সেই রামহরি সজ্ঞানে মৃত্যু কামনা করে গঙ্গাতীরে চলেছে? মুক্তি চায় সে? বিস্ময় লাগে। বৈকি!
শশী তামাক টেনে শেষ করে কোটা হাতে ধরে নিয়ে বললে-কাল চলুন একবার। আমি বেটাকে বলেছি, ফি পাঁচ টাকা লাগবে। ডাক্তারবাবু তো আর কলে যান না, তবু বলে-কয়ে রাজি করাব। তা তাতেই রাজি।
কথাটা ডাক্তারবাবুর কানে গেল না। তার মনোরথ চলেছিল ছুটে। পলকে যুগান্তর অতিক্রম করে পিছনের পরিক্রমা সেরে বর্তমানে এসে সেই মুহূর্তেই স্থির হল বোধ করি। তিনি হাসলেন।
শশী বললে–হাসছেন যে?
জীবন বললেন– নবগ্রামের কর্তাবাবুর চিকিৎসার জন্যে কলকাতা যাওয়া মনে আছে তোর শশী?
—তা আবার নাই! বাড়ি থেকে পালকি করে বেরিয়ে—সব ঠাকুরবাড়িতে প্রণাম করে—
–সে তো জ্ঞানগঙ্গা যারাই গিয়েছেন—তারা সবাই তো তা করেছেন রে। সে নয়।
–তবে?
—কর্তা কাশী গেলেন না, উদ্ধারণপুর গঙ্গাতীর গেলেন না, গেলেন কলকাতা। কলকাতাও গঙ্গাতীরে। কিন্তু গঙ্গাতীরে দেহ রাখতে ঠিক যান নি। গিয়েছিলেন চিকিৎসা করিয়ে বাঁচতে।
তা হবে না? বিশাল সম্পত্তি, অগাধ ধন, এত কীৰ্ত্তি—এসব ছেড়ে মরতে কেউ চায় নাকি?
–হ্যাঁ রে, তাই তো বলছি। তার হয় নি আর রামহরির সেই বাসনা হল। রামহরি যা করেছে তার পক্ষে তো সেও কম নয় রে! অনেক! তার ওপর তরুণী পত্নী।
এবার হাঁ করে শশী জীবন ডাক্তারের মুখের দিকে চেয়ে রইল।
জীবনমশায় হেসেই বললেন– হাঁ করে আর তাকিয়ে থাকিস নে। বাড়ি যা। রাত্রি অনেক হয়েছে। কাল যাব। দুপুরের পর গাড়ি পাঠাতে বলিস।
শশী বললে—দু রাস্তার মোড় বুঝি এটা?
–হ্যাঁ।
এইখান থেকেই পাকা রাস্তা থেকে কাঁচা রাস্তা ধরে জীবন ডাক্তার যাবেন নিজের গ্রামে। পাকা রাস্তায় শশী যাবে নবগ্রাম।
জীবনমশায় বললেন–নেশাভাঙ একটু কম করিস শশী।
শশী মাথা চুলকে লজ্জা প্রকাশ করে বললে ভাবি তো। পারি না। তারপর অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে বললে—চলুন আপনাকে পৌঁছে দিয়েই যাই। ভারি অন্ধকার আর রাত্রি অনেক হয়েছে।
হতভাগা! আমাকে দাঁড়াতে হবে না। যাবাড়ি যা। আমাকে দাঁড়াবে? তোকে দাঁড়াবে কে? পরক্ষণেই একটা কথা মনে করে জীবন দত্ত সচকিত হয়ে উঠলেন, বললেন––আচ্ছা চল, আমিই তোকে পৌঁছে দিয়ে বাড়ি ফিরব।
মনে পড়ল। মাসকয়েক হল শশীর মা মারা গেছে। শশী হয়ত এত রাত্রে ভয় পাচ্ছে। একলা যেতে। একটু আগেই বলছিলগলাইচণ্ডী থেকে ফিরবার পথে ওর গা ছমছম করেছিল অর্থাৎ ভয় পেয়েছিল শশী। ওঃ! সেই জন্যেই সে দেবস্থানে ঢুকেছিল?
জীবনমশায় বললেন– সত্যি বল তো শশী–কী ব্যাপার? তুই কি ভয় পেয়েছিল?
শশী মাথা চুলকে বললে—মানে—আমার মা–
—তোর মা?
