জীবন ডাক্তার কোমল স্বরেই বললেন––চণ্ডীতলায় সাধুবাবার অসুখ আতর-বউ।
ওই কথাতেই অনেক কিছু বলা হয়ে গেল। আতর-বউও মুহূর্তে নরম হয়ে গেলেন। তাই বা কেন? একেবারে অন্য মানুষ হয়ে গেলেন। বললেন–সাধু বাবার অসুখ? কী হয়েছে?
–কী হবে? সেই যা হয়। রক্তভেদ-পেটে যন্ত্ৰণা।
–এবার তা হলে বাবা দেহ রাখবেন। বয়স তো কম হল না।
–দেখি! বলে তো পাঠিয়েছেন–জীবনকে ডাকতলব আইল কি না দেখুক। দেখি! ভারী জুতোর শব্দে স্তব্ধ পল্লীপথের দুপাশের বাড়ির দেওয়ালে প্ৰতিধ্বনি তুলে বৃদ্ধ হস্তীর মত জীবন ডাক্তার চললেন গ্রাম পার হয়ে স্বল্প বিস্তৃতির একখানি মাঠ পার হয়ে নবগ্রামের। পূর্বপ্রান্তে ঘন জঙ্গলে ঘেরা দেবাশ্রমের দিকে। বর্ষার রাত্রি-অবশ্য অনাবৃষ্টির-বর্ষা—তবুও রাস্তা পিছল, একটু সাবধানেই পথ চলতে হচ্ছিল। আলো নিয়ে সাধুর অল্পবয়সী চেলাটি দ্রুতপদে চলেছে—ডাক্তার প্রায় অন্ধকারেই চলেছেন। তাতে ডাক্তারের অসুবিধে নাই। অন্ধকারে ঠাওর করে পথ চলা তার অভ্যাস আছে। কিন্তু সাধুর চেলার হাতের আলোটা দুলছে, অসুবিধে হচ্ছে তাতেই। মধ্যে মধ্যে চোখে এসে লাগছে। ডাক্তার বললেন–আলোটা এমন করে দুলিয়ো না হে ভোলানাথ। চোখে লাগছে। চল, চল, দাঁড়াতে হবে না। চল তুমি। আলোটা দুলিয়ো না।
—কে? মশায় নাকি?
সম্মুখের দেবস্থলের প্রবেশপথের ঠিক মুখ থেকে কে প্রশ্ন করলে। ঘন জঙ্গলের মধ্যে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। কণ্ঠস্বরটা চেনা। তবু জীবন দত্ত ধরতে পারলেন না। অন্যমনস্ক হয়ে সাধুর কথাই ভাবছিলেন তিনি। বহুকাল এখানে আছেন সাধু। অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
—রোগীকে আমি ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছি। হাসতে লাগল সে।
–শশী! চমকে উঠলেন ডাক্তার।–কী দিয়ে ঘুম পাড়ালি?
পাগলা শশী হাসতে লাগল—অসুখের চিকিৎসা আসুরিক।
–কিন্তু তোকে খবর দিলে কে?
—এসে পড়লাম হঠাৎ। গিয়েছিলাম গলাইচণ্ডী, রামহরি লেটকে দেখতে। বেটার খুব অসুখ। দুপুরবেলা আপনাকে কল দিতে গিয়েছিলাম, কিন্তু ওই মতির মায়ের নিদানের কথা বলতে গিয়ে ভুলেই গেলাম। বউ-ঠাকরুন বলেন নি আপনাকে? কাল একবার রামহরিকে দেখতে যেতে হবে মশায়।
—সে তো পরের কথা। কাল হবে। এখানকার খবর বল। কী চিকিৎসা করলি মহান্তের উৎকণ্ঠা অনুভব করছিলেন তিনি। শশীকে যে তিনি জানেন।
শশী বললে—আর কী! গলাইচণ্ডী থেকে ফিরবার পথে ঢুকলাম ভিজে শরীরটা ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল, আর কেমন ছমছম করছিল বুঝেছেন—তাই বলি মাকে একবার প্রণাম করি আর
শরীরটাকে তাড়া করে নি। বুড়োর কাছে একটান গাঁজা খেয়ে যাই।
–হুঁ, তারপর?
