সুরেন গ্রামের ছেলে। ঠাকুরদাস মিশ্রের ছেলে। জমিদারি সেরেস্তার পাটোয়ারী কাজ শিখেছে। চতুর ছেলে। সে বললে—আজ তোকে খাওয়াতে হবে। মদ-মাংস খাব। দে, টাকা ফেল।
নেপাল বাপের আদুরে ছেলে। সবরেজেষ্ট্রি আপিসের কেরানী তার বাবার অনেক রোজগার। নবগ্রামের ছড়ায় ছিল—বিনোদ বুড়ো লম্বা জামায়, পকেট ভরে রেজকি কামায়। বিনোদ মুখুজ্জে সত্যিই রেজকি বোঝাই পকেট দুটো দুই হাতে ধরে বাড়ি আসত। নেপাল লোক ভাল। হাউ-বাউ করে বকত, হা-হা করে হাসত, দুম দুম করে চলত, সাদা দিলখোলা মানুষ। একবার রাঘবপুরে ব্রাহ্মণভোজনে নেমন্তন্ন খেতে যাবার পথে হঠাৎ নেপালের খেয়াল হল পৈতে নেই গলায়, কোথায় পড়েছে। নেপাল পথে কালী বাউরিকে দেখে জিজ্ঞাসা করছিল কী করি বল তো কেলে? আমাকে একটা পৈতে দিতে পারিস? জীবনের বাড়ি এসে মশায়ের কবিরাজখানায় ঢুকে কামেশ্বর মোদকের বদলে খানিকটা হরীতকী খণ্ডই খেয়ে ফেলত অম্লান বদনে। স্বাদেও বুঝতে পারত না। এবং তাতেই তার নেশাও হত।
নেপাল সেদিন বলেছিল-হাম, হাম খাওয়ায়েঙ্গা। আমি খাওয়াব।
নেপালই সেদিন খাইয়েছিল। তিন টাকা খরচ হয়েছিল। লুচি মাংস মিষ্টি মদ। গান-বাজনা হয়েছিল রাত্রি দুটো পর্যন্ত। সুরেন তবলা সঙ্গত করেছিল—জীবন আর নেপাল গান গেয়েছিল। সেতাব ছিল শ্রোতা।
চণ্ডীদাস-বিদ্যাপতির পদাবলী। পূর্বরাগের পালাটাই শেষ করে ফেলেছিল তিন জনে। সেতাব ঘাড় নেড়েছিল, বাহবা দিয়েছিল।
ভুল হচ্ছে। বৃদ্ধ জীবন দত্ত দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন এতক্ষণে। এতকাল পরে ভুল হয়ে যাচ্ছে। জীবন নিজেই সেদিন গুলঞ্চ চাপার ফুলের মালা গেঁথেছিল। এক গাছি নয় চার গাছি। চার বন্ধু গলায় পরেছিল।
নেপাল এবং সুরেন সেদিন তাকে পায়ে ধরে সেধেছিল—একটু খা ভাই। আজ এমন সুখের সংবাদ পেয়েছি, আজ একটু খেয়ে দেখ! একটু!
জীবন কিন্তু ধর্মভ্রষ্ট হন নি।
বৈষ্ণব-মন্ত্ৰ-উপাসকের বংশ। মহাশয়ের বংশ। তিনি খান নি। তিনি বলেছিলেন না। ভাই। বাবার কথা তো জানিস। মঞ্জরীদের বাড়িও ঠিক আমাদের মত। তারাও বৈষ্ণব।
ওদিকে বাড়িতে চলছিল মহাসমারোহের আয়োজন। জগদ্বন্ধু মশায়ের একমাত্র সন্তানের বিবাহ। ব্রাহ্মণভোজন, জ্ঞাতিভোজন, নবশাখভোজন, গ্রামের অন্য লোকদের খাওয়াদাওয়া এমনকি আশপাশের মুসলমান পল্লীর মিঞা সাহেবদের লুচি মিষ্টি খাওয়ানো, ব্যবস্থার ত্রুটি রাখেন নি জগদ্বন্ধুমশায়। বাজনা, বাজি পোড়ানো, রায়বেশে তার ওপর দুরাত্রি যাত্ৰাগান হবে কি না এ নিয়েও কথা চলেছিল। সুরেন-সেতাব-নেপাল থেকে গ্রামের ঠাকুরদাস মিশ্রের মত মাতব্বর পর্যন্ত ধরেছিলেন—সে কি হয়! যাত্ৰাগান করাতে হবে বৈকি। না হলে অঙ্গহীন হবে।
