তিনিই সেদিন আরোগ্য-নিকেতনে প্রথম এসেছিলেন। কিন্তু জীবনমশায় শেষত্রে কলে গিয়েছিলেন নবগ্রামে। ওই নিঃস্ব জমিদার রায়চৌধুরীদের এক শরিকের বাড়ি। বৃদ্ধ গৌরাঙ্গ রায়চৌধুরী অকস্মাৎ অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। সন্ন্যাস রোগ। তাকে দেখেই ওঁর কর্তব্য শেষ হয় নি, তার জীবন থাকতে গঙ্গাতীরে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাতেও থাকতে হয়েছিল। বৃদ্ধকে পালকিতে গঙ্গাতীরে রওনা করে দিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন। এবং প্রথমেই দেখেছিলেন মিত্র মহাশয়কে। তাঁর কাছে ক্ষমাও চেয়েছিলেন।
–অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছে আপনাকে। কিন্তু কী করব? আমাদের এখানকার প্রবীণ জমিদার, প্রাচীন জমিদারবংশ।
সংক্ষেপে বিবরণটুকুও বলতে হয়েছিল।
মিত্র হেসে বলেছিলেন-দত্ত মহাশয়। না, দত্ত আর নয়, আপনি এবার আপনাদের পৈতৃক শুদ্ধ মহাশয়ত্বের অধিকারী হয়েছেন। এ অবশ্য আপনারই যোগ্য কাজ। কিন্তু এদিকেও একটু লক্ষ্য রাখবেন। দূরদূরান্তর থেকে আসে সব, এরাই আপনার লক্ষ্মীর দূত। কষ্ট পেলে অবহেলা করলে ততদিনই আসবে যতদিন আর একজনকে না পাবে।
জীবন মহাশয়ের মনে একটু লেগেছিল। কথাটা লাগবার মতই কথা। তিনি বলেছিলেন অবহেলা আমি করি না। সে করলে আমার পাপ হবে, সে সম্পর্কে আমি অবহিত। কষ্ট লাঘবের চেষ্টাও আমি সাধ্যমত করি।
তাও করতেন। বেলা বেশি হলে—রোগীদের শরবত সাগু বার্লি দিতেন। আরোগ্য নিকেতনের পাশে তখন ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের সাহায্য নিয়ে কুয়ো করিয়েছিলেন।
বাতাসা পাটালি চিড়ে মণ্ডার দোকানও একটা বসত তখন।
মশায় আরও বলেছিলেন—আর পসারের কথা। সে ভগবানের দয়া, গুরুর শিক্ষা আর আমার নিষ্ঠা। সবচেয়ে বড় কথা-ভাগ্য। যতদিন থাকবার ততদিন থাকবে। এখন বলুন, আপনার কষ্টের কথা বলুন। কী কষ্ট: যিনি দেখেছিলেন তিনি কোনো ব্যাধি বলেছেন?
মিত্র বলেছিলেন—একটু নিরালা হলে ভাল হয়।
ওই নন্দই ছিল ঘরে। মশায় নন্দকে বাইরে যেতে ইশারা করেছিলেন। নিরালায় বলেছিলেন-কন্যার বাড়ি যাচ্ছি। শেষ বয়সে তারই স্কন্ধে ভার হয়ে পড়তে হল। বিষয়-সম্পদ সব গিয়েছে মামলায়। স্ত্রী গিয়েছেন। এটা ওটা করেই চালাচ্ছিলাম, মদ্যপান করি প্রচুর। আত্মহত্যা করতে পারি না ভয়ে। কন্যা নিয়ে যাচ্ছে, আমারও না গিয়ে উপায় নাই। পথে বের হয়ে ভাবলাম আপনাকে একবার দেখিয়ে যাই। কতদিন বাঁচব বলতে পারেন? আপনার নাড়িজ্ঞানের প্রশংসা শুনেছি। দেখুন তো আমার হাতটা।
দমে গিয়েছিলেন ডাক্তার। বলেছিলেন আমার সে শক্তি নাই। সে শক্তি কদাচিৎ কারও শোনা যায়। রোগ নাই
—রোগ আছে। লিভার বেদনা। মাথায় গোলমাল হয়।
–ও মদ্যপানের ফল। মদ্যপান করলে বাড়বে। ছাড়লে কমে যাবে। নীরবে দুটি টাকা রেখে গৌরহরি উঠলেন। জীবন বললে—আমাকে মাফ করবেন। ফি আমি নিতে পারব না। বাড়িতে এই আরোগ্য-নিকেতনে ফি নেওয়া আমাদের পূর্বপুরুষের নিষেধ আছে।
—কোনো গরিব রোগীকে টাকা দুটো সাহায্য হিসেবে দিয়ে দেবেন। আমি তো ফি না দিয়ে দেখাই না। দীর্ঘাকৃতি গৌরবর্ণ ঈষৎ কুজ মানুষটি ধীরে ধীরে চলে গিয়েছিলেন। স্পষ্ট মনে। পড়ছে তার ছবি। এরপরই এসেছিলেন আর এক অভিজাত বংশের সন্তান-ঠাকুরপাড়ার মিঞা।
–আদাব গগা ডাক্তার।
–আদাব আদাব, বসুন। কী ব্যাপার?
