রঙলাল ডাক্তার এর উত্তরে সেদিন ব্যঙ্গ করেন নি। প্রসন্ন হেসে বলেছিলেন, ব্যাপারটা তাই বটে জীবন। হারজিতের একটা লড়াই-ই বটে। কিন্তু ওইটেই যেমন চোখে পড়েছে তেমনি চোখ যদি আরও তীক্ষ্ণ হত তবে দেখতে পেতে, এক-একটা মানুষ কেমন করে ঘুরে দাঁড়ায়, বলে,—এস! তুমি যে ওই ভয়ঙ্কর বেশে আসছ, তোমার আসল রূপটা দেখি। কিংবা বলে–তোমাকে আমি ধরা দিচ্ছি, কিন্তু যারা পালাচ্ছে বাঁচতে দাও। তখন মরণের ভয়ঙ্কর মুখোটা খসে যায়। দেখা যায় সে বিশ্ববিমোহিনী। তা ছাড়া তুমি জান না, মরণ যত গ্রাস করছে তার দ্বিগুণ জীবন জন্ম নিয়ে চারদিক থেকে কুক দিয়ে বলছে—কই ধর তোে! হারছে না তারা। আরও একটা কথা বলি। মানুষ হারে নি। মহামারীতে কতবার কত জনপদ নষ্ট হয়েছে। আবার কত জনপদ গড়েছে। শুধু গড়েই ক্ষান্ত হয় নি। সে রোগের প্রতিষেধক বার করে চলেছে। ওখানেই তাকে হারানো যায় নি। সে হারে নি। মরবে সে। কিন্তু এইভাবে সে মরবে না। মহাগজের মত মরবে না। যেদিন বৃদ্ধ হবে, জীবনের আস্বাদের চেয়ে মৃত্যুর আস্বাদ ভাল লাগবে, সেইদিন মহাগজ যেমন নিবিড় অরণ্যে গিয়ে শত বৎসরের এক খাদের মধ্যে আকাশ বিদীর্ণ করে ধ্বনি। তুলে আমি চললাম বলে দেহত্যাগ করে, তেমনি করে মরবে। হাতিরা এইভাবে পুরুষানুক্রমিক শ্মশানভূমিতে গিয়ে দেহত্যাগ করে থাকে। কেন জান? পাছে তার রোগ বা পচনশীল দেহ থেকে রোগ উৎপন্ন হয়ে অন্য হাতিদের আক্রমণ করে।
এই মহামারী থামবার পর সন্ন্যাসীর সঙ্গে আলাপ। এই মহামারীর পর এখানে তিনি সমাজের প্রধান হয়ে উঠেছিলেন। নবগ্রামের বাবুদের উপেক্ষা করে সরকার তাকে প্রেসিডেন্ট পঞ্চায়েত মনোনীত করছিলেন। সেই প্রেসিডেন্ট পঞ্চায়েত হিসেবে একটি কলহের মীমাংসায় তিনি এসেছিলেন এই মহাপীঠে।
সন্ন্যাসী এসে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল—আরে ভাইয়া, তুমহারা নাম জীওন মহাশা। তুমি নাকি বড়া ভারি বীর? আও তো ভাই পাঞ্জা লঢ়ে এক হাত।
পাঞ্জার লড়াইয়ে তিনি হেরেছিলেন, কিন্তু সহজে হারাতে পারে নি সন্ন্যাসী। বেশ খানিকটা বেগ পেতে হয়েছিল।
তারপর কতদিন কত কথা আলাপ হয়েছে।
একদিনের কথা মনে পড়ছে। এই চণ্ডীতলার মেলায় জুয়া খেলার আসরে শেষ কপদক হেরে সন্ন্যাসীর কাছে এসে বলেছিলেন আমায় একশো টাকা দিতে হবে গোঁসাইজী। কাল পাঠিয়ে দেব।
তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে গোঁসাই টাকাটা তাকে দিয়েছিলেন এই দেবস্থলের তহবিলের টাকা। ডাক্তার এসে আবার বসেছিলেন জুয়ার তক্তপোশে। ঘণ্টাখানেক পরেই গোঁসাই এসে তাকে হাত ধরে টেনে বলেছিলেন-আব উঠো ভাই। বহুত হুয়া।
জুয়াড়ীকে বলেছিলেন–জানতা হ্যায় ইন্ কোন হ্যায়? হিয়াকে বড়া ডাগরবাবু আওর প্রেসিডেন্ট পঞ্চায়েত। ইনকা রুপেয়া যো লিয়া—দে দেও ইনকে।
ডাক্তার বলেছিলেন না। আর মাত্র কুড়ি টাকা হেরে আছি। ওটা ওর প্রাপ্য। চলুন।
পথে সন্ন্যাসী বলেছিলেন-কথাটা তার অন্তরে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে বলেছিলেন-কাহে ভাই মহাশা-তুম মহাশা বন্শের সন্তান মহাশা-তুম ভাই জুয়া খেলো, রাতভর দাবা খেলো, খানাপিনামে এই হল্লা করো–এ কেয়া ভাই? ভগবান তুমকো কেয়া নেহি দিয়া, বোলো? কেঁও, তুমহারা ঘরকে মতি নেহি?