মশায় বলছিলেন-আষাঢ় মাসের কথা। বৃষ্টি নামলে সব পণ্ড হবে। শামিয়ানাতে জল আটকাবে না। তার ইচ্ছা ওই খরচে বরং গ্রামের সরকারি কালীঘরের মেঝে দাওয়া বাঁধানো হোক, ঘরখানারও সংস্কার হোক।
এই প্রতীক্ষার কাল যত সুখের তত উদ্বেগের। উদ্বেগে দিনকে মনে হয় মাস, মাসকে মনে হয় বৎসর। তবুও কাটল দিন। আষাঢ়ের এগারই বিবাহ, আষাঢ়স্য প্রথম দিবস এল। আকাশে মেঘ এল। সে মেঘ ভুবন বিদিত বংশের পুষ্কর মেঘ নয়। অশনিগৰ্ভ কুটিলমনা কোনো অজ্ঞাতনামা মেঘ। বর্ষণের ফলে বজ্ৰপাত হয়ে গেল সে মেঘ থেকে।
মঞ্জরী নাই।
বেলা দুপহরের সময় তোক এল পত্র নিয়ে। পত্রে লেখা ছিল—গত পরশ্ব রাত্রে আমার কন্যা বিসূচিকা রোগে মারা গিয়াছে।
এক মুহূর্তে সুখস্বপ্ন একেবারে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। সেকালের তরুণ জীবন দত্ত। সেকালের মানুষের বিবাহিত পত্নীর মৃত্যুতে বুকখানা ফেটে চৌচির হয়ে গেলেও আর্তনাদ বের হত না মুখ থেকে। এ তো ভাবী পত্নী। জীবন কাঁদে নি। নির্জনে কবিরাজখানার উপরের ঘরে চুপ করে বসে ছিল। হঠাৎ ঠাকুরদাস মিশ্রের উচ্চ চিৎকারে চমকে উঠেছিল।
চিৎকার করছিল ঠাকুরদাস মিশ্র।–আমি ঠাকুরদাস মিশ্ৰ—আমার চোখে ধুলো দেবে? লোকে ডালে ডালে যায়—আমার আনাগোনা পাতায় পাতায়। মুখ দেখে আমি মতলব বুঝতে পারি, পাটোয়ারিগিরি করে খাই আমি। এদিকের চার দিকে গোলমাল চলছে, ওদিকে বেটা সুট করে উঠে রাস্তায় নামল! আমার সন্দেহ হল। কী ব্যাপার? জিজ্ঞাসা করলাম, কোথায় যাবে হে? বললে—একবার মাঠে যাব। প্রথমটা বুকটা ধড়াস করে উঠল। সেখানে ওলাউঠো হয়েছে লোকটা সেখান থেকে আসছে, ওর আবার কিছু হয় নি তো? লোকটা হনহন করে চলে গেল। গেল তো, একেবারে যে পথে এসেছে, সেই পথে। কাছের পুকুর জঙ্গল ফেলে চলল। হঠাৎ নজরে পড়ল ছাতাটিও বগলে পুরেছে। তখনই আমার সন্দেহ হল বেটা পালাচ্ছে, আমিও গলিপথে মাঠের ধারে এসে দাঁড়ালাম। দেখি, মাঠে এসেই ছুটতে শুরু করেছে। তখনই আমি বুঝে নিয়েছি। কিন্তু পালাবে কোথা? মাঠে চাষীরা হাল ছেড়ে ঘুরছে, হাকলামধর বেটাকে ধর ধর। ধর।
সোলেমান, করিম, সাতন-তিন জন বেটাকে ধরলে, বললাম নিয়ে আয় বেটাকে পঁজাকোলা করে। আনতেই সোলেমানের হাতের পাঁচনটা নিয়ে বেটার পিঠে কষে এক বাড়ি। বল বেটা, বল—সত্যি কথা বল। ঠিক বলবি, নইলে কাস্তে দিয়ে জিভ কেটে ফেলব। গলগল। করে বলে ফেললে সব।
জগদ্বন্ধু মশায়ের গম্ভীর শান্ত কণ্ঠ বেজে উঠেছিল—ওকে ছেড়ে দাও ঠাকুরদাস, ও গরিবের কী দোষ? ও কী করবে! ওকে পাঠিয়েছে-ও এসেছে। দূত অবধ্য। ও দৃত। নবকৃষ্ণ সিংয়ের। অপকর্মের জবাবদিহি বা প্ৰায়শ্চিত্ত ও কী করে করবে বল?