এককালে মিঞা সাহেবেরা ছিলেন এ অঞ্চলের অধিপতি–নবাব। খেতাব ছিল ঠাকুর। তারা নাকি যোগী বংশ। মুসলমান সমাজের গুরু। কিন্তু পরবর্তীকালে সম্পদে বৈভবে বিলাসে। হয়েছিলেন ভ্ৰষ্ট। তখন সর্বস্বান্ত। শুধু তাই নয়—বংশধারা পর্যন্ত ব্যাধিগ্রস্ত হয়েছিল।
একটু চুপ করে থেকে মৃদুস্বরে মিঞা বলেছিলেন—গায়ে যে চাকা-চাকা দাগ দেখা দিচ্ছে। মশায়। পিঠে জানতে—এই দেখেন পায়ের ডিমিতে একটা হয়েছে।
পাজামাটা তুলে দেখালেন মিঞা সাহেব।
–হুঁ! সাড় আছে?
–উঁহুঁ।
ডাক্তার মুখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকান। চোখে পড়ে—কানের পেটি নাকের ডগা ঈষৎ লাল হয়েছে। বংশের অভিশাপ! সেই ব্যাধি! তাতেই মৃত্যু হয়েছে কয়েকজনের। দুজন এখনও ভুগছেন।
–ডাক্তার!
–বলুন ঠাকুরসাহেব।
—বলেন?
–কী বলব? বংশের রোগ বলেই মনে হচ্ছে। আপনি সময় থেকে চিকিৎসা করান। আমাদের এখানে ওষুধ নাই। তৈরি করতে অনেক খরচ। আপনি কলকাতা থেকে ওষুধ আনিয়ে। ব্যবহার করুন।
—তাই লিখে দেন ডাক্তার।
উঠলেন মিঞা সাহেব।
ড়ুলি করে এসেছেন নারায়ণপুরের ভটচাজ মশায়। বহুমূত্র হয়েছে। বহুমূত্র, বাত, নবজ্বর, পুরনো জ্বর, গ্ৰহণী, অতিসার। প্ৰহ্লাদ বাণী এসেছে। দুর্ধর্ষ লাঠিয়াল। ডাকাত। জেলখাটা আসামি।
—কী রে, তোর আবার কী?
–আর কী ডাক্তারবাবু–জল-ঘা।
–আবার? জল-ঘা অর্থাৎ উপদংশ। এবার বোধহয় প্রহাদের পঞ্চমবার।
মাথা চুলকে প্ৰহ্লাদ বলে—যে গরু অখাদ্যি খায়, সে কি ভুলতে পারে মশায়?
হাসলেন ডাক্তার।
নবগ্রামের বড়কর্তার বাড়ি যেতে হবে, ডাক আছে। তার ছোট ছেলের চতুর্থবার প্রমেহ দেখা দিয়েছে।
তাঁর বাবার কথা মনে পড়ত। তিনি বলতেন জীবনে আয়ু আর পরমায়ু কথা দুটো শুধু কথার মারপ্যাচ নয় বাবা। ওর অর্থ হল নিগৃঢ়। দীর্ঘ আয়ু হলেই পরমায়ু হয় না, আর আয়ু স্বল্প হলেই সেটা পরমায়ু হয় না এমন নয়। যার জীবন পবিত্র পরমানন্দময়, পরমায়ু হল তার। নইলে বাবা শক্তি চর্চা করেও মানুষ দীর্ঘায়ু হয়। রোগকে সহ্য করে, এমনকি জয় করে।
কথাটা তিনি এই প্রহ্লাদ সম্পর্কেই বলেছিলেন। প্রথমবার উপদংশের আক্রমণে প্রহ্লাদ চিকিৎসা করায় নি। এটা ওটা মলম ব্যবহার করেছিল। দ্বিতীয়বার এসেছিল জগৎ মশায়ের কাছে। সেই উপলক্ষেই বলেছিলেন। প্রহ্লাদ সেবার বলেছিল—লোকে দেখাতে বলছে, তাই। নইলে–ও আপুনিই ভাল হয়।
