হাত জোড় করে জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন–নমঃ বিবস্বতে ব্ৰহ্মণভাস্বতে বিষ্ণুর্তেজসে জগৎসবিত্রে সূচয়ে সবিত্রে কর্মদায়িনে—নমঃ!
মৃত্যুধ্রুব এই পৃথিবীতে এত চঞ্চল হলে চলবে কেন?
মুখহাত ধুয়ে চা খেতে বসলেন। তামাক সেজে দিয়ে নন্দ কোটি বাড়িয়ে ধরল। বললে–আজকে আট-দশ জন রুগী এসেছে।
হুঁকোয় টান দিয়ে মশায় বললেন– নবগ্রামের কেউ এসেছে? গণেশ ভটচাজ?
—না তো।
–হুঁ। মশায় ক্ষুণ্ণ হলেন একটু। কাল রাত্রি বারটা পর্যন্ত তিনি গণেশের জন্য বসে ছিলেন, ওই প্রদ্যোত ডাক্তারের রূঢ় কথা শুনে এলেন, আর আজ একটা খবরও দিলে না? বেশ বুঝলেন—মেয়ে ভাল আছে। উৎকণ্ঠা কমে গিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ভুলে গিয়েছে। একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন তিনি।
নন্দ বললে—চেঁচামেচি করছে সেই বামুন, দাঁতুঠাকুর।
–কেন? কাল তো তাকে এক সপ্তাহের ওষুধ দিয়েছি?
—সে আবার এসেছে। গাঁজা না খেয়ে তার ঘুম হয় নাই। বলছে হয় গাঁজা খেতে বলুক, নয় ঘুমের ওষুধ দিক। এসে থেকে চেঁচাচ্ছে।
—চেঁচাক। পরান খাঁ এসেছে?
–না। এখনও আসে নাই। এইবার আসবে। বার কয়েক হুঁকোয় টান দিয়ে হুঁকোটা নর হাতে দিয়ে মশায় উঠে দাঁড়ালেন, বললেন– রোগীদিকে বসতে বলবি। আমি এখন যাব-—একবার মহাপীঠে মহন্তকে দেখতে।
নন্দ মাথা চলুকে বললে—তা ওদিকে একবার দেখে ওষুধপাতি লিখে দিয়ে গেলেই তো হত। পরান খাঁ গাড়ি নিয়ে আসবে, সেই গাড়িতেই পথে গোঁসাইকে দেখে আসতেন।
মশায় জবাব দিলেন না। শুধু ফতুয়াটা গায়ে দিয়ে পকেটে স্টেথোসকোপটা পুরে পুরনো জুতো জোড়াটা পরতে লাগলেন। নন্দ গজগজ করতে করতে বেরিয়ে গেল—যত বেগারের কাজ; সক্কালে বিনি পয়সায় রুগী দেখা! এমন করলে রুগী আসবে কেন? হুঁ। এই করেই এমন হয়। সেই মিত্তিরিবাবু বলে গিয়েছিল—মহাশয় লোকের কথা—সে কি মিছে হয়?
মোয় হাসলেন। মনে পড়েছে। প্রৌঢ় জমিদার গৌরহরি মিত্তিরের কথা বলছে নন্দ। নন্দ ছিল তখন সেখানে, শুনেছিল।
***
আরোগ্য-নিকেতনে তখন সে কী ভিড়! চল্লিশ পঞ্চাশ ষাট জন রোগী!