ওঃ! সে একটা সময়! দেহে অফুরন্ত সামৰ্থ, মনে দুরন্ত সাহস, বিপুল পসার, মানসম্মান, ঘরকা সংসার কোনো কিছুই মনে থাকত না। তবে কোনো অন্যায় করতেন না। জুয়ো খেলাটা ছিল শখ। ওটা সে আমলের ধারা। তবে সংসারে যদি–।
অকস্মাৎ তাঁর চিন্তাসূত্র ছিন্ন হয়ে গেল।
একটা প্রশ্ন জেগে উঠল মনের মধ্যে। বিপিনরতনবাবুর ছেলে বিপিনের জীবনে কি? সংসারজীবনে বিপিনের গোপন দুঃখ ছিল? অশান্তি? বাইরে ছুটে বেড়াত প্ৰতিষ্ঠা যশ কুড়িয়ে বেড়াত কিন্তু তবু তৃষ্ণা মিটত না, ক্ষুধা মিটত না। ছুটত ছুটত ছুটত। অথবা রিপু? মানুষের সাধনার পথে আসে সিদ্ধি। সে আসার আগে আসে প্রতিষ্ঠা। জাগিয়ে তোলে লালসা। আরও চাই। ওই তো রিপু। ওর তাড়নায় ছুটতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে মানুষ। সামনে এসে দাঁড়ায় সেই পিঙ্গলকেশিনী।
***
রতনবাবুর ছেলে বিপিনের হেঁচকি থামে নি, তবে কমেছে। রক্তের চাপও খানিকটা নেমেছে। রতনবাবু প্রসন্ন হাস্যের সঙ্গেই বলছেন—তোমার ওষুধে ফল হয়েছে জীবন। তুমি একবার নাড়িটা দেখ। আমার তো ভালই লাগছে।
জীবনমশায়ও একটু হাসলেন। হাসির কারণ খানিকটা কথাগুলি ভাল লাগার জন্য; খানিকটা কিন্তু ঠিক বিপরীত হেতুতে। হায় রে, সংসারে ব্যাধিমুক্তি যদি সহজে সম্ভবপর হত! এত সহজে যদি ভাল হয়ে উঠত মানুষ!
হাসির কারণ আরও খানিকটা আছে। রতনবাবুর মত মানুষ। পণ্ডিত মানুষ, জ্ঞানী ব্যক্তি, একমাত্র সন্তানের এই ব্যাধি হওয়ার পর তিনি ডাক্তারি বই আনিয়ে এই ব্যাধিটি সম্পর্কে পড়াশুনা করে সব বুঝতে চেয়েছেন, বুঝেছেনও; এবং পৃথিবীতে মানুষের জীবনের ক্ষণস্থায়িত্বের মর্মান্তিক তত্ত্বও তিনি ভাল করেই জানেন—তাকেও এইটুকুতে আশান্বিত হয়ে উঠতে দেখে হাসলেন।
রতনবাবু আবার বললেন–দেখ, আমার অনেকদিন থেকেই ইচ্ছা ছিল যে, কবিরাজি মতেই চিকিৎসা করাই। বিলাতি চিকিৎসার অদ্ভুত উন্নতি হয়েছে, কিন্তু ওদের ওষুধগুলো আমাদের দেশের মানুষের ধাতুর পক্ষে উদ্র। আমাদের ঠিক সহ্য হয় না। ক্রিয়ার চেয়ে প্রতিক্রিয়ার ফল গুরুতর হয়।
বৃদ্ধ এই নৈরাশ্যের তুফানের মধ্যে একগাছি তৃণের মত ক্ষীণ আশার আশ্রয় পেয়ে উল্লসিত হয়ে উঠেছেন, কথা বলতে তার ভাল লাগছে।