–মনে হয় আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। মনে হয় নয় মশায়, সত্যি।
জীবন মশায় বললেন–চল, ওসব কথা থাক।
শশী বললে–মা আমাকে ভয় দেখায় না—আগলায়। বুয়েছেন না! শশী বকবক করলে। সারা পথটা। তার মধ্যে রামহরির কথাই বেশি। ওই বেটার নিদেন হেঁকে দেখিয়ে দেন একবার ছোকরা ডাক্তারকে!
১৭. শ্রাবণের মেঘাচ্ছন্ন রাত্রি
প্রদ্যোত ডাক্তার বারান্দায় বসে ছিল। শ্রাবণের মেঘাচ্ছন্ন রাত্রি, অসহ্য গুমটের মধ্যে ঘরে ঘুম আসা এক অসাধ্য ব্যাপার; তার ওপর মশারি। মশা এখানে খুব বেশি ছিল। লোকে বলত বিনা মশারিতে শুয়ে থাকলে মশারা সমবেতভাবে তুলে নিয়ে চলে যেতে পারে। আজকাল মশা কমেছে। ডি. ডি. টি. ক্যাম্পেন শুরু হয়েছে গত বছর থেকে। তবুও প্রদ্যোত বিনা মশারিতে শোয় না। একটি মশাও কামড়াতে পারে এবং সেইটিই অ্যানোফলিস হতে পারে এবং তার। বাহিত বিষটুকুতে ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়ার বীজাণু থাকতে পারে। বাইরে মশারি খাঁটিয়ে শুলে হয়, কিন্তু তাতে মঞ্জ অর্থাৎ ডাক্তারের স্ত্রী ভয় পায়। শহরের মেয়ে, তার ওপর এ অঞ্চল সম্পর্কে ছেলেবেলায় অনেক চোরডাকাত ভূতপ্রেত সাপবিছের গল্প শুনেছে সে। মঞ্জুর মায়ের মাতামহের। বাড়ি ছিল এই দেশে। মায়ের মাতামহ অবশ্য বেঁচে নেই এবং মামাও কোনো কালে ছিল না, অর্থাৎ মঞ্জুর মা ছিল মা-বাপের এক সন্তান; থাকবার মধ্যে মঞ্জুর বৃদ্ধা মাতামহী বেঁচে আছে। কানে কালা, চোখেও খুব কম দেখে। সে-ই গল্প করত। ভূতপ্রেত মঞ্জু বুদ্ধি দিয়ে অবিশ্বাস করে, তর্কও করে, কিন্তু অন্ধকারে কোনো শব্দ উঠলেই চমকে ওঠে। সেই কারণে বন্ধ ঘরে শুতে যাবার আগে যতক্ষণ পারে প্রদ্যোত ডাক্তার বসে থাকে। মধ্যে মধ্যে ফ্লিট স্পে করে দেয়। চারিপাশে বারান্দার নিচে সিঁড়িতে কার্বলিক-অ্যাসিড-ভিজানো খড় ছিটানো থাকে। আর থাকে ডি. ডি. টি. পাউডার এবং ব্লিচিং পাউডার ছড়ানো। সাপ পোকা বিছে আসতে পারে না।
সকালবেলা থেকেই প্রদ্যোতের মেজাজ খারাপ হয়ে আছে। রতনবাবুর ছেলে বিপিনবাবুর। কেসে এখানকার হরেন ডাক্তার তাকে কল দিয়েছিল; আকস্মিকভাবে হিকার উপসর্গ এসে জুটেছে। কল দিয়েছিল কাল সকালে। একটা নিষ্ঠুর যন্ত্রণাদায়ক অবস্থা। মনে হয় হয়ত যে-কোনো মুহূর্তে নিষ্ঠুর পরিণতি এসে উপস্থিত হবে। হরেনের সঙ্গে পরামর্শ করে যা করবার করেছে তারা, কিন্তু কোনো ফল হয় নি। আজ সকালে কিশোরবাবু প্রস্তাব করলেন–জীবন মশায়কে ডাকা হোক। প্রস্তাবটা বোধহয় রতনবাবুর, কিশোরকে দিয়ে প্রস্তাবটা তিনিই করিয়েছেন। প্রদ্যোত ডাক্তার কী বলবে? মনে উত্তরটা আপনিই এসে দাঁড়িয়েছিল-বেশ তো দেখান। আমি কিন্তু আর আসব না। কিন্তু কথাটা বের হবার আগেই কিশোরবাবু বলেছিল–আপনি কিন্তু বলতে পাবেন না—আর আসব না। আমার অনুরোধ। আমি শুনেছি আপনি তার উপর অসন্তুষ্ট। কিন্তু তিনি অসন্তোষের লোক নন।
