আজ চল্লিশ বৎসর সন্ন্যাসী এখানে আছেন। তিরিশ বৎসরের উপর তিনি এই দেবস্থানের মহান্ত। চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বৎসর বয়সে এখানে প্রথম এসেছিলেন তিনি। কিন্তু দেখে মনে হত তিরিশ বছরের জোয়ান। লম্বা-চওড়া কুস্তি-করা পালোয়ানী শরীর। শাস্ত্রটাস্ত্র জানতেন না, গাঢ় বিশ্বাস আর কয়েকটি নীতিবোধ নিয়ে মানুষটির সন্ন্যাস। সন্ত না থোক, সাধু মানুষ ছিলেন।
প্রথম পরিচয় হয়েছিল বিচিত্রভাবে।
দেশের তখন একটি ভয়াবহ অবস্থা। মড়ক চলছে, মহামারী কলেরা লেগেছে দেশে। এক গ্রাম থেকে আর এক গ্রাম—সেখান থেকে আর এক গ্রাম; বৈশাখের দুপুরে খড়ের চালের আগুনের মত লেলিহান গ্রাস বিস্তার করে ছড়িয়ে পড়ল। সেকালে তখন কলেরার কোনো ওষুধ ছিল না। ক্লোরোডাইন সম্বল। কবিরাজিতে ওলাউঠার ওষুধ তেমন কার্যকরী নয়। ক্লোরোডাইন দেবারও চিকিৎসক নাই। যারা আছে তারা নিজেরাই ভয়ে ত্রস্ত। হরিশ ডাক্তার কলেরায় যেত না। হোমিওপ্যাথ ব্রারোরী তখন পালিয়েছে। থাকলে সেও যেত না। নতুন একজন ডাক্তার এসেছিল নবগ্রামে, সেও একদিন রাত্রে পালিয়ে গেল—কলেরা কেসে ডাকের ভয়ে।
চারদিকে নানা গুজব। সেকালের বিশ্বাসমত ভয়ঙ্কর গুজব। কলেরাকে নাকি দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে সে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সন্ধ্যার মুখে তাকে দেখা যায়। শীর্ণ কঙ্কালসার শরীর, চোখে আগুনের মত দৃষ্টি, পিঙ্গল রুক্ষ চুল, দন্তুর একটি মেয়ে; পরনে তার একখানা ক্লেদাক্ত জীৰ্ণ কাপড়, বগলে একটা মড়া-বওয়া তালপাতার চাটাই নিয়ে সেই পথ ধরে গ্রামে ঢোকে—যে পথ ধরে গ্রামের শব নিয়ে শ্মশানে যায়। সন্ধ্যায় ঢোকে, যার সঙ্গে তার প্রথম দেখা হয় সেই হতভাগ্যই সেই রাত্রে কলেরায় আক্রান্ত হয়। মরে। তারপর রোগ ছড়ায় ঘরে ঘরে পাড়ায় পাড়ায়।
লোকে পালাতে লাগল গ্রাম ছেড়ে।
অবস্থাপন্নেরা আগে পালাল। নবগ্রামের বাবুরা তার মধ্যে সর্বপ্রথম। তারপর সাধারণ লোকেরা।
থাকল গরিবেরা আর অসমসাহসী জনকয়েক, তার মধ্যে মাতাল গাঁজালেরা সংখ্যায় বেশি। মদ খেয়ে গাঁজা টেনে ভাম হয়ে বসে থাকত। কালীনাম হরিনাম করে চিৎকার করত।
তিনিও হরিনাম করতেন।
চিরকালই তিনি সংকীর্তনের দলের মূলগায়েন করেন। গলা তার নাই, সুকণ্ঠ তিনি নন, তবে গান তিনি বোঝেন এবং গাইতেও তিনি পারেন। হ্যাঁ, তা পারেন। দশ কুশীতে সংকীর্তন এখনও তিনি গাইতে পারেন। তাঁর সঙ্গে পাল্লা দেবার লোক এখন আর নাই। থাকবে কোথায়? এসব বড় তালের গানের চর্চা উঠে গেল। কতই দেখলেন। হারমোনিয়াম-গ্রামোফোন, এখন রেডিও। নবগ্রামের কয়েকজনের বাড়িতেই রেডিও এসেছে। শুনেছেন তিনি। সে গান আর এ গান! সেই—দেখে এলাম শ্যাম—সাধের ব্ৰজধাম—শুধু নাম আছে। হায় হায়! শুধু নামই আছে আর কিছু নাই শ্যাম! রাধা স্বৰ্ণলতা তমালকে শ্যাম ভেবে জড়িয়ে ধরে ক্ষতবিক্ষত দেহে ধুলায় ধূসরিত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে হতচেতন হয়ে!।
তিনি প্রতি সন্ধ্যায় সংকীর্তনের দল নিয়ে পথে পথে ঘুরতেন। বিশ্বাস করতেন এই নামকীর্তনে অকল্যাণ দূর হয়। গ্রামে গ্রামে মদ্যপায়ীরা রক্ষাকালী পূজা করাত। তাদেরও সে বিশ্বাস ছিল গভীর।
গভীর রাত্রে পথ-কুকুরে চিৎকার করে চিরকাল। সে চিৎকার যেন বেশি হয়েছে। এবং সে চিৎকারের একটি যেন গূঢ় অর্থ পাওয়া যাচ্ছে। চিৎকারের মধ্যে ক্ৰোধ নাই ভয় আছে। তারা রাত্রে ওই পিঙ্গলকেশিনীকে পথে বিচরণ করতে দেখতে পায়। ভয়ার্ত চিৎকার করে তারা। ঘরে ঘরে অর্ধঘুমন্ত মানুষেরা শিউরে ওঠে।
জীবন ডাক্তারের মৃত্যুভয় ছিল না। তিনি ঘুরতেন। কিন্তু কী করবেন ঘুরে?
