চুপ করে গিয়েছিলেন জগৎমশায়, বোধহয় সংশয় উপস্থিত হয়েছিল নিজের মনে। একটু চুপ করে থেকে বলেছিলেন, এক এক সময় শাস্ত্রবাক্যে সংশয় জাগে, জীবন। আমাদের শাস্ত্রে বলে স্বামীর পাপের ভাগ স্ত্রী গ্রহণ করে না। কিন্তু এক্ষেত্রে কী বলব? এক্ষেত্রে স্বামীর অমিতাচারের ফল ভোগ করছে মেয়েটা, সেই হেতুতেই ওকে যেতে হবে অকালে।
আবার খানিকটা চুপ করে থেকে বলেছিলেন-হয়তবা প্রাক্তন জন্মান্তরের কর্মফল ওই মেয়েটার—তার ফলেই স্বল্পায়ু হয়েই জন্মেছিল। তাই বা কে বলবে?
সেদিন জীবন মশায়ও ওই কথাতেই বিশ্বাস করেছিলেন। মনে মনে নিজের ভাগ্যবিধাতাকে। প্ৰণাম জানিয়েছিলেন। তাকে পরিত্রাণ করেছেন তিনি। মঞ্জরী স্বাস্থ্যবতী বটে, কিন্তু বয়স তো বার বৎসর। কে বললে—মঞ্জরীর ঠিক এই পরিণতি হত না?
একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে আজ বৃদ্ধ জীবন মশায় আকাশের দিকে চাইলেন আবার। এক বিচিত্ৰ হাসি ফুটে উঠল তার মুখে। দাড়িতে হাত বুলালেন। আকাশে রক্তসন্ধ্যা দেখা দিয়েছে। গাঢ় লাল হয়ে উঠেছে দিগন্তবিস্তৃত মেঘস্তর। তার নিচে বকের সারি উড়ে চলেছে। হঠাৎ এতক্ষণে চোখে পড়ল সামনে ঢাকা রয়েছে চায়ের বাটি। ইন্দির কখন রেখে গিয়েছে। অতীত কথা স্মরণ করতে গিয়ে চায়ের কথা মনে হয় নি। ইন্দির নিশ্চয় কথা বলেছিল, খেয়াল করে দেবার চেষ্টাও সে নিশ্চয় করেছিল কিন্তু সে তিনি স্মরণ করতেই পারছেন না।
থাক। আজ চা থাক।
অতীত কালের কথার একটা নেশা আছে। বড় মনোরম বর্ণবিন্যাস। চোখে পড়লে আর ফেরানো যায় না। বিশেষ করে যেখানটার কথা মনে পড়ছে এখন সেখানটা যেন ওই আকাশের রক্তসন্ধ্যার বর্ণচ্ছটার মতই গাঢ়।
পথে তিনি ভাগ্যবিধাতাকে ধন্যবাদ জানিয়ে এলেন—মঞ্জরীর বন্ধন থেকে পরিত্রাণ দেওয়ার জন্য। আর বাড়ি ফিরেই দেখলেন–।
আবার হাসলেন এবং বার কয়েক দাড়িতে হাত বুলোলেন। হা কর্ম-পাক নিয়ে যিনি চক্র রচনা করেন তিনি যেমন চক্রী তেমনি রসিক।
***
সেদিন তৃতীয় প্রহরের শেষে তারা বাড়ি ফিরেছিলেন। মা বসে ছিলেন, তাঁরা ফিরে এলে ভাত চাপিয়ে দেবেন। অবশ্য সে দিক দিয়ে বিশেষ অনিয়ম হয় নি। চিকিৎসকের খাওয়া তৃতীয় প্রহরেই ঘটে।
মুখ-হাত ধুয়ে ভিজে গামছা পিঠে বুলিয়ে জগৎমশায় বললেন––জীবনকে কুলকর্মে দীক্ষা দিয়ে আজ আমি নিশ্চিন্ত হলাম। কিন্তু জীবনের মা, তোমার মুখ এমন কেন?
কেমন?–যেন খুব চিন্তান্বিত মনে হচ্ছে। কিছু ভাবছ?
কী ভাবব? জীবনের মা কথাটা উড়িয়ে দিলেন যেন।–তা বটে। কী ভাববে! মেয়েদের ভাবনা অলঙ্কারের, মেয়ের বিয়ের, ছেলের বিয়ের। সুতরাং দুটোর একটা ভাবতে পার।
হাসলেন জীবনের মা। উঠে গিয়ে উনানে চড়ানো বকনোর ঢাকা খুলে হাতায় ভাত তুলে টিপে দেখতে বসলেন।
জগত্মশায়ের মনটা সেদিন প্রসন্ন ছিল—নির্মেঘ শরৎকালের আকাশের মত। তিনি প্রসন্ন। হেসে বললেন– কী, উত্তর দিলে না যে?
