ডাক্তার একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে আবার বাইরে এসে বসল। ডাকলে—মঞ্জু মঞ্জু! ডাক্তারের স্ত্রী মঞ্জ, মঞ্জুলা।
মঞ্জ রান্নাঘরে রয়েছে। রান্নার লোকটা কিছুই জানে না। এটা যাকে বলে খাঁটি গাইয়ার দেশ। শাক শুকতো চচ্চড়ি, ঘোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি হোড়, এ ছাড়া কিছু জানে না। আর জানে খেড়ো নামক একটি বস্তু-কাঁচা তরমুজের তরকারি, আর কড়াইয়ের দাল আর টক। অম্বলকে বলে টক। এবং কাঁচা মাছে অম্বল বাঁধে। বড় বড় মাছের মাথা অম্বলে দিয়ে খায়। ভাল রান্না মানে তেলমসলার শ্রাদ্ধ। ডিসপেপসিয়া রোগটি জন্মানোর জন্যে উৎকৃষ্ট সার দিয়ে জমি প্রস্তুত করা। ডাক্তারের রুচি আধুনিক সুপ, সিদ্ধ, সালাদ। এখানকার ওই গ্রাম্য লোকটি আজও পর্যন্ত নামগুলো আয়ত্ত করতে পারে নি। অগত্যা মঞ্জু দাঁড়িয়ে থেকে দেখিয়ে দেয়। তা। ছাড়া একটি কোর্স সে নিজে হাতে রান্না করে নেয়। ওটা মঞ্জুর শখ।
—মঞ্জু! আবার ডাকলে প্ৰদ্যোত।
–আসছি। এবার সাড়া দিলে মঞ্জু।
দীর্ঘাঙ্গী তরুণীটির শ্ৰীটুকু বড় মধুর এবং কোমল, এর ওপরে ওর বর্ণটার মধ্যে একটা দীপ্তি আছে যা সচরাচর নয়, সাধারণ নয়। চোখ জুড়িয়ে যায়, মোহ জাগে মঞ্জুকে দেখে। প্রাণচঞ্চলা আধুনিকা মেয়ে মঞ্জু। গান গাইতে পারে, আই. এ পর্যন্ত পড়েছে; বাইসিক্ল চড়তে শিখিয়েছে ডাক্তার, বন্দুক ছুঁড়তে শিখিয়েছে।
—কী বলছ? আমার রান্না পুড়ে যাবে।
–কী রাঁধছ?
–টক। হাসতে লাগল মঞ্জু। কাঁচা মাছের টক। আমার ভারি ভাল লাগে। আগে বুড়ি দিদিমা বলত—আমরা আসতাম। কিন্তু সত্যি চমৎকার সরষে ফোড়ন দিয়ে আর কাঁচা তেল ছড়িয়ে।
—বোসো তুমি এখানে। একা ভাল লাগছে না। গানটান গাও। মনটা বড় খারাপ হয়ে আছে। ওদের ছেলেটা এমন হঠাৎ মরে গেল–।
—রাঁধুনীটা বলছিল।
–কী বলছিল? ডাক্তার আবার তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।
–বলছিল—সঁচজনে বলছে পাঁচ রকম।
–তবু ভাল, পাঁচজনে পঞ্চাশ রকম বলে নি। হাসলে প্রদ্যোত।
–তুমি কি সকালে বলে এসেছিলে কাল পথ্য দেবে?
–হ্যাঁ, কেন?
