মশায় দৃষ্টি নামিয়ে বললেন––জীবনের মা! তাঁর কণ্ঠস্বর গম্ভীর।
চিন্তিত মুখেই জীবনের মা প্রতীক্ষা করছিলেন। সাগ্রহে তিনি বললেন–বল! শোনবার জন্য তো দাঁড়িয়েই আছি।
–জীবনের বিবাহের আয়োজন কর।
–কার সঙ্গে? ওই মেয়ের সঙ্গে? নবকৃষ্ণ সিংহের মেয়ের সঙ্গে?
–হ্যাঁ, দিতেই হবে বিবাহ। নবকৃষ্ণ সিংহ লিখেছেন—এই ঘটনায় এখানে তাঁর কন্যার দুর্নাম রটেছে চারিদিকে। ওই যে কুৎসিত প্রকৃতির ছেলেটিসে তার কন্যা মঞ্জরীকে জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে নানারকম মন্তব্য করেছে। বলেছে—ঘটনার দিন সে নাকি জীবনকে আবীর দেবার ছলে মঞ্জরীর অঙ্গে হাত দিতে দেখেছে।
মা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন––জীবন!
মাকে এমন মূর্তিতে কখনও জীবন দেখে নাই।
মা আবার বললেন–,বল, আমার পায়ে হাত দিয়ে বল–
জীবন সেদিন যেন নবজন্ম লাভ করেছে—বাপের সাহচর্যের ফলে, তাঁর অন্তরের স্পর্শে। সে উঠে এসে পায়ে হাত দিয়ে বললে–আমি তার কপালে আবীর দিয়েছি। আর কোনো দোষে দোষী নই আমি।
মশায় বললেন–কর কী জীবনের মা? ছি! বিবাহের আয়োজন যখন করতে বলছি, তখন ও-সব কেন? জীবন মনে মনে মেয়েটিকে কামনা করে। এক্ষেত্রে কি শপথ করায়? ছি! বিবাহের আয়োজন কর।
—সে কী? কোষ্ঠী দেখাও। নিজে মেয়ে দেখ। তারপর কথাবার্তা দেনাপাওনা–
–কিচ্ছু না, এক্ষেত্রে ওসব কিছু না। ছক এই চিঠির সঙ্গে আছে। ওটা আমি ছিঁড়েই দিচ্ছি, কী জানি যদি বাধার সৃষ্টি করে; আর দেনা-পাওনাই বা কী? কী লিখেছেন তিনি জান? লিখেছেন, আপনাদের বংশের উপাধিই হইয়াছে মহাশয়। মহাশয়ের বংশ আপনার। আপনি নিজে ও অঞ্চলে বিখ্যাত চিকিৎসক। আপনার পুত্র ডাক্তারি পড়িবার জন্য প্রস্তুত হইতেছে। এ অবশ্যই আমার বামন হইয়া চাঁদ ধরিবার বাসনা। কিন্তু যেরূপ ক্ষেত্র হইয়া দাঁড়াইয়াছে, তাহাতে আপনি প্রত্যাখ্যান করিলে আমার কন্যাকে গঙ্গার জলে ভাসাইয়া দিতে হইবে।
—আর কোনো কথা নয়। আয়োজন কর। বৈশাখে আর এক-দিনে বিবাহ হয় না। না। জ্যৈষ্ঠ মাসে জ্যেষ্ঠপুত্রের বিবাহ দেশাচারে নিষিদ্ধ। প্রথম আষাঢ়েই বিবাহ হবে।
১১. অতীত কালের কথা মনে করে
অতীত কালের কথা মনে করে যতই মনের মধ্যে বিচিত্র রসের সঞ্চার হয়—বৃদ্ধ জীবন মশায় ততই ঘন ঘন দাড়িতে হাত বোলান। সাদা দাড়ি, তামাকের ধোঁয়ায় খানিকটা অংশে তামাটে রঙ ধরেছে। যত্ন অভাবে করকরে হয়ে উঠেছে। তবুও হাত না বুলিয়ে পারেন না। সঙ্গে সঙ্গে হাসেন, সেকালের তরুণবয়সী নিজেকে পরিহাস করেন এই হাসির মধ্যে। একা নিজেকেই বা কেন—সমস্ত মানুষকেই করেন।
