—তবে আমার মনের কথা আমি কাউকে বলি না। বুঝেছ ভাই। ওটা আমার প্রকৃতিধর্ম নয়। বিপিনের নিজের বিশ্বাস নাই। বউমার নাই। বিপিনের বড় ছেলে এম. এ. পড়ছে, সে তো একটু বেশি রকমের আধুনিকপন্থী। তাদেরও বিশ্বাস নাই। আমি বললে তারা কেউ আপত্তি করবে না, সে আমি জানি; মুখ ফুটে কেউ কোনো কথা বলবে না কিন্তু অন্তরে অন্তরে তো তাতে সায় দেবে না; মনের খুঁতখুঁতুনি তো থাকবে। সেক্ষেত্রে আমি বলি না, বলব না। তবে কাল যখন ডাক্তারেরা সকলেই বললেন– যে, হেঁচকি থামাবার আর কোনো ওষুধ আমাদের নাই, তখন। আমি তোমার কথা বললাম। আজ সকালে ডাক্তারদেরও ডেকেছি, তারাও আসবেন, হাসপাতালের প্রদ্যোত ডাক্তার, হরেন সবাই আসবেন। সকলে মিলে পরামর্শ করে একটা ব্যবস্থা কর ভাই।
গম্ভীর হয়ে উঠলেন জীবনমশায়। বললেন–দেখ রতন, শুধু হেঁচকি বন্ধ করবার জন্য আমাকে তোমরা ডেকেচ্ছ। আমি ভাই তার ব্যবস্থাই করেছি। তা কমে এসেছে, হয়ত আজ ওবেলা পর্যন্ত হেঁচকি বন্ধ হয়ে যাবে। তারপর একটা পথ ধরতে হবে। আমি কবিরাজিও জানি অ্যালোপ্যাথিও করি। আমি বলছি ভাই-দু নৌকায় দু পা রেখে চলা তো চলবে না। হয় কবিরাজি নয় অ্যালোপ্যাথি দুটোর একটা করতে হবে। ওঁরাও ঠিক এই কথাই বলবেন।
একটু চুপ করে থেকে বললেন–আর আজ এখন তো আমি অপেক্ষা করতে পারব না। আমার বাড়িতে কয়েকজন রোগীই বসে আছে। ভোরবেলা চণ্ডীতলার মোহান্তকে দেখতে গিয়েছিলাম। পথে বিপিনকে দেখে যাচ্ছি। হেঁচকি কমেছে, আমি নিশ্চিন্ত। আমি বিপিনকে দেখে যাই, তারপর ওঁরা আসবেন দেখবেন, পরামর্শ করে যা ঠিক হবে আমি ওবেলা এসে। শুনব।
বৃদ্ধ রতনবাবু বিষণ্ণ হলেন, তবুও যথাসম্ভব নিজেকে সংযত করে প্রসন্নভাবেই বললেন– বেশ! তাই দেখে যাও তুমি। তুমি যা বলবে ওঁদের বলব।
বিপিন সত্যই একটু ভাল আছে। নাড়িতে ভাল থাকার আভাস পেলেন জীবন দত্ত। কিন্তু ভাল থাকার উপর নির্ভর করে আশান্বিত হয়ে উঠবার মত বয়স তার চলে গেছে। বললেন, ভালই যেন মনে হচ্ছে। তবে ভাল থাকাটা স্থায়ী হওয়া চাই রতন।
–নাড়ি কেমন দেখলে, বল।
—যা দেখলাম তাই বলেছি রতনবাবু! তোমার মত লোকের কাছে রেখেঢেকে তো বলার প্রয়োজন নাই এবং তা আমি বলব না। তোমাকে আমি জানি।
রতনবাবু একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন।
জীবনমশায় হেসে বললেন–আমি কিন্তু নৈরাশ্যের কথা কিছু বলি নি রতন। এই ভাবটা যদি স্থায়ী হয় তা হলে ধীরে ধীরে বিপিন সেরে উঠবে। হেঁচকি আজই থামবে। তারপর আর যদি কোনো উপসর্গ না বাড়ে তা হলে দশ-বার দিনের মধ্যে যথেষ্ট উন্নতি হবে। ভাল থাকাটাকে স্থায়ী ভাব বলব, বুঝেছ? বলব হ্যাঁ আর ভয় নাই। সাবধানে থাকতে হবে। আর এখান ওখান প্র্যাকটিস করে বেড়ানো চলবে না। ওই বাড়িতে বসে যা হয়, তাও বেশি পরিশ্রম চলবে না।
