–আপনি প্রসবের জন্য কোনো ওষুধ দিয়েছেন?
—গুড। আপনি কি অপেক্ষা করবেন?
–হ্যাঁ। একটু থাকি। হাসলেন মশায়।
–আচ্ছা। বসুন ওই চেয়ারটায়। নাড়ি দেখে কিছু বলেছেন নাকি?
–নাড়ি দেখেছি। কিন্তু—
ঘরের মধ্যে অবরুদ্ধ যন্ত্রণায় জান্তব গোঙানির মত গোঙানি উঠল।
—ডাক্তারবাবু! মিস দাসের কণ্ঠস্বর।
প্রদ্যোত ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল। জীবনমশায় শ্রাবণের মেঘাচ্ছন্ন আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েই রইলেন। একটা অস্বস্তি বোধ করছেন তিনি। কেন তিনি এলেন? ওদের ইচ্ছে প্রসবের পর তিনি একবার নাড়ি দেখেন। কিন্তু প্রসব হতে গিয়েই যদি
—বসুন মশায়। বললে হরিহর কম্পাউন্ডার। হরিহর গরম জল, তুলো, পরিষ্কার ন্যাকড়া ইত্যাদি নিয়ে যাচ্ছে পাশের ঘরে।
–বেশ আছি হে। হাসলেন মশায়। মেয়েটির বয়স হয়েছে। প্রায় তিরিশ। চিন্তা হচ্ছে তাঁর।
চমকে উঠলেন মশায়। মেয়েটি আবার যন্ত্রণায় গুঙিয়ে উঠেছে। সঙ্গে সঙ্গে—আরও কিছু। হ্যাঁ ঠিক। নবজাতকের প্রথম কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। জয় পরমাপ্রকৃতি! জয় গোবিন্দ।
—হরিহরবাবু, গরম জল। তুলো। প্রদ্যোত ডাক্তারের ধীর কণ্ঠস্বর শোনা গেল। আশ্চর্য ধীর এবং শান্ত এবং গম্ভীর।
***
তোয়ালেতে হাত মুছতে মুছতে ডাক্তার বেরিয়ে এলেন। মেয়েটির বাবা বললে–ডাক্তারবাবু!
—সেফ ডেলিভারি হয়েছে। খোকা হয়েছে।
–নীহারের জ্ঞান হয়েছে?
–না।
–হয় নি?
–না। আজ বাড়ি যান। যা করবার আমি করব। এখানে থেকে গোলমাল করলে কোনো উপকার হবে না। যান, বাড়ি যান। আপনিও বসে আছেন? মাফ করবেন, এখন নাড়িটাড়ি। দেখতে দেব না আমি। কিছু মনে করবেন না যেন। আমার জ্ঞানমত নাড়ি ভালই আছে, এই পর্যন্ত বলতে পারি।
ডাক্তার চলে গেলেন নিজের বাসায়।
—মঞ্জু!
–চা ছাঁকছি।
—মেনি থ্যাংকস, মেনি মেনি থ্যাংকস, জলদি আন–চা খেয়ে গিয়ে দরকার হলে আবার ইনজেকশন দেব।
–কেস কি?
–নট গুড, আবার খারাপও নয় খুব। বাট শি মাস্ট লিভ, বাঁচাতে হবে।
চায়ে চুমুক দিয়ে বললে—প্রথমটা আমার কিন্তু ভারি রাগ হয়ে গেছল। দ্যাট ও ম্যান, ফেমাস মহাশয় অব্ দি প্লেস–সে সঙ্গে এসেছিল।
—কোনো খারাপ কথা বল নি তো?
–না। তবে এখন ওরা চাইছিল—মশায় একবার নাড়ি দেখে। আমি বলে দিয়েছি, না–তা আমি দেব না।
—ওঁকে চা খেতে ডাকলে না কেন?
—ডাকা উচিত ছিল, না?
–নিশ্চয় ছিল।
চায়ের কাপ নামিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে প্রদ্যোত আবার হাসপাতালের দিকে চলল। আর একটা ইনজেকশন দিতে হবে। মশায় চলে গেছেন। একটু অন্যায় হয়ে গেল। টং টং শব্দে ঘড়ি বাজছে। রাত্রি বারটা। রোগীর ঘর থেকে মৃদু যন্ত্রণার শব্দ শোনা যাচ্ছে। যন্ত্রণা কমে এসেছে। শি মাস্ট লিভ; বাঁচাতে হবে মেয়েটাকে। হরিহর বেরিয়ে এল।
–কেমন আছে এখন?
–ভালই মনে হচ্ছে।
–ভালই থাকবে। ইনজেকশন বের করুন।
ডাক্তার সিরিঞ্জটা উঁচু করে আলোর সামনে ধরলেন। আবার যেন ফটকটা খুলল? কে এল আবার?
