ঠাকুরদাস বললেন–দোষ তোমার। একখানা চিঠিতে তুমি বিয়ে পাকা করলে। নিজে গেলে না, তাকে আসতে লিখলে না।
মশায় তাঁর বাপের কথাগুলি পুনরাবৃত্তি করলেন, প্রবঞ্চনা আমি করি নি ঠাকুরদাস, প্রবঞ্চনা করেছে নবকৃষ্ণ। এতে আমার দোষ কোথায় বল?
জীবন নেমে এসেছিল উপর থেকে।
মঞ্জরীর বিসূচিকায় মৃত্যু মিথ্যা কথা। গত ২৯শে জ্যৈষ্ঠ তার সঙ্গে ভূপী বোসের বিবাহ হয়ে গিয়েছে।
জীবনের মনে হয়েছিল-দোলের দিন মঞ্জরী হাতে আলকাতরা নিয়ে তার মুখে লেপে দিতে এসেছিল; সেদিন পারে নি, কিন্তু আজ মঞ্জরী সেই আলকাতরা মুখে মাখিয়ে দিয়েছে। যেন মঞ্জরী সেই খিলখিল হাসি নতুন করে আসছে দূরান্তরে দাঁড়িয়ে।
ভূপী হেসে বলছে—বুনো শুয়োরটা!
মশায় ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে সস্নেহে তাকে বলেছিলেন-ভগবান তোমার ওপর। সদয়, বাবা জীবন। তোমাকে তিনি আজীবন প্রবঞ্চনার হাত থেকে রক্ষা করেছেন। ওই মেয়ে। ঘরে এনে তুমি সুখী হতে না। শুধু প্রবঞ্চনা নয়—আজীবন সে তোমাকে অশান্তির আগুনে দগ্ধ করত। তা ছাড়া যার যে পতি-পত্নী। এ তো তোমার আমার ইচ্ছায় হবে না! লজ্জা পেয়ো না, দুঃখ কোরো না। মনকে শক্ত কর।
শেষের কথা কটা ভাল লাগে নি জীবনের। সে মাথা হেঁট করে সেখান থেকে চলে এসেছিল।
মশায় বলেছিলেন—তোমার সঙ্গে কথা আছে। যেয়ো না কোথাও। সুরেন তুমি যাও, তোমাকেও চাই। পাশের ঘরে অপেক্ষা কর।
পাশের ঘরে বসেই জীবন সমস্ত বৃত্তান্ত পেয়েছিলেন। ঠাকুরদাস মিশ্র আস্তে কথা বলতে জানতেন না, অন্যের কাছে আস্তে উত্তর শুনতেও পছন্দ করতেন না। জগৎ মহাশয়ের অনুরোধে। দূতকে তিনি নির্যাতন করেন নাই বটে তবে ধমক দিয়েছিলেন অনেক। প্ৰশ্নোত্তরের মধ্যে যে কথাগুলি প্রকাশ পেয়েছিল, তা হল এই।
প্রতারণা নবকৃষ্ণ সিংহ ঠিক করেন নি।
করেছে মঞ্জরী, বঙ্কিম, আর ওদের মা।
জীবনের হাতে মুষ্ট্যাঘাত খেয়ে ভূপী বোস অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল; খুন করবে, সে খুন করবে বর্বর উল্লুককে, রোমশ কালো শুয়োরকে। তারপরই তার চোখ পড়েছিল মঞ্জরীদের ওপর। সঙ্গে সঙ্গে ক্রোধ গিয়ে পড়ল তাদের ওপর। বঙ্কিমকে ঠেলে ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে মঞ্জরীর সামনে হাত নেড়ে কুৎসিত মুখভঙ্গি করে বলেছিল-এ তাদের ষড়যন্ত্র। তোদর! তোদের! ভাই বোন মা সবাই মিলে ষড়যন্ত্র করেছিলি আমাকে তাড়াতে। টাকার জন্যে ওই শুয়োেরটার সঙ্গে, ছোটলোকের ছেলের সঙ্গে প্রেম করতে বাধে না! ছি! ছিঃ ছি! তারপর সাড়ম্বরে পথে চিৎকার করে অপবাদ রটনা করে ফিরেছিল। কিছুদিন থেকেই তার সন্দেহ হয়েছিল মঞ্জরীরা জীবনকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। জীবনের খরচের বাহুল্য দেখে অনুমান করেছিল যে, প্রশ্রয় পেয়েই জীবন এমন উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে। সে এর প্রমাণ দিতে পারে। নইলে নাতনী। দাদামশায় সম্পর্ক ধরে যে হাসিখুশি বক্র রসিকতার বাগযুদ্ধ চলছিল সে এমন সীমা ছাড়াত না। সম্পর্কটা প্রকাশ্য হলে মঞ্জরী তার কাছ থেকে দামি আতর গোপনে উপহার নিত না। আর আলকাতরা মাখাতে যেত না। তাই সেদিন নাক ভেঙে রক্তমাখা মুখেই ওই কথা রটাতে রটাতে বাড়ি ফিরেছিল। এবং তার দলবল জড়ো করে বোর্ডিং থেকে আরম্ভ করে চারপাশ জীবনের। খোঁজে প্রায় সমুদ্র মন্থন করে ফেলেছিল। খুন করবে। তাকে না পেয়ে তার মুগুরটা কুড়ুল দিয়ে কেটে চেলা বানিয়ে তবে ক্ষান্ত হয়েছিল।
নবকৃষ্ণ সিংহ অথৈ সমুদ্রে পড়েছিলেন। কূল-কিনারা ছিল না। গোটা বাজারে ওই ছাড়া কথা ছিল না। মা মঞ্জরীকে বলেছিলেন—মর, মর—তুই মর!