—ওই কথাটাই বেশি বলছে লোকে। তাতে চারুবাবু বলেছেন শুনলামওরে বাবা, মৃত্যুর কথা কি কেউ বলতে পারে? ওর ওপরে ডাক্তারের হাত নেই।
ডাক্তার একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললে, মেঘাচ্ছন্ন আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। নিচ্ছিদ্র মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। পৃথিবীর উপরে একটা ছায়া ফেলেছে এই রাত্রিকালেও।
চকিত একটু বিদ্যুতাভাস খেলে গেল সীমাহীন মেঘাচ্ছন্ন আকাশে। মৃদুগম্ভীর গর্জনে মেঘ ডেকে উঠল দূরে অনেক দূরে। ডাক্তার মৃদুস্বরে বললে–শ্রাবণরাত্রির একটা গান গাও।
—আসছি আমি। ওকে বলে আসি-অম্বলটা ওই নামাবে।
–যাক পুড়ে যাক। না নামায় তো কাল ওটাকে দূর করে দিয়ো।
মঞ্জু মৃদু গুনগুনানি সুরে ধরলে–
এসো শ্যামল সুন্দর।
আনো তব তাপহরা তৃষাহরা সঙ্গসুধা।
বিরহিণী চাহিয়া আছে আকাশে।
ডাক্তার চোখ বুজলে। সত্যি বৃষ্টি হলে দেশটা জুড়োয়। প্রাণটা বাঁচে। গান শেষ করে মঞ্জু উঠল, বললে—আমি আসছি। ততক্ষণ রেডিও খুলে দিয়ে যাই। রবীন্দ্রসঙ্গীত আছে। মন তার এখনও পড়ে আছে রান্নাশালে। ছ্যাঁক করে সম্বরা দিতে তার ভারি ভাল লাগে। ডাক্তার চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইল। তা হলে চারুবাবু তার বিরুদ্ধ সমালোচনা করেন নি; প্রৌঢ় মোটের ওপর লোক ভাল।
রেডিওতে যন্ত্রসঙ্গীত বাজছে। গীটার। সুরটা কাঁপছে, কাঁদছে।।
চারুবাবু কিন্তু ডিফিটেড সোলজার। হার মেনেছেন ভদ্রলোক। যাকে সাধু বাংলায় বলে আত্মসমর্পণ করেছেন। সারেন্ডার করেছেন। মৃত্যুর কথা কেউ বলতে পারে না। ওর ওপর ডাক্তারের হাত নাই।
আছে। হাত আছে। এখানে যদি একটা ক্লিনিক থাকত। গোড়াতেই যদি ব্লাড কালচার করে নেওয়া যেত। এবং ওষুধ যদি খাঁটি হত। কে বলতে পারে বাচত না ছেলেটা?
রেডিওতে গান বেজে উঠল—মরণ রে তুহু মম শ্যামসমান। ডাক্তার ভ্রূ কুঞ্চিত করে উঠে গিয়ে রেডিওটা বন্ধ করে দিলে।
কম্পাউন্ডের ফটকটায় হর্নের শব্দ উঠল। সাইকেল রিকশার হর্ন। কে এল? কেন? কল? ডাক্তার উঠে দাঁড়াল। ঘরের মধ্যে থেকে ছোট স্টোভল্যাম্পটা বের করে নিয়ে এল। দুটো রিকশা। একটি রিকশায় একটি তরুণী, অজ্ঞান অবস্থা বলে মনে হচ্ছে। এ গাঁয়ের দাইটা তাকে জড়িয়ে ধরে আছে। সর্বাঙ্গ কাপড় দিয়ে ঢাকা। মাথাটা দাইয়ের কাঁধের উপর ঢলে পড়েছে। অব্যক্ত যন্ত্রণায় মধ্যে মধ্যে নীল হয়ে যাচ্ছে, বিকৃত হচ্ছে। কাপড়খানার নিচের দিকে রক্তের দাগ। ডেলিভারি কেস। বোধ করি প্রথম সন্তান আসছে। ডাক্তারের আলোটা হাতে নেমে পড়ল। ডাকলে হরিহরবাবু! মিস দাস!
কম্পাউন্ডার আর মিডওয়াইফ। কিন্তু ও কে? পিছনের রিকশায়?
স্থূলকায় বৃদ্ধ? জীবনমশায়?
জীবনমশায় শশীকে পৌঁছুতে গিয়েছিলেন। শশীর প্রতিবেশী গণেশ ভটচাজের প্রথম সন্তানসম্ভবা কন্যা তখন সূতিকাগারে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে। জীবন মশায়কে পেয়ে তারা তাকে ছাড়ে নি। জীবনমশায় এক্ষেত্রে কী করবেন? তবু তারা মানে নি। বলেছিল-হাতটা দেখুন।
–হাত দেখে কী করব? আগে তো প্রসব করানো দরকার। যারা প্রসব করাতে পারে। তাদের ডাক। নয়তো হাসপাতালে নিয়ে যাও।
তাই নিয়ে এসেছে। কিন্তু জীবন মশায়কে ছাড়ে নি।
—আপনি থাকুন মশায়! কণ্ঠস্বরে মেয়ের বাপের সে কী আকুতি!
মশায় উপেক্ষা করতে পারেন নি।
শার্টের আস্তিন গুটিয়ে যথানিয়মে হাত ধুয়ে, বীজাণুনাশক লোশন মেখে ডাক্তার তৈরি হয়ে ঘরে ঢুকতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল।
