–উঁহুঁ! বুড়ো সেরে উঠবে এ আমি বলে দিলাম। কুড়ো বাউরির মেয়েটার নিউমোনিয়ায় কেরোসিনের মালিশ দিলে সবাই আপনারা গাল দিয়েছিলেন কিন্তু সেরে তো গিয়েছিল।
ডাক্তার ধমক দিয়ে বললেন– শশী, এ সব পাগলামি ছাড়। শেষ পর্যন্ত বিপদে পড়বি।
–আমি পাগল?
–হ্যাঁ, তুই পাগল। আমার আর কোনো সন্দেহ নাই।
একটু চুপ করে থেকে শশী বললে—তা বেশ। পাগলই হলাম আমি। তা বেশ। আবার খানিকটা চুপ করে থেকে বললে—কাল কিন্তু রামহরিকে দেখতে যেতে হবে। আমি কল দিয়ে রাখলাম।
রামহরির কী হল?
—সে সাত-দুগুণে চোদ্দখানা ব্যাপার। এবার যাবে।
—যাবে তো আমাকে টানাটানি কেন? যাক না। এ বয়সে গেলেই তো খালাস। না, যেতে চায় না কামারবুড়ির মত! তা রামহরির এ ইচ্ছে স্বাভাবিক। আবার যেন মালাচন্দন করেছে এই বয়সে!
হ্যাঁ। বছর পঁচিশেক বয়স মেয়েটার। কিন্তু রামহরি বাচবার আশায় আপনাকে ডাকছে। না। ডাকছে নিদান দিতে হবে, বলে দিতে হবে জ্ঞানগঙ্গা যেতে পারে কি না। বড় ইচ্ছে জ্ঞানগঙ্গা যায় উদ্ধারণপুর কি কাটোয়া। জ্ঞানগঙ্গা গিয়ে বেশিদিন বলে তো মুশকিল। কন্ট্রোলের বাজার এ জেলার চাল ও জেলায় যাবার হুকুম নাই। কিনে খেতে গেলে অনেক টাকা লাগবে।
বকবক করে বলেই চলল শশী।
—চোরের রাজ্য বুঝেছেন, সব চোর। আপাদমস্তক চোর। রাজা চোর, রানী চোর, কোটাল চোর,সব চোর। আমি চোর, তুমি চোর—সব চোর। চালের দর ষোল টাকা? তাও এ জেলায় ষোল তো ও জেলায় ছাব্বিশ, আর দুপা ছাড়াও ছত্রিশ—আর এক পা ওদিকে চল্লিশ।
মশায় ঠিক কথাগুলি শুনছিলেন না। তিনি ভাবছিলেন। ভাবছিলেন রামহরির কথা। শশী আপন মনেই বকে চলেছিল। হঠাৎ একবার থেমে আবার আরম্ভ করলে। এবার কথার সুর আলাদা। দেশের সমালোচনা বন্ধ করে অকস্মাৎ সরস রসিকতায় সুরসিক হয়ে উঠল শশী। বললে—রামহরি জ্ঞানগঙ্গা যাবে কিন্তু বেহিসেবি কাণ্ড করে তো যাবে না, কদিন বাঁচবে–আপনাকে বলে দিতে হবে; সেই হিসেব করে চাল ডাল বেঁধে নিয়ে যাবে। বলে, ঠাকুর, তোমার কী বল? দশ দিন বেশি বাঁচলে চাল কম পড়বে। তখন নগদ দামে কিনতে হবে। পাঁচ দিন। কম বাঁচলে চাল বাড়বে। সে চাল ঘরে ফিরে নিতে নাই, বেচে দিতে হবে। সেসব তো আমার হাত দিয়ে হবে না। তবে পরের হাত দিয়ে। পাঁচভূতে সব তচনচ করে দেবে আমার। বুঝুন ব্যাপারটারামহরি যে হিসেব নেবে তার উপায় থাকবে না। ব্যাটা বলে—তাতে আমার স্বর্গে। গিয়েও শান্তি হবে না। আমি বলি–স্বর্গে যাওয়াই হবে না তোর। রথে চড়ে বলবিরোখো রোখো! আমি নাম। রথ ফিরিয়ে দিয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দেখবি। মহা মুশকিল। গঙ্গাতীরে মৃত্যুভূত হবারও উপায় থাকবে না, সে হলে সান্ত্বনা থাকত রামহরির ঘাড় ভাঙতে পারত। পিছু পিছু গিয়ে খোনা স্বরে বলতে পারত-পেঁ—অ্যাঁমার টাকা ফিরে পেঁ।
হি-হি করে হাসতে লাগল শশী।
শ্রাবণের অন্ধকার রাত্রির মধ্যে দুজনে পথ হাঁটছিলেন।
বৃদ্ধ জীবন মশায় আপনার মনে রামহরির কথা ভাবছিলেন। এমনটা কী করে হল? কেমন। করে হয়? জ্ঞানগঙ্গা যেতে চায় রামহরি? বিনা ভাবনায়, বিনা কামনায় বৈরাগ্যযোগ—মুক্তিপিপাসা কি জাগে? আমি মরব এই কথা ভেবে প্রসন্নমনে সমস্ত কিছু পিছনে ফেলে অভিসারে চলার মত চলতে পারে? দীর্ঘকাল প্রতীক্ষার পর যুবতী বধূর স্বামী-সন্দর্শনে যাওয়ার কালে। বাপের-ঘরের-উঠানে-পাতা খেলাঘর ফেলে যাওয়ার মত যেতে পারে?
