রতনবাবুর কথাগুলি মনে পড়ল। ঘর দেখে নি, সংসার দেখে নি, ছেলেপুলে স্ত্রী নিয়ে আনন্দ করে নি। শুধু কাজ, কাজ, মামলা মামলা মামলা। কতবার রতনবাবু বলেছেন–বিপিন, এও তোমার রিপু–!
রিপুই বটে। বড় ভয়ঙ্কর রিপু। বড় ভয়ঙ্কর। তিনি নিজে ভুগেছেন যে! জীবন্তে মৃত্যু ঘটেছে বলে তিনি তার হাত থেকে পরিত্রাণ পেয়েছেন। বনবিহারীর মৃত্যুর পর তিনি চিকিৎসায় অমনোযোগী হয়েছেন এবং কাল অগ্রসর হয়ে তাকে পুরনো জীর্ণ বলে ঘোষণা করেছে। আজ তাঁর অবস্থা গজভুক্ত কপিথের মত। সত্য বলতে গেলে এ তো তার মৃত্যু।
–কেমন দেখে এলি? রতনবাবুর ছেলেকে?
–সেতাব?
সেতাবের বাড়ি এসে পড়েছেন, খেয়াল ছিল না।
—কী দেখলি?
—দেখব আর কী? আমি তো দেখছি না। দেখছে ডাক্তাররা। আমাকে ডেকেছিল হিষ্কা বন্ধের জন্যে। তা কমেছে। বোধহয় সন্ধ্যা পর্যন্ত হিক্কা থেমে যাবে।
–কিন্তু নাড়ি দেখলি তো?
–দেখেছি।
–কী দেখলি তাই তো শুধাচ্ছি রে!
–প্রদ্যোত ডাক্তারসুদ্ধ যখন দেখছে তখন কী দেখলাম তা বলা তো ঠিক হবে না সেতাব। একালে ওদের ওষুধপত্রের খবর তো সব জানি না ভাই, কী করে বলব?
—হুঁ। তা তুই ঠিক বলেছিস। তবে রতনবাবু তো আমাদের গায়ের লোক, ঘরের লোক সেই জন্যে। বুঝলি না, অবস্থা আছে, চিকিৎসা করাতে পারেন। কলকাতা নিয়ে যেতে পারেন।
–কলকাতা থেকে আসাটাই ভুল হয়েছে। কলকাতায় থাকলেই ভাল করতেন। এলেন। বিশ্রাম হবে বলে। কিন্তু হঠাৎ রোগ বাড়লে কী হবে সেটা ভাবলেন না। ওই হয় রে। সংসারে দীর্ঘকাল চিকিৎসা করে এইটেই দেখলাম যে, ভ্ৰম হয়, সেবার ত্রুটি হয়, এটা-ওটা হয়। কলকাতা নিয়ে যাওয়া আর চলবে না। মানে
—তা হলে? কথার মাঝখানেই বাধা দিয়ে সেতাব কথা বলে উঠল; কিন্তু নিজেও কথাটা শেষ করতে পারলে না, নিজেই থেমে গেল।
—না-না সে বলি নি, বলবার মত কিছু পাই নি। তবে বুঝলি না? তবু যেন ভরসা। পাচ্ছি না।
একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন ডাক্তার। এরপর দুজনেই চুপ করে বসে রইলেন।
ডাক্তার হঠাৎ উঠে বললেন– চললাম, রোগী বসে আছে বাড়িতে। চণ্ডীতলা হয়ে যাব। গোঁসাই এখনতখন, জানিস?
–শুনেছি কাল। আজ বোধহয় ভাল আছেন একটু। নিশি ঠাকরুন গিয়েছিল চণ্ডীতলা মায়ের স্থানে জল দিতে; সে বলছিল। শশী নাকি ভাল করেছে গোঁসাইকে একদাগ ওষুধে। বলছিল—কাল জীবনমশায় ভাইঝিটাকে দেখে বললে, জলবারণ খাওয়াতে হবে। তা—শশীকেই দেখাব আমি।
চমকে উঠলেন জীবন দত্ত। শশীকে দেখাবে? হতভাগিনী মেয়েটার মুখ মনে পড়ল। কচি মেয়ে। কত সাধ কত আকাঙ্ক্ষা মনে। মেয়েটাকে হত্যা করবে। শশী একটা পাপ হয়ে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে আর-একটি তরুণীর মুখ মনে পড়ল।
সেতাব বললে–তুই কাল নিশির ভাইঝিকে দেখেছিলি নাকি? জলবারণের কথা বলেছিলি?