শেষে ছুটে গিয়েছিলেন রঙলাল ডাক্তারের কাছে। বলুনওষুধ বলে দিন।
দীর্ঘকাল পরে বৃদ্ধ রঙলাল তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। মেডিকেল জার্নাল পেড়ে বসলেন। তারপর প্রেসক্রিপশন লিখে দিলেন-ওয়ান সিক্সথ গ্রেন ক্যালোমেল আর সোডা বাইকার্ব। ঘণ্টায়-ঘণ্টায় খাওয়াও। এ ছাড়া এখানে এ অবস্থায় আর কিছু করবার নাই।
অনেক প্রাণ রক্ষা পেয়েছিল ওই ওষুধে। দিন নাই রাত্রি নাই জীবনমশায় ঘুরতেন। পিতৃবংশের সম্মান! গুরু রঙলালের আদেশ! নিজের প্রাণের বেদনা।
রঙলাল ডাক্তার প্রেসক্রিপশন দিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন—ভাল কথা, জীবন, তুমি নাকি খুব তারস্বরে চিৎকার করে হরিনাম সংকীর্তন করে কলেরা তাড়াচ্ছ?
অট্টহাস্য করে উঠেছিলেন।
জীবন লজ্জিত যে একেবারে হন নি তা নয়। তা হলেও অপ্রতিভ হন নি। বলেছিলেন কী করব? লোকেরা বিশ্বাস করে ভরসা পায়।
—তুমি নিজে?
জীবন একটু বাঁকা উত্তর দিয়েছিলেন–সবিনয়ে বলেছিলেন-আপনি তো জানেন আমি কোনোদিনই নাস্তিক নই।
–তাতে আমি অসন্তুষ্ট নই, আপত্তিও করি না জীবন। নাম-সংকীর্তন করলেও আপত্তি করব না, তবে সে সংকীর্তন শুধু সপ্ৰেমে কীর্তনের জন্য হওয়া উচিত। আমাকে দাও, আমাকে বাঁচাও, আমার শত্ৰু নাশ কর, এই কামনায় সংকীর্তন আমি পছন্দ করি না। ওতে ফলও হয় না।
জীবন বলেছিলেন—আগুন-লাগা বনের পশুর মত মানুষ ছুটে বেড়াচ্ছে। জানেন, আমি যেন চোখে দেখছি।-উত্তেজিত হয়ে আবেগের সঙ্গেই জীবন সেদিন রঙলাল ডাক্তারের সামনে দার্শনিকতা করে ফেলেছিলেন। বলেছিলেন—মরণ তেড়ে নিয়ে চলেছে জীবনকে। একেবারে এলোকেশী এক ভয়ঙ্করী-হাত বাড়িয়ে ছুটেছে, গ্রাস করবে, অনন্ত ক্ষুধা! আর পৃথিবীর জীবকুল ভয়ে পাগলের মত ছুটছে। ছুটতে ছুটতে এলিয়ে পড়েছে, মৃত্যু তাকে গ্রাস করছে। অহরহই ওই তাড়ায় তেড়ে নিয়ে যাচ্ছে মৃত্যু। এখানে ভগবানের নাম করে তাকে ডেকে ভরসা সঞ্চয় করা ছাড়া করবে কী মানুষ?