এগিয়ে গেল হরিহর। রনবাবুর লোক।
–কী, হিক্কা খুব বেড়েছে?
–আজ্ঞে না। সেই শহর থেকে রেপোর্ট এসেছে, তাই বুড়োবাবু বললেন– ডাক্তারবাবু যদি জেগে থাকেন তো দিয়ে আয়।
বিপিনবাবুর ইউরিন রিপোর্ট।
—হিক্কা কেমন আছে?
–তেমনিই আছে। একটুকু কম বলে লাগছে।
একটা ক্লিনিক যদি এখানে থাকে! এক্স-রেইলেকট্রিসিটি না হলে উপায় নাই। ময়ূরাক্ষী স্কিম হতে আরও কয়েক বছর লাগবে। তার আগে সে আর হবে না। কিন্তু একটা ক্লিনিক। কত লোক যে বাঁচে! আজ কি এই মেয়েটাই বাচত? হাসপাতাল যন্ত্রপাতি—এসব না থাকলে এ মেয়েটাও আজ মরত।
জীবনমশায় হাত দেখে ঘাড় নেড়ে বলত-কী করবে? এ কার হাত? তোমার, না–আমার?
১৮. জীবন দত্ত ডাকে গেলে
জীবন দত্ত ডাকে গেলে আতর-বউ ঘুম পেলে ঘুমকে বলেন-চোখের পাতায় অপেক্ষা কর, এখন চোখে নেমো না। সে আসুক, তারপর। শুয়ে শুয়েও জোর করে জেগে থাকেন। চোখের পাতা ঢুলে নেমে আসে, আতর-বউ জোর করে চোখ মেলেন,পাশ ফেরেন, রাধাগোবিন্দ বলে। ইষ্টনাম করেন; বেশি ঘুম পেলে উঠে বসে পানদোক্তা খান—মধ্যে মধ্যে নন্দকে তিরস্কার করেন; নন্দকে নয়, মন্দর নাকডাকাকে বলেন, নাক মানুষের ডাকে; কিন্তু তাই বলে এমনি করে। ডাকে? শিঙের ডাক হার মানে! শুধু শিঙের ডাক? মনে হচ্ছে কেউ যেন করাত দিয়ে দরজা কাটছে! নন্দ, অ-নন্দ। শুনছি, একটু কম করে নাক ডাকা বাপু। পাশ ফিরে শো।
জীবন দত্ত এলেই এসব সমস্যার সমাধান হয়। তিনি কোনোদিন জিজ্ঞাসা করেন—কেমন। দেখে এলে গো? কোনোদিন কোনো প্রশ্ন করেন না, নিশ্চিন্ত হয়ে শুয়ে পড়েন এবং আধ মিনিটের মধ্যেই তাঁর নিজের নাক ডাকতে শুরু করে।
নন্দ উঠে হাতমুখ ধোবার জল দেয়, হাতমুখ ধুয়ে ইষ্ট স্মরণে বসেন, তারপর খাবারের ঢাকা খুলে খেতে বসেন। নন্দ তামাক সাজে, হুঁকো-কন্ধে হাতে দিয়ে নন্দও গিয়ে শুয়ে পড়ে; খেয়ে উঠে মশায় তামাক খান—আর ভাবেন। রোগের কথা। কোনোদিন মৃত্যুর কথা। যেদিন রোগী মারা যায়—সেদিন ফিরে এসে চিকিৎসাপদ্ধতির কথাটা ভেবে দেখেন, ত্ৰুটি মনে হলে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেন; না-হলে মৃত্যুর কথাই ভাবেন। তারপর গোবিন্দ স্মরণ করে শুয়ে পড়েন। যেদিন ডাক থাকে না, সেতাবের সঙ্গে দাবা খেলে কাটে, সেদিন ভাবেন-দাবার চালের কথা। একটার আগে কোনোদিন ঘুমানো হয় না। আজ বাজে বোধহয় দুটো—আড়াইটে।
***
পরদিন ঘুম ভাঙতে দেরি হল।
প্রথমেই মনে হল—গণেশ ভটচাজের মেয়েটির কথা। কেমন আছে? ডাকতে গেলেন। নন্দকে জিজ্ঞাসা করবেন গণেশ ভটচাজের বাড়ির কেউ এসেছে কি না। কিন্তু পরক্ষণেই সাধারণের চেয়ে আয়তনে বড় তার মাথাটি বার বার নানা বলে যেন দুলে উঠল। এবং গম্ভীর কণ্ঠে ডেকে উঠলেন–জয় গোবিন্দ পরমানন্দ।
