে ঝুলে পড়েছে।
জীবনমশায় চেয়ারখানা টেনে নিয়ে বসলেন, বললেন–দেরি একটু হয়ে গেল আজ। চণ্ডী মায়ের স্থানের গোঁসাইজীর অসুখ। হয়তবা যাচ্ছেন গোঁসাই। সেখানে যেতে হয়েছিল সকালে উঠেই। নবগ্রামের রতনবাবুর ছেলে বিপিনবাবুর কঠিন অসুখ, সেখানেও যেতে হয়েছিল। যারা এতদূর দেখাতে এসেছে তাদের তো এমন জরুরি অবস্থা নয়।
দাড়িতে হাত বোলাতে লাগলেন জীবনমশায়। রোগীর দল তবু কেউ কোনো কথা বলতে পারলে না। দাঁতু ঘোষালের দিকেই তারা তাকিয়ে ছিল। দাঁতু দাঁড়িয়ে ছিল মৃত্যু দণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত আসামির মত।
অকস্মাৎ সে ভাঙা গলায় বলে উঠল—কী বললে মশায়? আমি বাঁচব না? আমি মরব?
জীবনমশায় নিস্পৃহ নিরাসক্তের মত বললেন–এ রোগ তোমার ভাল হবে না ঘোষাল। এই রোগেই তোমাকে যেতে হবে। এ তোমার ভাল হবার রোগ নয়। তবে দু মাস কি ছ মাস কি দু বছর পাঁচ বছর—তা কিছু বলছি না আমি।
দাঁতু এবার চিৎকার করে বলে উঠল—তুই গো-বদ্যিতুই গো-বদ্যি হাতুড়ে, মানষুড়ে।
জীবনমশায় বলেই গেলেন—এ যদি তোমার ভাল হবার হত ঘোষাল তবে দুদিন যেতে না যেতেই তুমি কী খুব কী খাব করে ছুটে আসতে না, তামাক গাঁজার জন্যে তুমি ক্ষেপে উঠতে না। মৃত্যু-রোগের এ হল একটা বড় লক্ষণ। রাগের সঙ্গে রিপুর যোগাযোগ হলে আর রক্ষে থাকে না। তোমার তাই হয়েছে।
দাঁতু এবার পট করে তার পৈতেগাছটা ছিঁড়ে ফেলে চিৎকার করে উঠল—আমি যদি বামুন হই তবে ছ মাস যেতে-না-যেতে তোর সর্বনাশ হবে। বামুনের মেয়ের অভিশাপে তোর ব্যাটা মরেছে এবার ব্ৰহ্মশাপে তোর সর্বনাশ হবে।
বলেই সে হনহন করে নেমে পড়ল, আরোগ্য-নিকেতনের দাওয়ার উপর খানিকটা গিয়েই সে থমকে দাঁড়াল। ঘুরে দাঁড়িয়ে বললে–চললাম আমি হাসপাতালে বড় ডাক্তারের কাছে। আজই আমি হাসপাতালে ভর্তি হব। বাঁচি কি না দেখ।
মশায় হাসলেন। তারপর বললেন–কার কী বল?
এসে দাঁড়াল একটি লোক। কালাজণ্ডিস হয়েছে। মানুষটা যেন হলুদ মেখে এসেছে। প্রতিবিধান অনেক করেছে। কামলার মালা নিয়েছে মালাটা হাঁটু পর্যন্ত লম্বা হয়েছে; তাতে সারে নি। হাসপাতালে গিয়েছে—তাতেও বিশেষ কিছু হয় নি। অবশেষে মশায়ের কাছে এসেছে।
জীবন দত্ত বললেন–তাই তো বাবা। হাসপাতালে যখন কিছু হয় নি তখন সময় নেবে। আর ওষুধ যদি কবিরাজি মতে খাও—বোধহয় তাই ইচ্ছে, নইলে আমার কাছে আসতে না, মুশকিল হচ্ছে আমি তো ওষুধের কারবার তুলে দিয়েছি।
একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন–আমি মোটামুটি চিকিৎসা করাই ছেড়ে দিয়েছি। নতুন কাল, নতুন চিকিৎসা, নতুন রুচি এ তো আমার কাছে নাই। তা ছাড়া আমার নিজেরও আর ভাল লাগে না। তবু এককালে চিকিৎসা করতাম; দু-চার জন পুরনো লোক আজও ছাড়ে না, তাই তাদের দেখি। বুঝেছ না?
একটু হাসলেন। বোধহয় দাঁতু ঘোষালের প্রসঙ্গটা তার মনের মধ্যে তখনও ঘুরছিল।
—তুমি বরং ভূদেব কবরেজের কাছে যাও। সে ওষুধপত্র রাখে। আর নতুন কালে কবিরাজি শিক্ষার কলেজ হয়েছে, সেখানে পাস করেও এসেছে। বুঝেছ না? কবিরাজিতে নিজের ওষুধ ছাড়া চিকিৎসা করে ফল হয় না।
—আজ্ঞে না ডাক্তারবাবু, আপনি দেখুন আমাকে। নইলে আমি হয়ত বাঁচব না। আমার বাবা দাদা সবাই ঠিক এই বয়সে মারা গিয়েছে। পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশের ভিতর। আমাকে বাঁচান।
–না-না। না-বাচবার মত তোমার কিছু হয় নি বাপু। আর বাঁচা মরার ব্যাপারটাই একটা আশ্চর্য ব্যাপার। ওর উপরে যদি মানুষের হাত থাকত! হাসলেন ডাক্তার। শুনলে না, দাঁতু বলে গেল—আমার ছেলের কথা! সে নিজেও ডাক্তার ছিল। এ কী, কাঁদছ কেন তুমি? আচ্ছা আচ্ছা। আমিই দেখব। তুমি বস। আমি ওষুধ লিখে দিচ্ছি, ভূদেবের কাছে কিনে নিয়ে যাও। তারপর আমি ঘরে তৈরি করে দেব। বুঝেছ! ভয় নেই। ভাল হয়ে যাবে। এত ভয় পেয়েছ কেন?
দাড়িতে হাত বোলাতে লাগলেন ডাক্তার। লোকটি বড় ভয় পেয়েছে। ভয় রোগের জন্য নয়। বাবা দাদা ঠিক এই বয়সে মরেছে বলে ও বেচারিও ভয় পেয়েছে। ভয়টা খুব অহেতুকও নয়। এমন হয়। বিচিত্রভাবে হয়।