–ওই তো! ওই তো রোগের কারণ। বার বার বারণ করেছি। বার বার। কিন্তু শোনে কি? কী বলব? কী করব? উপযুক্ত ছেলে। গণ্যমান্য ব্যক্তি। জীবনের কোনোখানে কোথাও কোনো দোষ নাই, অমিতাচার নাই, অন্যায় নাই, আহারে লোভ নাই, অন্যায় পথে অর্থোপার্জনের মতি নাই, কোনো নেশা নাই; সিগারেট পান পর্যন্ত খায় না; ক্রোধ নাই; বিলাসী নয়; শুধু ওই প্র্যাকটিস। প্র্যাকটিস আর প্র্যাকটিস। তাও তোমাকে বলছি ভাই, প্র্যাকটিস যে অর্থের জন্যে তাও নয়। ওই মামলা জেতার নেশা। এ জেলা ও জেলা, এ কোর্ট ও কোর্ট সে কোর্ট। তারপর মাসে দুবার তিনবার হাইকোর্টে কেস নিয়ে গিয়েছে। ওই মামলা জেতার নেশা, যে মামলায় হার হয়েছে, হাইকোর্টে তাই ফিরিয়ে আনতে হবে। তা এনেছে। ও নেশা কিছুতেই গেল না। ঘর দেখে নি, সংসার দেখে নি, ছেলেপুলে স্ত্রী নিয়ে আনন্দ করে নি, আমার ঘাড়ে সব ফেলে দিয়ে ওই নিয়ে থেকেছে। আমি কতবার বলেছি–বিপিন, এও তোমার রিপু। রিপুকে প্রশ্রয় দিয়ো না। প্রশ্রয় পেলে রিপুই ব্যাধি হয়ে দেহ-মনকে আক্রমণ করে হয়ত–। বাপ হয়ে কথাটা তো উচ্চারণ করতে পারতাম না ভাই।
জীবন দত্ত বললেন– যাক এবার সেরে উঠুক। সাবধান আপনিই হবে।
একটি কিশোর ছেলে এসে দাঁড়াল, আপনার ফি। এইটিই বিপিনের বড় ছেলে। চমৎকার ছেলে।
—এ কী? চার টাকা কেন? আমার ফি দু টাকা!
দুটি টাকা তুলে নিয়ে জীবনমশায় পকেটে ফেলে বেরিয়ে পড়লেন। ছেলেটি সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এল। বলল—আপনি কি ডাক্তাররা যখন আসবেন তখন থাকবেন না?
–আমি? আমি থেকে কী করব?
–আপনার মতামত বলবেন।
–আমি তো শুধু হিকার জন্য ওষুধ দিয়েছি। ওটা একটা উপসর্গ। মূল চিকিৎসা তো ওঁরাই করছেন। হাসলেন জীবন ডাক্তার।
ছেলেটি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ বললে—ওবেলা একবার আসবেন না?
—আসব? আচ্ছা আসব।
ডাক্তার চলে গেলেন।
বিপিন বোধহয় বাঁচবে না। ভাল খানিকটা মনে হল বটে কিন্তু আজ যেন স্পষ্টই তিনি নাড়ি দেখে অনুভব করেছেন—মৃত্যু আসছে। আসছে কেন ইতিমধ্যেই এসে দাঁড়িয়েছে। ছায়া পড়ছে তার। রনবাবুর কথা ভাবলেন। বড় আঘাত পাবে রতন। নিজের কথা মনে পড়ল। তার ছেলে বনবিহারী মারা গেছে। বিপিনেরই বয়সী সে। একান্ত তরুণ বয়সে বনবিহারী মারা গেছে; নিজের অমিতাচারে, মদ্যপান এবং তার আনুষঙ্গিক অনাচার করে নিজেকে জীৰ্ণ করেছিল, তার উপর ম্যালেরিয়ায় ভুগে নিজেকে ক্ষয় করেছিল সে। বিপিন নিজেকে অতিরিক্ত কৰ্মভারে পীড়িত করে ক্ষয় করেছে।