—দেখলাম বুড়ো পুঁকছে। রক্তদাস্ত হয়েছে। নাড়ি নাই। যাতনায় ছটফট করছে। শুনলাম তিন দিন গাঁজা খায় নাই। বললাম—যেতে তোমাকে হবে। তা গজা না খেয়ে যাবে কেন–একটানা গাঁজা খেয়ে নাও। তা বললে–না। তু বেটা বদমাশ শয়তান। আরে ওহি গাঁজা তো আমার মরণ আসবার পথ তৈয়ার করেছে। এক পাও পথ বাকি; সে আসুক নিজেই ওটুকু পথ তৈয়ার করে। আর গাঁজা কেন? আমি মশায়, এক ডোজ কানাবিসিন্ডিকা দিয়েছি। সঙ্গেই ছিল। আমি খাই তো। বাস–খেয়ে দু-তিন মিনিটের মধ্যে বুড়ো ঘুমিয়ে পড়ল। দেখুন, বোধহয় নাড়িও টিপটিপ করে উঠেছে। গাঁজা-খাওয়া ধাত তো। লেগে গিয়েছে।
হি-হি করে হাসতে লাগল পাগলা।
১৬. মিথ্যে বলে নি পাগলা
মিথ্যে বলে নি পাগলা। এক ডোজ ক্যানাবিসিন্ডিকাতে বৃদ্ধ সাধুর ঘুম এসেছে; ঘুম যখন এসেছে। তখন যন্ত্রণারও উপশম হয়েছে এবং নাড়ির স্পন্দন পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু বুঝতে কিছু পারা গেল না।
সাধুসন্ন্যাসীর ধাতু-প্রকৃতিও স্বতন্ত্র। সাধারণ মানুষের সঙ্গে অনেক প্রভেদ। জীবনে আচার এবং বিধিনিয়ম পালনের প্রভাব দেহের ওপর অমোঘ। দেহের সহনশক্তি আশ্চর্য ভাবে বেড়ে যায়। তেমনি আশ্চর্য ক্রিয়া করে ওষুধ। অকর্ষিত মৃত্তিকায় প্রথম চাষের বীজের মত। সুতরাং বলা তো যায় না। মৃত্যু সন্নিকটবর্তী হয়েও এদের প্রাণশক্তির কাছে হার মেনে ফিরে যায়। এমন অনেক ক্ষেত্রে দেখেছেন জীবন দত্ত। তাঁর বাবাও এ কথা তাকে বলে গেছেন। বলেছিলেন এদের নাড়ি দেখে সহজে নিদান হেঁকো না, বাবা। আগে জেনে নিয়ো—তাদের নিজের দেহরক্ষার অভিপ্রায় হয়েছে কি না। মানুষের অভিপ্রায় প্রচণ্ড কাজ করে, যে রোগী হতাশ হয়ে ভেঙে পড়ে তাকে বাঁচানো কঠিন হয়। সাধুদের হতাশা নাই, মনটি এদে। শক্ত। ইচ্ছাশক্তি প্রবল। এবং মৃত্যু বরণের অভিপ্ৰায় ওঁরাই করতে পারেন।
সাধু গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে। ডাক্তার বললেন–রাত্রিটা সজাগ থেকো ভোলানাথ। রাত্রে যদি ঘুম ভাঙে—তবে জল খেতে দিয়ে। আর কিছু না। আমি ভোরবেলা আসব।
শশী খুব হাসতে লাগল। আত্মপ্রসাদের আর অবধি নাই তার। ডাক্তার তাকে ডেকে সঙ্গে নিলেন।আয় একসঙ্গে যাই।
শশীও সঙ্গ ধরলে। বললে—চলুন রামহরির কেসটা বলে রাখি। কাল আপনাকে যেতেই হবে।
ডাক্তার বললেন– শশী, আজ যা করেছিস করেছিস, এমন কাজ আর করিস না।
–কী? বুড়োকে ক্যানাবিসিন্ডিকা দেওয়া?
–হ্যাঁ। অন্যায় করেছিল।
–অন্যায় করেছি তো বুড়ো সুস্থ হল কী করে?
–কী করে তা বলা শক্ত। গাঁজা খাওয়া অভ্যেস আছে, সেই গাঁজা না খাওয়ার জন্যেও একটা যন্ত্রণা ছিল রোগের যন্ত্রণার সঙ্গে—সেটা উপশম হয়েছে–তার ওপর মাদকের ক্রিয়া আছে। এখন ঘুম ভেঙে এর ফল হয়ত মারাত্মক হবে।