মঞ্জরী মরতে পারে নি, কিন্তু শয্যা সত্যই পেতেছিল।
বঙ্কিম আস্ফালন করেছিল—আমিও বঙ্কিম সিংহী, আমি দেখে নেব।
বাপ তার গালে ঠাস করে চড় মেরেছিলেন-হারামজাদা, তুই সব অনৰ্থের মূল। দুজনকেই তুই ঘরে এনেছিলি।
বঙ্কিম তাতেও দমে নি, সে আরও প্রবল আস্ফালন করে বলেছিল–খুন করব ওকে আমি।
নবকৃষ্ণ বাঁকা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন কাকে? কাকে খুন করবি?
বঙ্কিম এর উত্তর দিতে পারে নি।
ওদিকে নিত্যনতুন রটনা রটাচ্ছিল ভূপী বোস। কঠিন আক্রোশ তার তখন। শেষ পর্যন্ত নবকৃষ্ণ এই পত্র লিখলেন জগদ্বন্ধু মশায়কে এবং পত্রোত্তর পেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন। মঞ্জরীও উঠে বসেছিল। ভূপী বোসের নির্মম নিষ্ঠুর অপবাদ রটনায় লজ্জা তার হয়েছিল বৈকি! দুঃখও হয়েছিল, বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে কেঁদেও ছিল। আঘাত যে নির্মম। কাঁদী শহরের চারিদিকে যে রটে গিয়েছিল এই কাহিনী। জগৎ মশায়ের পত্রে সেসব মুছে গেল। নবকৃষ্ণ মাথা তুললেন, সেই পত্র দেখিয়ে বেড়ালেন সকলকে। জগশায় লিখেছেন—মা লক্ষ্মীকে সসম্মানে ঘরে আনিব ইহাতে আর কথা কী আছে। মঞ্জরীও উঠে বসেছিল। ওদিকে ভূপী বোস গরজাতে লাগল খাঁচার বাঘের মত। আর সে কী করতে পারে? তবুও নবকৃষ্ণ সিং সাবধানতা অবলম্বন করে কাঁদী থেকে দেশে চলে এলেন। কাঁদীতে বিবাহ দিতে সাহস করলেন না। গ্রীষ্মের ছুটির কয়েকদিন পরই বিবাহের দিন। স্কুলে ছুটির জন্য দরখাস্ত পাঠালেন। দরখাস্ত নিয়ে গেল বঙ্কিম। সেখানে যে কী করে কী হল কেউ বলতে পারে না, তবে ভূপীর সঙ্গে বঙ্কিমের ছিন্ন প্রীতির সম্পর্ক গাঢ়তর হয়ে উঠল। বঙ্কিমই ফিরে এসে সব পণ্ড করে দিয়েছে।
লোকটি বললে–ওনারা জানতেন-পাত্র ডাক্তার হবে। কিন্তু জগৎ মশায় চিঠিতে লিখেছিলেন, ছেলে তার ডাক্তারি পড়বে না; কবিরাজি করবে, আমার কাছেই কবিরাজি শিখছে। এই শুনেই মায়ের মুখ বেঁকে গেল, কন্যের মুখে বোঝা নামল।