পিছন ফিরেই মা উত্তর দিলেনকী বলব? তুমি অন্তৰ্যামী। ভাবছি না বললেও বলছ–ভাবছ। তা হলে তুমিই বলে দাও কী ভাবছি?
জীবনের অভিভূত ভাবটা তখনও কাটে নি। তার মাথার মধ্যে তখনও প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল বাপের গম্ভীর মৃদুস্বরের কথাগুলি।
অভিভূত ভাবটা আকস্মিক একটা আঘাতে কেটে গেল। জীবন চমকে উঠল।
খাওয়াদাওয়ার পর ছোট রেকাবিতে হরীতকীর টুকরো নামিয়ে দিয়ে জীবনের মা বললেন–তুমি অন্তৰ্যামীই বটে। তামাসা তোমাকে আমি করি নি। কঁদী থেকে চিঠি নিয়ে দুপুরে লোক এসেছে। জানি না কী লেখা আছে, তবে কে চিঠি পাঠিয়েছে, তার নাম জেনে আমার ভাবনা হয়েছে। না ভেবে থাকতে পারি নি আমি। নবকৃষ্ণ সিংহ চিঠি লিখেছে—এই দেখ।
চিঠিখানি পড়লেন জগদ্বন্ধু মশায়। চমকিত হয়ে জীবন উদ্বিগ্নচিত্তে বাপের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু মুখ দেখে কিছু অনুমান করতে পারলে না। জগদ্বন্ধু মশায় চিঠি শেষ করে স্থির দৃষ্টিতে বৈশাখের উত্তপ্ত আকাশের দিকে চেয়ে রইলেন।
মনে পড়ছে জীবন ডাক্তারের।
সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছিল। তৃতীয় প্রহরের শেষ পাদ। পূর্বদুয়ারী ঘরের বারান্দায় বসে ছিলেন : সামনে পশ্চিমদুয়ারী একতলা রান্নাঘরের চালার উপর দিয়ে, আচার্য ব্রাহ্মণদের বাড়ির উঠানের বকুল গাছের মাথার উপর দিয়ে রৌদ্রদগ্ধ বৈশাখী আকাশ যেন পোমগ্ন রুদ্রের অর্ধনিমীলিত তৃতীয় নেত্রের বহ্নির ছটায় ক্লিষ্ট নিথর। দিকে দিগন্তরে কোথাও ধ্বনি শোনা যায় না। বাতাসও ছিল না সেদিন। মনে হয়েছিল, বোধহয় সন্ধ্যার দিকে কালবৈশাখীর ঝড় উঠবে। পশ্চিম দিগন্তে আয়োজন হতে আরম্ভ হয়েছে। জীবন ওই আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। তারও বুকে বোধহয় ঝড় উঠবে মনে হয়েছিল। কী লিখেছে নবকৃষ্ণ সিংহ? মঞ্জরী, হয়ত মঞ্জরীর মা—এরা যে ওই দেউলিয়া অভিজাত ঘরের বর্বর ছেলেটার মোহে মুগ্ধ তাতে তার সন্দেহ নাই। বঙ্কিম মঞ্জরী সম্পর্কে তো নাই-ই, কোনো সন্দেহই নাই। তাকে নিয়ে তারা খেলা করেছে। তাই বা কেন? সে নিজেই মূৰ্খ বানর তাই তাদের বাড়ি গিয়ে বানর-নৃত্য করেছে—তারা উপভোগ করেছে। বানর-নৃত্য নয়—লুক-নৃত্য। মঞ্জরী মধ্যে মধ্যে তাকে ভালুকও বলত। ভালুক নাচই সে নেছেছে। ভালুক আর বানরে প্রভেদই বা কী? দুটোই জানোয়ার-দুটোই নির্বোধ! কিন্তু কী লিখেছে নবকৃষ্ণ সিংহ? মিথ্যা কদর্য অভিযোগ! কী করবে জীবন? ভগবান সাক্ষী, কিন্তু ভগবান তো সাক্ষি দিতে আসেন না। তিনি তো বলবেন না প্রাণ দিয়ে ভালবাসা। যদি অপরাধ হয় তবে জীবন অপরাধী। নইলে সে কোনো অপরাধ করে নাই। সে মৃত্যুদণ্ড প্রতীক্ষারত আসামির মতই অপেক্ষা করে রইল।