যৌবনে কী একটা আছে; জলের যেমন ঢালের মুখে গতির বেগ তেমনি একটা বেগ; যৌবনের মন যখন কোনো একজনের দিকে ছোটে তখন ওই বেগে ছোটে, তখন শাস্ত্রের কথা, ভালমন্দ বিবেচনার কথা, সমাজের বাধার কথা, হাজার কথাতেও কিছু হয় না, মন বাগ মানে না। এই সব শাস্ত্ৰকথাগুলিকে যদি বালির বাঁধের সঙ্গে তুলনা করা যায় তবে মন সেখানে ঢালের টানে ছুটন্ত জলস্রোত। হয় বাঁধ ভাঙে নয় জল শুকায়।
তাই তো আজ হাসছেন জীবন মশায়। সেই দিনই ওই রোগিণী দেখে ফিরবার পথে মঞ্জরীর সঙ্গে বিবাহ-সম্ভাবনা বন্ধ হওয়ায় তরুণ জীবন ভাগ্যবিধাতাকে ধন্যবাদ জানিয়েছিল। মঞ্জরীর আসল চেহারা দেখতে পেয়ে তার ওপর বিতৃষ্ণার সীমাও ছিল না। কিন্তু যে মুহূর্তে জগৎমশায় স্ত্রীকে বললেন– প্রথম আষাঢ়ে বিবাহ হবে, সেই মুহূর্তেই তরুণ জীবন সব ভুলে গিয়েছিল। শুধু ভুলে যাওয়াই নয়, মনে হয়েছিল হাত বাড়িয়ে সে আকাশের চাঁদের প্রায় নাগাল পেয়েছে। যেটুকু ব্যবধান রয়েছে আষাঢ় মাস পর্যন্ত নিশ্চয় সে ততখানি বেড়ে উঠবে।
জীবন দত্তের প্রত্যাশার আনন্দে টলমল মনের পাত্র হতে আনন্দ যেন উথলে উঠে তাঁর চারপাশে পড়েছিল। পৃথিবীর যতটুকু অংশ তার চোখে পড়েছিল সমস্তটুকু আনন্দময় হয়ে উঠেছিল। সব মধু। মধু বা ঋতায়তে!
ওদিকে পত্রবিনিময় চলছিল। জগৎমশায় পত্র দিয়েছিলেন নবকৃষ্ণ সিংহকে। কয়েক দিন পরই সে পত্রের উত্তর এল।
নবকৃষ্ণ সিংহ দ্বিতীয় পত্র লিখেছিলেন মঞ্জরী আমার লজ্জায় দুঃখে শয্যাগ্রহণ করিয়াছিল। আপনার পত্ৰ আসিবার পর তাহার মুখে হাসি ফুটিয়াছে। সে উঠিয়া দাঁড়াইয়াছে। তাহার মাকে বলিয়াছে—আমার শিবপূজা মিথ্যা হয় নাই।
জীবন দত্ত আনন্দে আপনাকে হারিয়ে ফেলেছিলেন। মঞ্জরী লজ্জায় দুঃখে শয্যাগ্ৰহণ করেছিল, জীবনের সঙ্গে বিয়ের সম্বন্ধের কথা শুনে সে উঠে বসেছে? মুখে হাসি ফুটেছে? দুঃখের শয্যা ছেড়ে মঞ্জরীর হাসিমুখে উঠে বসার কথা মনে হতে তার চোখের সামনে ফুলে ফুলে সর্বাঙ্গ ভরা গুলঞ্চফুলের গাছটার ছবি ভেসে উঠেছিল।
ছুটে গিয়ে সেতাবকে , সুরেন্দ্রকে এবং নেপালকে দেখিয়েছিলেন চিঠিখানা। চিঠিখানা তিনি চুরি করেছিলেন।
নিজের গ্রামের সুরেন্দ্র এবং নবগ্রামের সেতাব ও নেপাল ছিল তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু। সুরেন আর নেপাল তখন মদ ধরেছে। সেকালে এ অঞ্চল সম্পর্কে লোকে বলত মাটিতে মদ খায়। তা খেত। তের চোদ্দ বছর হতেই মদ খেতে শিখত। তান্ত্রিকের দেশ, সবাই তান্ত্রিক বিশেষ তো ব্রাহ্মণেরা। তারপর দীক্ষা হলে ওটা সঁড়াত ধৰ্মসাধনের অঙ্গ। অর্থাৎ প্রকাশ্যেই খাওয়ার অধিকার পেত। খেত না শুধু সেতাব। সেতাবও ব্রাহ্মণ, শাক্ত ঘরের সন্তানও বটে, কিন্তু ভড়কে যেত। সেতাব সমস্ত জীবনটা পিতলের পাত্রে নারিকেলের জল ঢেলে তাই দিয়ে তান্ত্ৰিক তৰ্পণ চালিয়ে এল।