রামহরি প্রথম জীবনে ছিল ছিচকে চোর; তারপর হয়েছিল পাকা ধানচোর; বার দুয়েক জেল খাটার পর হঠাৎ রামহরির দেখা গেল ঘোরতর পরিবর্তন, রামহরি কপালে ফোটা তিলক কেটে। গলায় কষ্ঠীমালা পরে হয়ে উঠল ঘোরতর ধার্মিক। জীবিকা নির্বাহের জন্য ব্যবসা শুরু করলে। তরকারির ব্যবসা। চাষীর ক্ষেত থেকে তরকারি কিনে হাঁটে বাটে ঘুরতে লাগল অর্থাৎ ফড়ে হয়ে উঠল। মুখে রামহরি চিরকালই ফড়ে অর্থাৎ কথা সে বেশি চিরকালই বলত—এবার ব্যবসায়েও তাই হয়ে উঠল। লোকের বাড়ি ক্রিয়াকর্মে বরাত এবং বায়না নিয়ে তরকারি সরবরাহ করত। কিন্তু এর অন্তরালে ছিল তার আসল ব্যবসা। নদীর ধারে জঙ্গলের মধ্যে দস্তুরমত কবিরাজের মৃতসঞ্জীবনী চোলাইয়ের পাকা পদ্ধতিতে মদ তৈরি করত। জঙ্গলের মধ্যেই বোতল এবং টিনবন্দি করে পুঁতে রাখত। ওখানেই শেষ নয়, নদীর চরের পলিমাটিতে সে গাঁজার গাছ তৈরি করে গাঁজাও উৎপন্ন করত এবং তার কাটতিও ছিল প্রচুর। দেশটা তান্ত্রিকের দেশ ছিল—মন্ত্র হোক বা না হোক, জানুক বা না জানুক, লোকে কারণ করত। কপালে সিঁদুরের ফোঁটা, মুখে কালী-কালী, তারাতারা রব আর কারণকরণে শতকরা নিরেনব্বই জন ছিল সিদ্ধপুরুষ। সুতরাং হাজার দরুনে সিদ্ধপুরুষের প্রসাদে রামহরির লক্ষ্মীলাভের পথে সিংহদ্বার না হোক বেশ একটা প্রশস্ত ফটক খুলে গিয়েছিল। উদ্যোগী পুরুষ রামহরির সাহস ছিল অপার, নবগ্রামে থানার সামনের রাস্তা দিয়ে কুমড়ো-কাঁকুড়ের বোঝার তলায় অন্তত চার-পাঁচটা বোতল নিয়ে সে। সহাস্য মুখে চলে যেত এবং হাঁটে বসে তাই বিক্রি করত। কুমডোর মুখ কেটে ভিতরের শাস বীজ বের করে নিয়ে তার মধ্যে আনত গাঁজা। বাড়িতে দেব প্রতিষ্ঠা করেছিল সুপবিত্র নিম্ব কাষ্ঠের গৌরহরি। কিন্তু ঠাকুরটির বক্ষপঞ্জর ছিল কঁপা। দস্তুরমত মাথা খাঁটিয়ে বুক এবং পিঠের দুদিক দুখানি স্বতন্ত্র কাঠে গড়ে ভিতরে গর রেখে পাকা মিস্ত্রি দিয়ে এই দৈব গুদামটি সে তৈরি করিয়েছিল। এবং পিঠের দিকের কাঠের নিচে উপরে দুটি ঢাকনিযুক্ত মুখ রেখেছিল। উপরেরটি খুলে গাঁজা পুরত এবং প্রয়োজনমত বের করে তি। এরপর আর-এক ধাপ উপরে উঠে রামহরি রীতিমত দাসজী হয়ে উঠেছিল। তরকারির ব্যবসা তুলে দিয়ে মুদির দোকান এবং ধান কেনার ব্যবসা শুরু করে-ভেক নিয়ে দাস উপাধি নিয়ে গণ্যমান্য হয়ে উঠেছিল কয়েকখানা গ্রামের। মধ্যে। শুধু ভেকই নেয় নাই, নিজের স্বজাতীয়া স্ত্রী এবং পুত্রকে দূর করে দিয়ে একটি উচ্চবর্ণের বিধবাকে ঘরে এনে বৈষ্ণবী করেছিল। ক্ৰমে ক্ৰমে আরও বোধহয় দু-তিনটি। এদের জনদুই পৌঢ় বয়সে দারোয়ানীর মত ঘুঁটে কুড়িয়ে মরে পরিত্রাণ পেয়েছে। একজন পালিয়েছে। শেষেরটি অরুণী—সেইটিই এখন রামহরির সুয়োরানী।