–বলেছিলাম। আমার বিদ্যেতে ওই একমাত্র ওষুধ। কিন্তু ও কথা থাক। কী বলে–গণেশ ভটচাজের মেয়ের খবর কিছু জানিস? কাল রাত্রে–
–খুব কাহিল। এখন-তখন অবস্থা শুনছি। কাল তো তুই শুনলাম বলে দিয়েছিলি নাড়ি দেখে।
—না তো? জীবনমশায় চমকে উঠলেন।–আমি তো নাড়ি দেখি নি প্রসবের পর। হাসপাতালের ডাক্তার
কথার উপর কথা দিয়ে সেতাব বললে–হাসপাতালের ডাক্তার শুনলাম কোমর বেঁধে লেগেছে। শুনলাম খুব ইনজেকশন দিচ্ছে। অক্সিজেন দিয়ে রেখেছে। গণেশকে বলেছে আর-একটা অক্সিজেন আনতে হবে।
চললাম। জীবনমশায় অকস্মাৎ চলতে শুরু করলেন যেন। তরুণ ছোকরাটি বাহাদুর বটে, বীর বটে। শক্তিও আছে, নিজের উপর বিশ্বাসও আছে। যুদ্ধ করছে বলতে গেলে। একবার দেখে যাবেন।
প্রদ্যোত গম্ভীর মুখে বসে আছে আপিসে। গণেশ নই, গণেশের স্ত্রী আধ-ঘোমটা দিয়ে বসে আছে বারান্দায়। মশায়কে দেখে সে মৃদুস্বরে কেঁদে উঠল।—ওগো মশাই, আমার অৰ্চনার কী হবে গো? একবার
–কাঁদবেন না। গম্ভীর স্বরে প্রদ্যোত বললে।
মশায় বললেন–কেঁদো না মা। দেখ, ভগবান কী করেন। এতে তার হাত মা। প্রদ্যোত কুঞ্চিত করে বললে–আপনি কি নাড়ি দেখতে চান নাকি?
মশায় বললেন–না-না। আমি যাচ্ছিলাম পথে, ভাবলাম একবার খবর নিয়ে যাই। বলেই তিনি ফিরলেন।
–একটু বসবেন না?
–না। দু-চারটে রোগী এখনও আসে তো। তারা বসে আছে।
প্রদ্যোত বললে—মতির মায়ের এক্স-রের রিপোর্ট এসেছে। দেখবেন? বিশেষ কিছু হয়। নি। এতক্ষণে একটু হাসলে প্রদ্যোত।
—ভালই তো। আপনার দয়াতেই বুড়ি বাঁচল। মশায় গতি দ্রুততর করলেন। একবার মনে হল—বলেন–বিপিনের হিকা থেমে এসেছে। কিন্তু তা তিনি বলতে পারলেন না।
২০. দাঁতু ঘোষাল চিৎকার করছিল
দাঁতু ঘোষাল চিৎকার করছিল।
এসেছে সকালবেলা আটটা না-বাজতে। এখন সাড়ে দশটা। নবগ্রাম ইস্টিশানে সাড়ে দশটার গাড়ি চলে গেল, এখনও বসে থাকতে হয়েছে। কেন? এত গুমোর কেন জীবন মশায়ের? কী মনে করে মশায়? দেশে ডাক্তারের অভাব? না—দাঁতু ঘোষাল এতই অবহেলার মানুষ?
নবগ্রামে চারটে ডাক্তার বসে ফ্যা-ফ্যা করছে। চ্যারিটেবল ডিসপেনসারি ছিলচার বিছানার হাসপাতাল—তারপর যুদ্ধের সময় দেশে মন্বন্তর হলে দশ বিছানার হাসপাতাল হয়েছিল—এখন পঞ্চাশ বিছানার হাসপাতাল তৈরি হচ্ছে। একজন ছোট ডাক্তার ছিল—এখন দুজন ডাক্তার হয়েছে—নার্স এসেছে। সেখানে গিয়ে এলাম বলে একটা বিছানায় শুয়ে পড়লেই হল। সময়ে খাওয়া—সময়ে ওষুধ-য-বার খুশি ডাকলেই ডাক্তার। কেবল জাত থাকবে না। আর মান থাকবে না বলে যায় না। এ ছাড়া কবরেজ দুজন, তার মধ্যে ভূদেব কবরেজ দস্তুরমত পাসকরা, হোমিওপ্যাথ দুজন-আলি মহম্মদ আর বাঙাল ডাক্তার। দোকানে গেলে কেউ পয়সা নেয় না। জীবন মশায়ের মতিভ্ৰম হয়েছে, নইলে রোগীদের এমন অবহেলা কখনও করত না। কেবল পুরনো লোক-ধাত চেনে, মশার বংশের বংশধর—তাই আসে। আর আসবে না। কালই হয় ভূদেব কবরেজের কাছে নয় হরেন ডাক্তারের কাছে যাবে। যে দেশে গাছ থাকে না–সে দেশের ভেরে গাছই বিরিক্ষি। সেকালে ডাক্তার-বৈদ্যের অভাব ছিল, তাই জীবনমশায় ছিল ধন্বন্তরিনিদান হাকত। যেটা ফলত, সেটাই জাহির করত; যেটা ফলত না—সেটার বেলা চুপচাপ থাকত। মরার বদলে বাঁচলে, কে আর তা নিয়ে ঝগড়া করে? এবার এই বাঘা প্রদ্যোত ডাক্তারের হাতে পড়েছে; এইবার মজাটা বুঝবে। এই তো মতি কর্মকার বর্ধমান হাসপাতালে মাকে ভর্তি করে দিয়েছে। পায়ের ফটো নিয়েছে, ভিতরে হাড়ের কুচি আছে, কেটে বার করবে–বাস, ভাল হয়ে যাবে। প্রদ্যোত ডাক্তার বলেছে, আসুক ফিরে মতির মা। তারপর নাড়ি দেখার নিদান হকার ফাঁপা বেলুন ফুটিয়ে দেব।