জগৎ মশায়ের মৃত্যুর পর আরোগ্য-নিকেতনের দৈন্যদশা এসেছিল। সে দৈন্যদশাকে জীবন দত্ত তখন কাটিয়ে আবার সমৃদ্ধি ফিরিয়ে এনেছেন। রঙলাল ডাক্তারের কাছে শিক্ষা শেষ করে তখন তিনি অ্যালোপ্যাথি, কবিরাজি, মুষ্টিযোগ—তিন ধারার ওষুধ নিয়ে চিকিৎসা করেন। গুরু রঙলাল রহস্য করে বলেছিলেন-ট্রাইসিকেলে চেপে চল তুমি। সে ট্রাইসিকল তার ভাগ্যগুণে এখনকার মোটরগানো তিন চাকার ভ্যান হয়ে উঠেছিল।
আরোগ্য-নিকেতন নাম তখন হয়েছে। তিন-তিন জন লোক খাটত। অ্যালোপ্যাথি ওষুধের কম্পাউন্ডার ছিল শশী। শশী বলত রম্রম্ প্র্যাকটিস।
মদ খেলে বলতে–জীবন মশায়ের প্র্যাকটিস—শা–; পানসী রে বাবা, পানসীর মত চলছে-সন্ সন্ সন্ সন্।
মদ হতভাগা অল্প বয়স থেকেই খায়। নবগ্রামের বামুনবাড়ির ছেলে। ওর দৌরাত্ম্যে ভাইনাম গ্যালাসিয়া, মৃতসঞ্জীবনী লুকিয়ে রাখতে হত। কোনোক্রমে পেলেই বোতলে মুখ লাগিয়ে খেয়ে নিত খানিকটা। বলত–রঙলাল দি সেকেন্ড।
জীবন মশায়ের আকাঙ্ক্ষার কথা না জেনেই বলত।
বাড়িয়ে বলত। সে আকাঙ্ক্ষা তাঁর পূর্ণ হয় নি। রঙলাল ডাক্তারের স্থান পূর্ণ করবার সাধ্য বা ভাগ্য তার নয়; রঙলালের স্থান পূর্ণ হয় না। তবুও কতকটা পূর্ণ করেছিলেন-কীর্নাহারের নবীন ডাক্তার। সদর শহরে অবশ্য তখন একজন প্রতিভাবান ডাক্তার এসেছেন; গোকুল ডাক্তার। মেডিক্যাল কলেজের সোনার মেডেল পাওয়া ছাত্র। আশ্চর্য মানুষের ভাগ্য, এমন ডাক্তারেরও শেষ পর্যন্ত দুর্নাম হয়েছিল। লোকে বলত গোকুল ডাক্তার ছুঁলে রোগী বাঁচে না। গোকুল ডাক্তারও তাঁকে সম্মান করতেন। নাড়িতে কী পেলেন—সে কথা জিজ্ঞাসা করে মন দিয়ে শুনতেন।
নবগ্রাম অঞ্চলে তখন তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
জগৎ মশায়ের মৃত্যুর পর এখানে তিন জন ডাক্তার এসে বসেছিল। দুর্গাদাস কুণ্ডু প্রথম পাসকরা ডাক্তার। দুর্গাদাস তাকে উপহাস করে বলত ঘাসপাতা জড়িবুটির চিকিৎসক।
তারপর হরিশ ডাক্তার। হরিশ তাকে মানত। কিশোরের অসুখের সময় ডায়াগনোসিসে তার কাছে ঠকে তার শিক্ষা হয়েছিল।
আর এসেছিল এক পাগল। খেতু বাড়ুরী। সে নিজে বলতকে. এম. ব্রারোরী, হোমিওপ্যাথ। ভাল লোক, সরল লোক, কিন্তু পাগল। চুরোট খেত, চায়না-কোট পরত। বলত ওদিকে হরিশ ডাক্তার, এদিকে আমি, মাঝখানে দত্তটা চাপা পড়ে মারা গেল। ওকে আর কেউ ডাকবে? নাড়ি দেখে কেমন আছে—এর জন্যে ওকে কে ডাকবে? ফুঃ!
দুর্গাগাস কুণ্ডু সর্বপ্রথম এসেছিল—চলেও গিয়েছিল সর্বপ্রথম। বলে গিয়েছিল—জানতাম না এটা গরুভেড়ার দেশ। ঘাসপাতা জড়িবুটিতে এদের অসুখ সারে। অ্যালোপ্যাথি বিলিতি ওষুধ খাটে না।
এরপর বাড়ুরীও পালাল। ছিল শুধু হরিশ। নবগ্রামের ব্রজলালবাবু চ্যারিটেবল ডিসপেনসারি স্থাপন করলেন, সেখানে চাকরি পেয়ে থাকতে পেরেছিল। মাইনে ছিল তিরিশ টাকা।
জীবন দত্ত তখনই হলেন মশায়। আয় কত মনে নাই। হিসেব নাই। দিনরাত্রিতে বিশ্রাম ছিল না। আরোগ্য-নিকেতনে রোগী দেখতে বেলা তিনটে বেজে যেত।
হিন্দু, ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, শূদ্ৰ, মুসলমান, পুরনো মহুগ্রামের খয়েরা, পশ্চিম পাড়ার শেখেরা, ব্যাপারিপাড়ার ব্যাপারিরা, মীরপাড়ার মিয়ারাও এসেছেন গরুর গাড়ি করে। ড়ুলি এসেছে, গাড়ি এসেছে, পালকি এসেছে। সেদিন পাঁচ ক্ৰোশ উত্তর থেকে এসেছিলেন সম্ভ্রান্ত কায়স্থ বংশের এই গৌরহরী মিত্র মহাশয়। খোলা দরজার ভিতর দিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে পালকিতেই শুয়ে ছিলেন।
